জমি বণ্টন ছাড়া নির্দিষ্ট অংশের মালিকানা ঘোষণা দেওয়া যায় না: হাইকোর্ট


জমির মূল মালিকের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন না হওয়া অবস্থায় নির্দিষ্ট সীমানার জমির মালিকানা ঘোষণা ও দখল পুনরুদ্ধারের ডিক্রি দেওয়া যায় না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ময়মনসিংহে জমির মালিকানা ও দখল নিয়ে বিরোধের এক মামলায় বাদীর পক্ষে দেওয়া নিম্ন আদালতের রায় ও ডিক্রি বাতিল করে আদালত বলেছেন, জমির প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি বণ্টন করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে জমি থেকে উচ্ছেদের অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় বাদীর পক্ষে দেওয়া আগের সিদ্ধান্তও সঠিক নয় বলে মত দিয়েছেন আদালত। তবে বিরোধপূর্ণ জমির ক্রেতা এবং মূল মালিকের উত্তরাধিকারীরা জমি বণ্টনের জন্য মামলা করতে পারবেন।

২০২৬ সালের ৬ আগস্ট দেওয়া এক রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ দেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী। সম্প্রতি এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। সিভিল রিভিশন নম্বর ৫৬১৭/২০২৪-এর এ মামলায় আদালত ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবরের রায় ও ডিক্রি এবং সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন।

১৫ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ

মামলার নথি অনুযায়ী, ময়মনসিংহ সদর এলাকার ৭৮ শতাংশ জমির একটি অংশ নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। জমিটির মূল মালিক ছিলেন বাজিত শেখ। তিনি সিএস খতিয়ান নম্বর ৩৬৮-এর অন্তর্ভুক্ত মোট ৩ দশমিক ৬৮ একর জমির মালিক ছিলেন। এর মধ্যে সিএস দাগ নম্বর ২৭৩৬-এ ছিল ৭৮ শতাংশ জমি।

বাজিত শেখ মারা যাওয়ার পর তাঁর চার ছেলে—জামির্দি শেখ, কানু শেখ, দয়াল শেখ ও হিসাবদি শেখ উত্তরাধিকারী হন। জামির্দি শেখের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমির অংশ বণ্টন ও বিভিন্ন দলিলের মাধ্যমে হস্তান্তর নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।

মতিউর রহমানের দাবি, তিনি ১৯৯৪ সালের ২৭ মার্চ আবদুল গণির কাছ থেকে ১৫ শতাংশ জমি কেনেন। দলিলের মাধ্যমে জমি কেনার পর তিনি ওই জমির দখলও বুঝে নেন এবং তাঁর নামে খতিয়ান প্রস্তুত হয়। কিন্তু ২০০৯ সালের ২৭ এপ্রিল শাহানাজ বেগমের স্বামী কামাল আহমেদ তাঁর তত্ত্বাবধায়ককে সরিয়ে দিয়ে জোরপূর্বক জমির দখল নেন বলে অভিযোগ করেন মতিউর রহমান।

পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও প্রতিকার না পেয়ে তিনি আদালতে স্বত্ব ঘোষণা ও খাস দখল পুনরুদ্ধারের মামলা করেন।

শাহানাজ বেগমের পাল্টা দাবি

মামলায় বিবাদী শাহানাজ বেগম অভিযোগ অস্বীকার করে জানান, বিরোধপূর্ণ জমির অংশ তিনি বিভিন্ন সময়ে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে কিনেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ১৯৯৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি একটি দলিলে পাঁচ শতাংশ এবং একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর আরেকটি দলিলে আরও পাঁচ শতাংশ জমি কেনেন তিনি। পরবর্তী সময়ে তাঁর নামে ১০ শতাংশ জমির খতিয়ানও প্রস্তুত হয়।

শাহানাজ বেগমের দাবি, জমি কেনার পর তিনি মাটি ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ করেন, বিদ্যুৎ-সংযোগ নেন এবং সরকারি রাজস্ব পরিশোধ করেন। তাঁর স্বামী কামাল আহমেদও ২০০৫ সালের ২৯ জুন একই দাগে নয় শতাংশ জমি কিনেছিলেন বলে আদালতে উল্লেখ করা হয়।

বিবাদীপক্ষের যুক্তি ছিল, নিম্ন আদালত তাঁর জমি কেনার দলিল, খতিয়ান, বিদ্যুৎ-সংযোগের কাগজপত্র ও বিলসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি যথাযথভাবে বিবেচনা করেননি। পাশাপাশি জমির মূল মালিকের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন না হওয়া অবস্থায় নির্দিষ্ট সীমানা দেখিয়ে স্বত্ব ঘোষণার মামলা গ্রহণযোগ্য নয় বলেও দাবি করেন তিনি।

নিম্ন আদালতে বাদীর পক্ষে রায়

মতিউর রহমানের করা মামলায় উভয় পক্ষের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ময়মনসিংহের সিনিয়র সহকারী জজ আদালত ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর বাদীর পক্ষে রায় ও ডিক্রি দেন।

ওই রায়ের বিরুদ্ধে শাহানাজ বেগম আপিল করেন। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা জজ আদালত ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর আপিল খারিজ করে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন।

পরে ওই দুই আদালতের রায় ও ডিক্রির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন আবেদন করেন শাহানাজ বেগম। হাইকোর্টে তাঁর পক্ষে আইনজীবী এম এম শাফিউল্লাহ এবং মতিউর রহমানের উত্তরাধিকারীদের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খায়ের এজাজ মাসউদ ও আইনজীবী শেখ শরীফউদ্দিন শুনানি করেন।

জমির দলিল ও মালিকানার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন

হাইকোর্ট রায়ে উল্লেখ করেন, বিরোধপূর্ণ জমির মালিকানার ধারাবাহিকতা প্রমাণের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের দলিলেই গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি রয়েছে। মোতিউর রহমান যে দলিলের মাধ্যমে ১৫ শতাংশ জমি কিনেছেন, সেই জমির আগের মালিকদের মালিকানার ভিত্তি পর্যাপ্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, ১৯৬৭ সালের ৬ জানুয়ারি আলাল উদ্দিন ওরফে আলফাজ ২০ শতাংশ জমি উজির আলী ও নাজির উদ্দিনের কাছে হস্তান্তর করেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ওই জমি আবদুল গণির কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু আলাল উদ্দিন তাঁর পিতা মোহরের কাছ থেকে ওই জমির কতটুকু উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন, তার পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, শাহানাজ বেগমের জমির বিক্রেতাদের মালিকানার ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন ছিল। আদালত বলেন, আলাল উদ্দিন এবং বোহর্দি শেখের ছেলেদের নামে সংশ্লিষ্ট জমির খতিয়ান প্রস্তুত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁদের বিক্রি করা জমির মালিকানার ভিত্তিও স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, জমির মূল মালিক বাজিত শেখের মেয়ে সুরমান, জারিমন ও করিমনকে বাদ দিয়ে প্রস্তুত করা এসএ খতিয়ান সঠিক ছিল না। তাঁদের উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্য অধিকার শুধু ভুল রেকর্ডের কারণে বিলুপ্ত হয় না। আদালত স্পষ্ট করেন, খতিয়ান নিজে মালিকানা সৃষ্টি করে না; প্রকৃত মালিকানা নির্ধারণে দলিল ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক প্রমাণ বিবেচনা করতে হয়।

জমি বণ্টন ছাড়া স্বত্ব ঘোষণা দেওয়া যায় না

হাইকোর্ট বলেন, বাজিত শেখের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সিএস খতিয়ান নম্বর ৩৬৮-এর ২৭৩৬ নম্বর দাগের ৭৮ শতাংশ জমি বণ্টন করা হয়েছিল—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায় ওই জমির কোন নির্দিষ্ট অংশ কার মালিকানায় রয়েছে, তা চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

আদালত এ বিষয়ে আপিল বিভাগের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তও বিবেচনা করেন। রায়ে বলা হয়, অবিভক্ত যৌথ সম্পত্তিতে নির্দিষ্ট সীমানার জমির ওপর একক স্বত্ব ঘোষণার আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট সহ-শরিকদের অন্তর্ভুক্ত করে জমি বণ্টনের প্রতিকারও চাইতে হয়। শুধু স্বত্ব ঘোষণার আবেদন করে জমির নির্দিষ্ট অংশের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা যায় না, যখন সংশ্লিষ্ট জমির অংশীদারদের মধ্যে বণ্টন সম্পন্ন হয়নি।

এ প্রসঙ্গে আদালত Enjaheruddin Mia alias Md. Enjaheruddin Mia বনাম Mohammad Hossain and others মামলায় ১৮ বিএলডি (আপিল বিভাগ) ৭৭ এবং Jahangir Alam (Md) and others বনাম Sabdir Ahmed and others মামলায় ২২ বিএলসি (আপিল বিভাগ) ৭৫-এ দেওয়া সিদ্ধান্তের নীতির ওপর নির্ভর করেন।

হাইকোর্টের মতে, এ মামলায় দুই পক্ষেরই মালিকানার দাবি রয়েছে। কিন্তু জমির মূল মালিকের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন না হওয়ায় এবং বিক্রেতাদের মালিকানার ধারাবাহিকতা পর্যাপ্তভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় বিরোধপূর্ণ জমির নির্দিষ্ট অংশের স্বত্ব নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

জমি থেকে উচ্ছেদের অভিযোগও প্রমাণিত হয়নি

মালিকানার প্রশ্নের পাশাপাশি আদালত জমির দখল নিয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করেন। শাহানাজ বেগমের পক্ষে জমি কেনার দলিল, তাঁর নামে প্রস্তুত খতিয়ান, বিদ্যুৎ-সংযোগের নথি, নিরাপত্তা জামানতের কাগজপত্র এবং বিদ্যুৎ বিল আদালতে উপস্থাপন করা হয়।

আদালত দেখতে পান, ১৯৯৭ সালে জমি কেনার পর শাহানাজ বেগম সেখানে মাটি ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ করেন এবং ২০০২ সালে বিদ্যুৎ-সংযোগ নেন। এসব নথি ও সাক্ষ্য বিবেচনায় আদালত মনে করেন, তিনি কেনা ১০ শতাংশ জমি ভোগদখলে রেখেছিলেন।

অন্যদিকে, মোতিউর রহমান ২০০৯ সালের ২৭ এপ্রিল জমি থেকে উচ্ছেদ হয়েছিলেন—এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ দিতে পারেননি। ফলে নিম্ন আদালত বাদীর দখল ও পরবর্তী উচ্ছেদের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন, তা সঠিক ছিল না বলে মন্তব্য করেন হাইকোর্ট।

আদালত বলেন, স্বত্ব ঘোষণা ও খাস দখল পুনরুদ্ধারের মামলায় বাদীকে নির্দিষ্ট সীমানার জমিতে নিজের দখল এবং পরবর্তী সময়ে সেখান থেকে উচ্ছেদের বিষয়টি প্রমাণ করতে হয়। এ মামলায় বাদী সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেননি।

নিম্ন আদালতের রায় ও ডিক্রি বাতিল

সব দিক বিবেচনায় হাইকোর্ট সিদ্ধান্ত দেন, নিম্ন আদালতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও সাক্ষ্য যথাযথভাবে বিবেচনা না করে রায় দিয়েছিলেন। এতে প্রাসঙ্গিক প্রমাণের ভুল পাঠ ও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বিবেচনায় না নেওয়ার কারণে আইনের ভুল হয়েছে এবং ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়েছে।

আদালত রুল মঞ্জুর করে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা জজ আদালতের ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবরের রায় ও ডিক্রি এবং সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন। রুল জারির সময় দেওয়া স্থগিতাদেশও প্রত্যাহার করা হয়।

তবে হাইকোর্ট শাহানাজ বেগমকে বিরোধপূর্ণ পুরো জমির চূড়ান্ত মালিক ঘোষণা করেননি। আদালত বলেছেন, বাজিত শেখের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ৭৮ শতাংশ জমি বণ্টনের পরই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর স্বত্ব নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। জমির ক্রেতা অথবা বাজিত শেখের উত্তরাধিকারীরা এ বিষয়ে জমি বণ্টনের মামলা করতে পারবেন।

রায়ের পর নিম্ন আদালতের নথি অবিলম্বে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *