ডেঙ্গুকে জৈব অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা তদন্তের দাবি, সরকারকে আইনি নোটিশ


বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তার, প্রাণহানি ও ভাইরাসের জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে বৈজ্ঞানিক তদন্ত এবং জৈব অস্ত্র প্রতিরোধে বিশেষায়িত গবেষণাগার স্থাপনের দাবিতে সরকারকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথ (এমপিএইচ) কোর্সের শিক্ষার্থী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন আজ শনিবার (১৭ অক্টোবর) জনস্বার্থে এ নোটিশ পাঠান।

নোটিশে ডেঙ্গুর পেছনে কোনো শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র বা অপশক্তির গোপন জৈব অস্ত্র ব্যবহারের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ‘বায়োলজিক্যাল ওয়েপন প্রিভেন্টিভ রিসার্চ ল্যাবরেটরি’ স্থাপন এবং এডিস মশা নিধনে বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিবদের পাশাপাশি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বরাবর নোটিশটি পাঠানো হয়েছে। এর একটি অনুলিপি জাতিসংঘের বাংলাদেশস্থ আবাসিক সমন্বয়কারীর কাছেও পাঠানো হয়েছে।

ডেঙ্গুর উৎস ও জিনগত বৈশিষ্ট্য তদন্তের দাবি

আইনি নোটিশে বলা হয়েছে, ডেঙ্গু জ্বর বাংলাদেশে গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। নিয়মিত প্রাণহানি ও বিপুলসংখ্যক মানুষের ভোগান্তিকে শুধু মশার স্বাভাবিক বিস্তারের ফল হিসেবে বিবেচনা না করে এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে নোটিশদাতা মনে করেন।

নোটিশে আন্তর্জাতিক সামরিক বিজ্ঞান, জৈব সন্ত্রাস ও চিকিৎসাবিষয়ক গবেষণার বিভিন্ন গ্রন্থের উল্লেখ করে ডেঙ্গু ভাইরাসকে জৈব অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ঐতিহাসিক পরিকল্পনা ও গবেষণার প্রসঙ্গ তুলে ধরা হয়েছে।

এতে প্রখ্যাত গবেষক বেঞ্জামিন সি. গ্যারেট ও জন হার্টের দ্য এ টু জেড অব নিউক্লিয়ার, বায়োলজিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল ওয়ারফেয়ার (২০০৯) গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে জাপানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন পিএক্স’ নামে একটি গোপন জৈব হামলার পরিকল্পনা করেছিল। নোটিশের দাবি অনুযায়ী, ওই পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে ডেঙ্গু, প্লেগ, কলেরা ও টাইফাসের জীবাণুবাহী মশা ও কীটপতঙ্গ ছড়িয়ে মহামারি সৃষ্টির কৌশল অন্তর্ভুক্ত ছিল।

এ ছাড়া অ্যান্থনি তুরের কেমিক্যাল অ্যান্ড বায়োলজিক্যাল ওয়েপনস অ্যান্ড টেররিজম (২০১৮) গ্রন্থের উল্লেখ করে নোটিশে দাবি করা হয়েছে, মার্কিন সেনাবাহিনীর জৈব এজেন্টের তালিকায় ডেঙ্গু ভাইরাসকে ‘ভাইরাস ভি-৩’ কোডে যুদ্ধোপযোগী জীবাণু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। রোনাল্ড জে. কেন্ডালসহ অন্য বিশেষজ্ঞদের অ্যাডভান্সেস ইন বায়োলজিক্যাল অ্যান্ড কেমিক্যাল টেররিজম কাউন্টারমেজার্স (২০০৮) গ্রন্থের বরাত দিয়ে এতে ডেঙ্গুকে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) ‘ক্যাটাগরি-এ থ্রেট’ হিসেবে তালিকাভুক্ত বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব ঐতিহাসিক ও গবেষণাসংক্রান্ত বক্তব্য নোটিশদাতার উদ্ধৃতি ও দাবি হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে; বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বর্তমান বিস্তারের পেছনে জৈব অস্ত্র ব্যবহারের কোনো প্রমাণ নোটিশের বর্ণনায় দেওয়া হয়নি।

জৈব হামলার আশঙ্কা খতিয়ে দেখার আহ্বান

নোটিশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ এবং এখানে এডিস মশার বিস্তারও ব্যাপক। ডেঙ্গুর সাম্প্রতিক প্রাণঘাতী পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কোনো শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বাংলাদেশকে জৈব অস্ত্রের পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করছে কি না, কিংবা কৃত্রিমভাবে তৈরি কোনো শক্তিশালী ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ানো হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করা প্রয়োজন বলে নোটিশদাতা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

এ লক্ষ্যে রোগতত্ত্ববিদ, ভাইরোলজিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে জরুরি বৈজ্ঞানিক ও ফরেনসিক তদন্ত পরিচালনার দাবি জানানো হয়েছে। ভাইরাসের জিনগত বৈশিষ্ট্য, উৎস ও সংক্রমণপ্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে ডেঙ্গুর বিস্তারের প্রকৃত কারণ নির্ণয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নোটিশে।

আন্তর্জাতিক আইন ও সংবিধানের প্রসঙ্গ

আইনি নোটিশে আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন বিধানের উল্লেখ করা হয়েছে। নোটিশদাতা দাবি করেছেন, বাংলাদেশ ১৯৭৫ সালের জৈব অস্ত্র কনভেনশনের (বিডব্লিউসি) অন্যতম স্বাক্ষরকারী দেশ। কনভেনশনের অনুচ্ছেদ ১(১) ও ১০-এর উল্লেখ করে তিনি জৈব অস্ত্র প্রতিরোধে গবেষণা ও প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অধিকারের বিষয়টি তুলে ধরেছেন।

এ ছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৫৪০ (২০০৪) নম্বর প্রস্তাবের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে জৈব অস্ত্রের বিস্তার ও অপব্যবহার প্রতিরোধে কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে।

নোটিশে বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন এবং ৩২ অনুচ্ছেদে নাগরিকের জীবনের অধিকার রক্ষার বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়েছে, জনস্বাস্থ্য ও নাগরিকদের জীবন রক্ষায় সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

১০ দিনের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি

আইনি নোটিশে সরকারকে আগামী ১০ দিনের মধ্যে তিনটি বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। সেগুলো হলো—

  • বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে ডেঙ্গু ভাইরাসের জিনগত ও ফরেনসিক তদন্ত পরিচালনা এবং এর বিস্তারের পেছনে কৃত্রিম জৈব আক্রমণ রয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা।
  • উচ্চ সুরক্ষাসম্পন্ন ‘বায়োলজিক্যাল ওয়েপন প্রিভেন্টিভ রিসার্চ ল্যাবরেটরি’ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া।
  • এডিস মশা নিধনে বিজ্ঞানসম্মত ও সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

নোটিশে আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া না হলে জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও নাগরিকদের জীবন রক্ষার স্বার্থে সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে জনস্বার্থে রিট পিটিশন (পিআইএল) দায়ের করা হবে।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *