নিবন্ধিত দলিল বাতিলে শুধু অস্বীকার যথেষ্ট নয়, হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
নিবন্ধিত দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধনের বিষয়টি কেবল অস্বীকার করলেই তা বাতিল করা যায় না। দলিলের সম্পাদন ও নিবন্ধন নিয়ে আপত্তি থাকলে উপযুক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এমন পর্যবেক্ষণ দিয়ে ৮৫ বছর বয়সী এক মায়ের করা জমির দানপত্র বাতিলের মামলা খারিজের বিরুদ্ধে দায়ের করা রিভিশন আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী গত ২৮ জুলাই সিভিল রিভিশন নং ৮৫৪/২০২৪-এর রায়ে এ সিদ্ধান্ত দেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। আদালত নওগাঁর নিম্ন আদালত ও আপিল আদালতের রায় বহাল রেখে রিভিশনে জারি করা রুল খারিজ করেন। তবে মামলায় কোনো খরচ আরোপ করা হয়নি।
মায়ের অভিযোগ, অসুস্থতার সুযোগে জমির দানপত্র
মামলার নথি অনুযায়ী, নওগাঁর মহাদেবপুরের বাসিন্দা মোছা. আয়জান বেওয়া তাঁর ছেলে মো. ফজলুর রহমানের অনুকূলে সম্পাদিত একটি দানপত্র বাতিল চেয়ে ২০১১ সালে মামলা করেন।
মামলার আরজি অনুযায়ী, ৮৫ বছর বয়সী আয়জান বেওয়া অসুস্থ থাকাকালে তাঁর ছেলে চিকিৎসার জন্য তাঁকে মহাদেবপুরে নিয়ে যান। এ সময় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের যোগসাজশে বিভিন্ন কাগজে তাঁর টিপসই নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
বাদীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালের ১৫ মার্চ তাঁর ছেলে জানান, ২৫ জুলাই ২০১০ তারিখের ৬৮৯৬ নম্বর দলিলের মাধ্যমে তিনি ৭৭ শতাংশ জমি দান করেছেন। তবে বাদীর দাবি ছিল, তিনি ছেলেকে ওই জমি দান করেননি। পরে সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে ২৩ মার্চ ২০১১ তারিখে দলিলটির বিষয়ে জানতে পারেন। এরপর ২০ এপ্রিল ২০১১ তারিখে তিনি দলিল বাতিলের মামলা দায়ের করেন।
বিতর্কিত দলিলের মাধ্যমে আরএস খতিয়ান নং ১৬৮/১-এর ৪৯ নম্বর দাগে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং আরএস খতিয়ান নং ৮২-এর ২১৬, ২১৮, ২৬৫ ও ২১৭ নম্বর দাগে ৬০ দশমিক ৫ শতাংশ জমি হস্তান্তরের কথা বলা হয়। সব মিলিয়ে জমির পরিমাণ ৭৭ শতাংশ।
ছেলের দাবি, স্বেচ্ছায় দান ও দলিল নিবন্ধন
মামলায় বিবাদী ফজলুর রহমান তাঁর মায়ের অভিযোগ অস্বীকার করেন। লিখিত জবাবে তিনি দাবি করেন, জমিগুলো তাঁর মায়ের পৈতৃক সম্পত্তি। বিতর্কিত দলিল সম্পাদনের আগেও তাঁর মা অন্য সন্তানদের নামে জমি হস্তান্তর করেছিলেন।
বিবাদীর বক্তব্য ছিল, তাঁর ভাই মো. ইব্রাহিম হোসেন আগে তাঁর মায়ের মাধ্যমে ৬৭৩১/২০১০ নম্বর দলিলে বোন সুফিয়া বেগমের অনুকূলে ৩৩ শতাংশ জমি হস্তান্তর করেন এবং ৬৮১৬/২০১০ নম্বর দলিলে আবু বকর সিদ্দিকের কাছে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ জমি বিক্রি করা হয়। এসব লেনদেনের বিষয়ে ইব্রাহিম হোসেনের পূর্বজ্ঞান ছিল বলেও বিবাদী দাবি করেন।
ফজলুর রহমানের দাবি, তাঁর মা স্বেচ্ছায় সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে গিয়ে ৬৮৯৬ নম্বর দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধন করেন এবং জমির দখল তাঁকে বুঝিয়ে দেন। তাঁর ভাই মায়ের ওপর প্রভাব খাটিয়ে দলিল বাতিলের মামলা করিয়েছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
বিতর্কিত দলিলের পরও জমি হস্তান্তর
হাইকোর্টের রায়ে উল্লেখ করা হয়, বিতর্কিত দলিল সম্পাদনের পরও আয়জান বেওয়া অন্য দলিলের মাধ্যমে জমি হস্তান্তর করেন। ১১ ডিসেম্বর ২০১১ তারিখে ৮০৩৩ নম্বর দলিলে এ. করিম ও অন্যদের কাছে ৩৩ শতাংশ জমি এবং একই তারিখের ৮০৩২ নম্বর দলিলে মেয়ে সুফিয়া বেগমের কাছে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ জমি হস্তান্তর করা হয়।
রায়ে বলা হয়, এ. করিম ছিলেন সুফিয়া বেগমের স্বামী। সংশ্লিষ্ট সময়ে আয়জান বেওয়া চারটি দলিলের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর করেন, যেগুলো নিয়ে বাদীপক্ষ আপত্তি তোলেনি।
আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিতর্কিত দলিলের পাশাপাশি অন্য দলিলগুলো সম্পাদন ও নিবন্ধনের বিষয়টি বাদীপক্ষ প্রশ্নবিদ্ধ করেনি। ফলে বিতর্কিত দলিল সম্পাদনের সময় আয়জান বেওয়া মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন কি না এবং দলিলটি স্বেচ্ছায় সম্পাদন করেছিলেন কি না, তা নির্ধারণে এসব সাক্ষ্যপ্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সাক্ষ্যে কী উঠে এসেছে
মামলার বিচার চলাকালে বাদীপক্ষ দুজন সাক্ষী এবং বিবাদীপক্ষ চারজন সাক্ষী উপস্থাপন করেন। বাদীপক্ষের প্রথম সাক্ষী ছিলেন আয়জান বেওয়া নিজেই। সাক্ষ্যগ্রহণের পর তাঁর মৃত্যু হলে তাঁর ছেলে মো. ইব্রাহিম হোসেন এবং সুফিয়া বেগমের ছেলে-মেয়েরা মামলায় স্থলাভিষিক্ত হন।
সাক্ষ্যে আয়জান বেওয়া স্বীকার করেন, তিনি নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে বড় মেয়ে সুফিয়াকে এক বিঘা জমি, ছোট মেয়েকে ১০ কাঠা এবং ছেলে ইব্রাহিমকে ১০ কাঠা জমি হস্তান্তর করেছিলেন। তবে তাঁর বক্তব্য ছিল, ফজলু তাঁকে দলিল লেখকের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন এবং তিনি টিপসই দিলেও দলিলটি তাঁকে পড়ে শোনানো হয়নি।
অন্যদিকে, বিবাদীপক্ষের দলিল লেখক মো. আজগর আলী মণ্ডল সাক্ষ্যে বলেন, তিনি আয়জান বেওয়াকে দলিলটি পড়ে শুনিয়েছিলেন এবং এরপর তিনি দলিলে টিপসই দেন। দলিল শনাক্তকারী মো. দুলাল হাসানও জানান, নিবন্ধনের সময় তিনি আয়জান বেওয়াকে শনাক্ত করেছিলেন।
বিবাদীপক্ষের আরেক সাক্ষী আবদুস সালাম, যিনি ফজলুর রহমানের মামাতো ভাই এবং আয়জান বেওয়ার ভাগনে, জানান, আয়জান বেওয়া তাঁর ছেলেকে মামলার জমি দান করেছিলেন।
নিবন্ধিত দলিল বাতিলের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের ব্যাখ্যা
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, নিবন্ধন আইন, ১৯০৮-এর ৩৪, ৩৫, ৫৮ ও ৫৯ ধারায় নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে সাব-রেজিস্ট্রার দলিল নিবন্ধন করেন। নিবন্ধনের পর ওই আইনের ৬০ ধারায় যথাযথ নিবন্ধনের সনদ দেওয়া হয়।
আদালতের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ৬০ ধারার অধীনে সনদ দেওয়া হলে সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় যে দলিলটি আইনে নির্ধারিত পদ্ধতিতে যথাযথভাবে নিবন্ধিত হয়েছে এবং ৫৯ ধারায় উল্লেখিত প্রত্যয়নসংক্রান্ত বিষয়গুলো পালন করা হয়েছে।
তবে আদালত স্পষ্ট করেন, এই অনুমান চূড়ান্ত নয়, বরং খণ্ডনযোগ্য। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি নিবন্ধিত দলিলের সম্পাদন বা নিবন্ধন নিয়ে আপত্তি তুললে সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে প্রমাণ করতে পারেন যে দলিলটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি সম্পাদন ও নিবন্ধন করেননি।
এই মামলায় আয়জান বেওয়া দাবি করেছিলেন, তিনি ফজলুর রহমানের অনুকূলে দলিলটি সম্পাদন ও নিবন্ধন করেননি। কিন্তু দলিলে এবং সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ের টিপসই রেজিস্টারে তিনি টিপসই দেননি, এমন প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।
হাইকোর্ট বলেন, নিবন্ধিত দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধন অস্বীকার করাই দলিল বাতিলের জন্য যথেষ্ট নয়। দলিলে এবং সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন রেজিস্টারে টিপসই দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলে তা প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হয়। এ মামলায় বাদীপক্ষ সেই প্রমাণ উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে।
দুই নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের কারণ পাননি হাইকোর্ট
মহাদেবপুরের সহকারী জজ আদালত ৩১ মে ২০২২ তারিখে অন্য শ্রেণির মামলা নং ৯৬/২০১১ খারিজ করেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আয়জান বেওয়ার উত্তরাধিকারীরা নওগাঁর জেলা জজ আদালতে ২০২২ সালের ১৩১ নম্বর দেওয়ানি আপিল দায়ের করেন।
অতিরিক্ত জেলা জজ, আদালত নং ১, নওগাঁ ১৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে আপিলের রায়ে নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন। পরে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারায় হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করা হয়।
হাইকোর্ট উভয় পক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণ, নিম্ন আদালতের রায় এবং মামলার নথি পর্যালোচনা করেন। আদালত দেখতে পান, দুই নিম্ন আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্যপ্রমাণ ভুলভাবে পড়া বা বিবেচনায় না নেওয়ার কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
রুল খারিজ, বহাল নিম্ন আদালতের রায়
সবশেষে হাইকোর্টের বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী রিভিশন আবেদনে জারি করা রুলের কোনো ভিত্তি নেই বলে সিদ্ধান্ত দেন। ফলে রুল খারিজ করা হয় এবং নিম্ন আদালত ও আপিল আদালতের রায় বহাল থাকে। আদালত মামলায় কোনো খরচ আরোপ করেননি এবং নিম্ন আদালতের নথি ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দেন।
রায়ের মূল তাৎপর্য হলো, নিবন্ধিত দলিলের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করতে হলে শুধু দলিল সম্পাদনের বিষয়টি অস্বীকার করলেই হবে না। প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে দলিল সম্পাদন বা নিবন্ধনের ত্রুটি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তবে এ সিদ্ধান্তের অর্থ এই নয় যে নিবন্ধিত সব দলিলই প্রশ্নাতীত, কারণ হাইকোর্ট নিজেই নিবন্ধনের পক্ষে আইনগত অনুমানকে খণ্ডনযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন।
Source link
tags]
Leave a Reply