১৬৮ দিনের বিলম্বে আপিল খারিজ করা যাবে না, বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষে হাইকোর্টের রায়
সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ের দায়ের করা আপিলে ১৬৮ দিনের বিলম্ব মঞ্জুর করেছেন হাইকোর্ট। বিলম্বের কারণ হিসেবে আইন উপদেষ্টার মতামত গ্রহণ, প্রয়োজনীয় ব্যয় অনুমোদন এবং আইনজীবীর মাধ্যমে আপিল প্রস্তুতের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছিল, তা সন্তোষজনক বলে বিবেচনা করেছেন আদালত। একই সঙ্গে বিলম্ব মওকুফের আবেদন খারিজ করে দেওয়া লালমনিরহাটের জেলা জজের আদেশ বাতিল করা হয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে সিভিল রিভিশন নং ৪৬৮৬/২০০৪-এর রায়ে এ সিদ্ধান্ত দেন। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ হয়। আদালত রুল মঞ্জুর করে বাংলাদেশ রেলওয়ের আপিল দায়েরের ১৬৮ দিনের বিলম্ব মওকুফ করেন এবং আপিল আদালতকে আইন অনুযায়ী দ্রুত আপিল নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। আদালত এ মামলায় কোনো খরচ আরোপ করেননি।
রায়ে আদালত দেওয়ানি মামলায় বিলম্ব মওকুফের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, বিলম্বের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা এবং মামলার গুণাগুণের ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির গুরুত্ব তুলে ধরেন।
যে বিরোধ থেকে মামলার সূত্রপাত
মামলার নথি অনুযায়ী, শফিকুল ইসলাম বাংলাদেশ রেলওয়ে ও অন্যদের বিবাদী করে লালমনিরহাটের সহকারী জজ আদালতে ২০০২ সালে অন্য শ্রেণির মামলা নং ৬৮/২০০২ দায়ের করেন। তাঁর আবেদনের মূল বিষয় ছিল, ১৯৯৪ সালের অন্য শ্রেণির মামলা নং ১১৭-এর রায় ও ডিক্রি, যা ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭ তারিখে দেওয়া হয়েছিল এবং ৫ অক্টোবর ১৯৯৭ তারিখে ডিক্রি স্বাক্ষরিত হয়, তা যোগসাজশমূলক এবং তাঁর ওপর বাধ্যকর নয়, এমন ঘোষণা চাওয়া।
মামলাটি বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে সিনিয়র সহকারী জজ আদালত ২৪ নভেম্বর ২০০৩ তারিখে শফিকুল ইসলামের পক্ষে রায় ও ডিক্রি দেন। ডিক্রিটি স্বাক্ষরিত হয় ৩০ নভেম্বর ২০০৩ তারিখে।
এই রায়ের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ রেলওয়ে লালমনিরহাটের জেলা জজ আদালতে অন্য আপিল নং ২৮/২০০৪ দায়ের করে। তবে আপিল দায়ের করতে ১৬৮ দিনের বিলম্ব হয়। এ বিলম্ব মওকুফের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে তামাদি আইনের ৫ ধারায় পৃথক আবেদন করে।
বিলম্ব মওকুফের আবেদন খারিজ করেন জেলা জজ
লালমনিরহাটের জেলা জজ ১ আগস্ট ২০০৪ তারিখে বিলম্ব মওকুফের আবেদন খারিজ করেন। আদেশে বলা হয়, বিবাদী-আপিলকারী ১১ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ তারিখে রায় ও ডিক্রির সত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার পরও ১৬৮ দিনের বিলম্বে আপিল করেছেন, যার যথাযথ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
জেলা জজের ওই আদেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ রেলওয়ে হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করে। হাইকোর্ট রুল জারি করার পাশাপাশি আপিলের পরবর্তী কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট মামলার রায় ও ডিক্রির কার্যকারিতা ছয় মাসের জন্য স্থগিত করেন। পরে ২১ মে ২০০৬ তারিখে স্থগিতাদেশের মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়ানো হয়।
আপিল দায়েরের বিলম্বের পক্ষে বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্যাখ্যা
হাইকোর্ট রিভিশন আবেদনের সঙ্গে দাখিল করা নথি এবং তামাদি আইনের ৫ ধারায় করা বিলম্ব মওকুফের আবেদন পর্যালোচনা করেন। আদালত দেখতে পান, বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি সংবিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে আপিল দায়েরের আগে কয়েকটি প্রশাসনিক ধাপ অনুসরণের কথা জানিয়েছিল।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রায় ও ডিক্রির সত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার পর বিষয়টি আইন উপদেষ্টার কাছে মতামতের জন্য পাঠানো হয়। মতামত পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যয় বরাদ্দ ও অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। ব্যয় অনুমোদনের পর আইনজীবী প্রয়োজনীয় নির্দেশনা নিয়ে আপিলের স্মারকলিপি এবং বিলম্ব মওকুফের আবেদন প্রস্তুত করেন।
এই ধারাবাহিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণেই আপিল দায়েরে ১৬৮ দিনের বিলম্ব হয়েছে বলে বাংলাদেশ রেলওয়ে জানায়।
হাইকোর্টের মতে, বিলম্বের পক্ষে দেওয়া এই ব্যাখ্যা সন্তোষজনক ছিল এবং তা তামাদি আইনের ৫ ধারায় বর্ণিত ‘যথেষ্ট কারণ’ বা ‘সাফিশিয়েন্ট কজ’ প্রতিষ্ঠা করে। ফলে জেলা জজের আবেদনটি মঞ্জুর করা উচিত ছিল।
সরকারি সংস্থার বিলম্ব মওকুফে যেসব নীতি তুলে ধরেছেন আদালত
রায়ে হাইকোর্ট বিলম্ব মওকুফের বিষয়ে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতসহ উপমহাদেশের উচ্চ আদালতগুলোর পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করেন।
১. সরকার বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নয়
বাংলাদেশ বনাম জাহেরউদ্দিন মামলায় ১৯৮৬ সালের বিএলডি (আপিল বিভাগ) ১৮০-এ আপিল বিভাগ বলেছিলেন, বিলম্ব মওকুফের ক্ষেত্রে সরকার কোনো বিশেষ সুবিধা পায় না। তবে আপিল দায়েরের আগে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের মতামত নেওয়ার প্রয়োজন হওয়ায় সরকারি মামলায় যুক্তিসংগতভাবে কিছুটা সময় বেশি লাগতে পারে। উপযুক্ত ক্ষেত্রে এ বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। তবে সরকার ও সাধারণ নাগরিক, উভয়ের ক্ষেত্রেই বিলম্বের যথেষ্ট ও যুক্তিসংগত কারণ প্রমাণের মানদণ্ড একই থাকবে।
২. সরকারি মামলার প্রশাসনিক জটিলতা বিবেচনায় নেওয়া যায়
গভর্নমেন্ট বনাম আলাউদ্দিন, মৃতের উত্তরাধিকারীগণ মামলায় ৬ বিএলসি (আপিল বিভাগ) ১০১-এ আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণও উল্লেখ করেন হাইকোর্ট। সেখানে বলা হয়েছিল, সরকার সাধারণ মামলাকারীর মতো একই অবস্থানে থাকলেও সরকারি কার্যক্রমের বিভিন্ন পর্যায়ের জটিলতা বিবেচনায় উপযুক্ত ক্ষেত্রে বিলম্বের বিষয়ে সহানুভূতিশীল ও নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া যেতে পারে।
৩. বিলম্ব হলেই মামলার গুণাগুণ বিবেচনার সুযোগ বন্ধ করা উচিত নয়
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের কালেক্টর, ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন, অনন্তনাগ বনাম এমএসটি কাতিজি মামলায় (এআইআর ১৯৮৭ এসসি ১৩৫৩) বিলম্ব মওকুফের ক্ষেত্রে উদার দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলা হয়েছিল। বাংলাদেশের আপিল বিভাগও ৫৯ ডিএলআর (আপিল বিভাগ) ১ মামলায় ওই নীতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
এসব সিদ্ধান্তের আলোকে হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, সাধারণত কোনো মামলাকারী ইচ্ছাকৃতভাবে দেরিতে আপিল করে লাভবান হন না। বিলম্ব মওকুফ না করলে একটি সম্ভাবনাময় মামলা শুরুতেই খারিজ হয়ে যেতে পারে এবং ন্যায়বিচার ব্যাহত হতে পারে। অন্যদিকে, বিলম্ব মওকুফ করা হলে সংশ্লিষ্ট বিরোধের গুণাগুণ শুনে সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
৪. প্রতিটি দিনের বিলম্ব ব্যাখ্যার নীতি যান্ত্রিকভাবে প্রয়োগ করা যাবে না
রায়ে বলা হয়, ‘প্রতিটি দিনের বিলম্ব ব্যাখ্যা করতে হবে’ নীতির অর্থ এই নয় যে আদালতকে অতিরিক্ত কারিগরি বা যান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করতে হবে। বরং বিলম্বের কারণ যুক্তিসংগতভাবে এবং বাস্তবতার আলোকে বিচার করতে হবে।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, যথেষ্ট কারণ ছাড়া বিলম্ব হয়েছে, এমন অনুমান স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা উচিত নয়। বিলম্ব ইচ্ছাকৃত বা অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল, এমন ধারণাও প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করা যায় না।
৫. কারিগরি কারণে ন্যায়বিচার ব্যাহত করা উচিত নয়
হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়, ন্যায়বিচার এবং কারিগরি বিবেচনা পরস্পরের বিপরীতে দাঁড়ালে যথাযথ ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। অনিচ্ছাকৃত বিলম্বের কারণে কোনো পক্ষের মামলা শুনানির সুযোগ হারানো উচিত নয়, কারণ এতে অন্য পক্ষের অন্যায়ভাবে সুবিধা পাওয়ার কোনো অধিকার সৃষ্টি হয় না।
বিচার বিভাগের মর্যাদা কেবল কারিগরি কারণে অন্যায়কে বৈধতা দেওয়ার ক্ষমতায় নয়, বরং অন্যায় দূর করার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে, এমন নীতিও রায়ে তুলে ধরা হয়।
হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা
বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান রায়ে বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের বিলম্ব মওকুফের আবেদনে উল্লিখিত কারণগুলো যথেষ্ট ছিল। জেলা জজ আবেদনটি খারিজ করার সময় প্রযোজ্য আইনি নীতি ও মামলার বাস্তবতা যথাযথভাবে বিবেচনা করেননি। এ কারণে ওই আদেশে হস্তক্ষেপের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
ফলে হাইকোর্ট রুল মঞ্জুর করেন এবং ১ আগস্ট ২০০৪ তারিখে লালমনিরহাটের জেলা জজের দেওয়া আদেশ বাতিল করেন। একই সঙ্গে অন্য আপিল নং ২৮/২০০৪ দায়েরের ১৬৮ দিনের বিলম্ব মওকুফ করেন।
আদালত আপিল আদালতকে সব পক্ষকে অবহিত করে আইন অনুযায়ী আপিলের কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। নির্দেশনায় বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, আপিলটি ২০০৪ সালে দায়ের করা হয়েছিল, তাই দ্রুত কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে।
রায়ে মামলার খরচ সম্পর্কে কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি। আগের অন্তর্বর্তীকালীন আদেশও প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং নিম্ন আদালতের নথি রায়ের অনুলিপিসহ অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ের তাৎপর্য
এই রায়ে হাইকোর্ট স্পষ্ট করেছেন, তামাদি আইনে নির্ধারিত সময়সীমা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিলম্ব মওকুফের আবেদন নিষ্পত্তির সময় আদালতকে সংশ্লিষ্ট কারণ, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থ বিবেচনা করতে হবে। সরকারি সংস্থার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে বিলম্ব হলে তা উপযুক্ত প্রমাণ ও ব্যাখ্যার ভিত্তিতে বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে সরকারি সংস্থা হওয়ার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলম্ব মওকুফ পাওয়ার অধিকার সৃষ্টি হয় না। সরকার ও সাধারণ মামলাকারী উভয়ের ক্ষেত্রেই বিলম্বের যথেষ্ট ও যুক্তিসংগত কারণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
এ মামলায় হাইকোর্ট শুধু আপিল দায়েরের বিলম্ব মওকুফ করেছেন। মূল বিরোধে ১৯৯৭ সালের রায় ও ডিক্রি যোগসাজশমূলক কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেননি। ওই বিষয়ে আপিল আদালতকে আইন অনুযায়ী আপিলের গুণাগুণ বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
Source link
tags]
Leave a Reply