পিস্তলের নল, আত্মরক্ষার যুক্তি ও আইনের শাসনের প্রশ্ন


অপরাধ দমনের অধিকার রাষ্ট্রের, আত্মরক্ষার অধিকার ব্যক্তির। কিন্তু এই দুইয়ের সীমারেখা যখন অস্পষ্ট হয়ে যায়, তখন প্রশ্ন ওঠে—আইন কি ক্ষমতার অধীন, নাকি ক্ষমতাই আইনের অধীন?

রাষ্ট্রের শক্তি কতটা, তা শুধু তার হাতে থাকা অস্ত্র দিয়ে পরিমাপ করা যায় না; বরং সেই অস্ত্র ব্যবহারের ওপর আইন কতটা কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সেটিই রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তির পরিচয়। যে রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগের নামে ক্ষমতার প্রদর্শন প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে যায়, সেখানে আইনের শাসন ধীরে ধীরে ব্যক্তির ইচ্ছার অধীন হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযানে পিস্তল হাতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের অংশগ্রহণ তাই নিছক একটি রাজনৈতিক বিতর্ক নয়। এটি আত্মরক্ষার অধিকার, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্ব এবং ক্ষমতাসীন ব্যক্তির জবাবদিহি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রশ্ন তৈরি করেছে।

১৭ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত ভিডিওতে ইশরাক হোসেনকে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে কয়েকজনকে ধাওয়া করতে দেখা যায়। তাঁর বক্তব্য, মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে অভিযানে গিয়ে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় তিনি আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। ঘটনাটি নিয়ে সমালোচনার পর পুলিশ তদন্তের নির্দেশ দেয়। তাঁর বক্তব্যের সত্যতা, অস্ত্র প্রদর্শনের পরিস্থিতি এবং অভিযানের আইনগত বৈধতা—সবই নিরপেক্ষ তদন্তের বিষয়।

কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্ন: কেউ অপরাধ দমনের উদ্দেশ্যে মাঠে নামলেই কি তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ আইনসম্মত হয়ে যায়? আর আত্মরক্ষার দাবি করলেই কি আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শনের বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়?

আত্মরক্ষার অধিকার আছে, কিন্তু সীমাহীন নয়

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ৯৬ থেকে ১০৬ ধারায় ব্যক্তিগত আত্মরক্ষার অধিকার স্বীকৃত। ধারা ৯৬ অনুযায়ী, আত্মরক্ষার অধিকার যথাযথভাবে প্রয়োগ করে করা কাজ অপরাধ নয়। ধারা ৯৭ শরীর ও সম্পত্তি রক্ষার অধিকার দিয়েছে। অন্যদিকে, ধারা ৯৯ এই অধিকারের সীমা নির্ধারণ করেছে এবং ধারা ১০২ বলেছে, শরীরের ওপর অপরাধমূলক আক্রমণ থেকে যুক্তিসংগত বিপদের আশঙ্কা সৃষ্টি হলে আত্মরক্ষার অধিকার শুরু হতে পারে।

আইনের এই বিধানগুলোর তাৎপর্য অত্যন্ত স্পষ্ট। আত্মরক্ষার জন্য সব সময় প্রথম আঘাতের অপেক্ষা করতে হবে না; কিন্তু বিপদের আশঙ্কা হতে হবে যুক্তিসংগত। একই সঙ্গে আত্মরক্ষার নামে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্ষতি করা যায় না।

ইশরাকের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি হামলার আশঙ্কা করেছিলেন। সেই আশঙ্কা বাস্তব ও তাৎক্ষণিক ছিল কি না, তা তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন। কিন্তু শুধু মাদকবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়া কিংবা সম্ভাব্য বিপদের কথা বলা অস্ত্র প্রদর্শনের বৈধতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত করে না।

এখানে আইনের একটি মৌলিক পার্থক্য মনে রাখা জরুরি—আত্মরক্ষা হলো আসন্ন বা চলমান বিপদ থেকে নিজেকে কিংবা অন্যকে রক্ষার অধিকার; এটি অন্যকে ভয় দেখানো, শাস্তি দেওয়া কিংবা ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অনুমতি নয়।

উচ্চ আদালতের দৃষ্টিতে আত্মরক্ষার প্রশ্ন

আত্মরক্ষার অধিকারের ব্যাখ্যায় বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের বিচারিক নীতি গুরুত্বপূর্ণ। The State v. Md. Abdus Salam, 15 SCOB [2021] HCD 94 মামলার প্রকাশিত সারাংশে দণ্ডবিধির ১০০ ধারার আলোকে আত্মরক্ষার অধিকার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই ধরনের বিচারিক বিশ্লেষণের মূল শিক্ষা হলো, আত্মরক্ষার দাবি মূল্যায়নের সময় বিপদের প্রকৃতি, যুক্তিসংগত আশঙ্কা এবং ব্যবহৃত বলের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করতে হয়।

তবে এই মামলাটি ইশরাকের ঘটনা নিয়ে নয়। তাই এর নাম উল্লেখ করে তাঁর আচরণকে সরাসরি বৈধ বা অবৈধ ঘোষণা করা যাবে না। বরং এর প্রাসঙ্গিক আইনি নীতি বর্তমান ঘটনার তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হবে।

ইশরাকের ক্ষেত্রে প্রশ্ন হবে, তাঁর সামনে কি এমন তাৎক্ষণিক বিপদ তৈরি হয়েছিল, যার কারণে অস্ত্র হাতে নেওয়া যুক্তিসংগত ছিল? অস্ত্র হাতে অন্যদের ধাওয়া করার প্রয়োজনীয়তা কতটা ছিল? পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার পরও কি অস্ত্র প্রদর্শন অব্যাহত ছিল? এসব প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করবে ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং অন্যান্য প্রমাণের ওপর।

আইন কাউকে বিপদের মুখে অসহায় থাকতে বলে না। কিন্তু একই সঙ্গে বিপদের আশঙ্কাকে সীমাহীন ক্ষমতার যুক্তি হিসেবেও গ্রহণ করে না।

লাইসেন্সের বৈধতা আর ব্যবহারের বৈধতা এক নয়

আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স থাকা একটি বিষয়; নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে অস্ত্র প্রদর্শন বা ব্যবহার আইনসম্মত হওয়া আরেকটি বিষয়। লাইসেন্সের শর্ত এবং প্রযোজ্য আইন মেনে চলা প্রত্যেক লাইসেন্সধারীর দায়িত্ব।

প্রশ্নটি তাই শুধু ইশরাকের পিস্তলের লাইসেন্স ছিল কি না, তা নয়। প্রশ্ন হলো, যে পরিস্থিতিতে অস্ত্রটি প্রদর্শন করা হয়েছে, সেই পরিস্থিতিতে প্রদর্শনটি আইনসম্মত ছিল কি না।

একজন সাধারণ নাগরিক অস্ত্র হাতে কাউকে ধাওয়া করলে পুলিশ তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চাইতে পারে, তাঁর আচরণ তদন্ত করতে পারে। একজন প্রতিমন্ত্রীর ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত। বরং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে আইনের প্রতি অধিকতর শ্রদ্ধা ও সংযম প্রত্যাশিত।

কারণ ক্ষমতা যত বড়, তার সঙ্গে যুক্ত জবাবদিহিও তত বড়। দায়িত্ব যত গুরুত্বপূর্ণ, দায়িত্ব পালনের পদ্ধতিও তত বেশি আইনসম্মত হওয়া প্রয়োজন।

পুলিশের ব্যর্থতা কি ব্যক্তিগত অভিযানের বৈধতা তৈরি করে?

ইশরাকের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো, স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের পরও পুলিশ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। যদি সত্যিই পুলিশ অভিযোগ পাওয়ার পর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়ে থাকে, তবে তা অবশ্যই তদন্তের দাবি রাখে। মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

কিন্তু পুলিশের সম্ভাব্য ব্যর্থতা কোনো ব্যক্তিকে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার অবাধ অধিকার দেয় না। জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব হলো প্রশাসনকে সক্রিয় করা, পুলিশের কাছে জবাবদিহি চাওয়া এবং আইনসম্মত অভিযানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

এখানে রাষ্ট্রের একটি মৌলিক নীতি মনে রাখা দরকার: প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা ব্যক্তির সীমাহীন ক্ষমতার পক্ষে যুক্তি হতে পারে না।

আজ যদি একজন জনপ্রতিনিধি পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগে নিজেই অস্ত্র হাতে অভিযান পরিচালনা করেন, তাহলে আগামীকাল অন্য কেউ নিজের বিবেচনায় অন্য কোনো অপরাধ দমনের নামে একই পদ্ধতি অনুসরণ করতে চাইতে পারেন। তখন ব্যক্তিগত বিবেচনা ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ্যে সীমারেখা নির্ধারণ করবে কে?

রাষ্ট্রের কাজ ব্যক্তির শক্তিকে আইন প্রয়োগের বিকল্প বানানো নয়; বরং আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে কার্যকর করা, যাতে নাগরিককে ব্যক্তিগত শক্তির ওপর নির্ভর করতে না হয়।

মাদকবিরোধী অভিযান, কিন্তু কারও অধিকার হরণ নয়

মাদক ব্যবসার অভিযোগ গুরুতর। কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে গণ্য করা যায় না। সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক, তাঁর কাছ থেকে আলামত উদ্ধার, জব্দ তালিকা প্রস্তুত, সাক্ষ্য সংগ্রহ এবং মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনানুগ পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়।

কোনো ব্যক্তি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে সন্দেহ হলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু সন্দেহভাজন ব্যক্তিরও আইনগত অধিকার রয়েছে। অপরাধ দমনের নামে সেই অধিকার উপেক্ষা করা হলে আইন প্রয়োগের নৈতিক ও আইনি ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।

এখানেই আইনের শাসন এবং ব্যক্তিগত শক্তি প্রদর্শনের মধ্যে পার্থক্য। আইনের শাসন প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করে; ব্যক্তিগত ক্ষমতা অনেক সময় নিজের বিবেচনাকেই চূড়ান্ত বলে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

মাদকবিরোধী অভিযানের সাফল্য তাই শুধু কতজনকে ধাওয়া করা হলো বা কতজনকে আটক করা হলো, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। দেখতে হবে, অপরাধের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ হয়েছে কি না, আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে কি না এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কার্যকর বিচার নিশ্চিত করা যাচ্ছে কি না।

তদন্ত হোক, কিন্তু প্রশ্নের বাইরে কেউ নন

ইশরাকের বিরুদ্ধে ওঠা প্রশ্নের নিষ্পত্তি হওয়া উচিত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে। তাঁর আত্মরক্ষার দাবি সত্য কি না, অস্ত্র প্রদর্শন প্রযোজ্য আইন ও লাইসেন্সের শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল কি না এবং অভিযানের পদ্ধতিতে কোনো আইনগত ব্যত্যয় ঘটেছে কি না—এসব বিষয়ে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।

তদন্তের আগেই তাঁকে অপরাধী ঘোষণা করা ন্যায়সংগত নয়। কিন্তু তিনি প্রতিমন্ত্রী বলে তাঁর আচরণকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখাও সমানভাবে অগ্রহণযোগ্য। আইনের শাসন মানে কাউকে আগাম দোষী সাব্যস্ত করা নয়; আবার ক্ষমতাবান বলে কাউকে আগাম দায়মুক্তি দেওয়াও নয়।

প্রকৃত নিরপেক্ষতা হলো, অভিযোগ যার বিরুদ্ধেই উঠুক, একই আইনি মানদণ্ডে তা যাচাই করা।

শেষ কথা

মাদক নির্মূল করতে হবে। অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা থাকলে তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জনের পথ হতে হবে আইনসম্মত।

ইশরাক হোসেনের ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, আত্মরক্ষার অধিকার এবং আইন প্রয়োগের ক্ষমতা এক বিষয় নয়। একটি ব্যক্তির নিরাপত্তা রক্ষার অধিকার; অন্যটি রাষ্ট্রের আইনসম্মত প্রক্রিয়ার অংশ। এই দুইয়ের সীমারেখা মুছে গেলে অপরাধ দমনের নামে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়।

একজন প্রতিমন্ত্রীর হাতে পিস্তল থাকলেই রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় না। রাষ্ট্র শক্তিশালী হয় তখন, যখন পিস্তলধারী ব্যক্তিকেও আইনের সীমা মেনে চলতে হয়। কারণ আইনের শাসনের প্রকৃত পরীক্ষা সাধারণ মানুষের ওপর আইন প্রয়োগে নয়, বরং ক্ষমতাবান ব্যক্তির আচরণকেও আইনের আওতায় আনতে পারার মধ্যে।

মাদকবিরোধী অভিযান হোক, কিন্তু আইনের পথেই। আত্মরক্ষার অধিকার থাকুক, কিন্তু তার নামে ক্ষমতার অবাধ প্রদর্শন নয়। রাষ্ট্রের আইন সবার জন্য সমান—এই নীতিই হোক আমাদের শেষ কথা।

লেখক : জিয়াবুল আলম; আইনজীবী ও কলামিস্ট।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *