কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে আইনজীবীদের ওপর হামলার অভিযোগ, ট্যুরিস্ট পুলিশের দুই সদস্যসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে এজাহার
নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার: কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের কয়েকজন আইনজীবীর ওপর হামলা, মারধর, ছিনতাই ও হত্যার হুমকির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ট্যুরিস্ট পুলিশের দুই সদস্যসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে কক্সবাজার সদর মডেল থানায় এজাহার দেওয়া হয়েছে।
গত ২১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট মো. শাহীন আলম বাদী হয়ে এ এজাহার দেন। এতে ট্যুরিস্ট পুলিশের কক্সবাজার সৈকত জোনের এএসআই আরজু, কনস্টেবল শাহাদাত এবং হকার আনোয়ারসহ অজ্ঞাতনামা ১২/১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে।
এজাহারে দণ্ডবিধির ১৪৩, ১৪৭, ১৪৮, ৩২৩, ৩২৫, ৩২৬, ৩০৭, ৩৭৯, ৩৮৫, ৫০৬, ১০৯ ও ৩৪ ধারায় মামলা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধ
এজাহারে বলা হয়, বাদী মো. শাহীন আলম ও তাঁর সহকর্মী আইনজীবীরা গত ১৮ আগস্ট কক্সবাজারে ভ্রমণে আসেন এবং ১৯ আগস্ট থেকে শহরের প্রসাদ প্যারাডাইস হোটেলে অবস্থান করছিলেন।
২০ আগস্ট সকাল আনুমানিক ১১টা ৫৫ মিনিটে তাঁরা হোটেলের বিপরীত পাশে সমুদ্রসৈকতে গোসল ও ফুটবল খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এ সময় হকার আনোয়ার তাঁদের খেলার জায়গার মাঝখানে তাঁর খেলনার দোকান বসান।
আইনজীবীরা দোকানটি কিছুটা পাশে সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ করলে আনোয়ার ক্ষিপ্ত হয়ে গালিগালাজ করেন এবং মারধরের জন্য তেড়ে আসেন বলে এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে তিনি তাঁদের ফুটবলটি লাথি মেরে সাগরে ফেলে দেন।
পরে ফুটবলটি তুলে নিয়ে আইনজীবীরা পাশে গিয়ে খেলা শুরু করলে কিছুক্ষণ পর আনোয়ার ১২/১৩ জন সহযোগীকে নিয়ে তাঁদের ওপর হামলা করেন বলে অভিযোগ করা হয়।
ট্যুরিস্ট পুলিশের দুই সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ
এজাহারে আরও বলা হয়, হামলার প্রায় ৮-১০ মিনিট পর আনোয়ারের সহযোগীরা ট্যুরিস্ট পুলিশের কনস্টেবল শাহাদাতকে সঙ্গে নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন এবং কোনো কারণ ছাড়াই আইনজীবীদের ফুটবলটি জোর করে নিয়ে যান।
ফুটবল নিয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে কনস্টেবল শাহাদাত আইনজীবী ফিরোজ আলমকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এর কিছুক্ষণ পর ট্যুরিস্ট পুলিশের এএসআই আরজু ঘটনাস্থলে আসেন। তিনিও কনস্টেবল শাহাদাতের পক্ষ নিয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাতুড়ি দিয়ে মাথায় আঘাতের অভিযোগ
এজাহারের অভিযোগ অনুযায়ী, এএসআই আরজু আইনজীবী রাহাদুল ইসলাম ওরফে রাহাদকে হত্যার উদ্দেশ্যে গলা চেপে ধরে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেন। এরপর হকার আনোয়ার তাঁর হাতে থাকা হাতুড়ি দিয়ে রাহাদের মাথায় আঘাত করেন।
রাহাদ মাটিতে পড়ে গেলে আঘাত তাঁর বাম পায়েও লাগে এবং এতে তাঁর হাড় ভেঙে গুরুতর জখম হয় বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া কনস্টেবল শাহাদাত আইনজীবী জালালকে হত্যার উদ্দেশ্যে পেটে লাথি মেরে ফেলে দেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
বাদীর দাবি, ওই সময় আনোয়ার ও তাঁর ১২/১৩ জন সহযোগী এএসআই আরজু ও কনস্টেবল শাহাদাতের উপস্থিতিতে ও সহায়তায় আইনজীবীদের হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করেন।
পর্যটকদের প্রতিবাদ
এ সময় ঘটনাস্থলে থাকা কয়েকজন পর্যটক ও অন্যান্য লোকজন হামলার প্রতিবাদ করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আরাফাত, মিছান মোল্লা, সাগর, ফারহানা শ্রাবণী, শিহাব ও ফাহিমের নাম ও মোবাইল নম্বর এজাহারে সাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ করা হয়েছে, প্রতিবাদকারীদেরও আসামিরা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ
এজাহারে আরও গুরুতর অভিযোগ করা হয়েছে। বাদীর দাবি, চলে যাওয়ার সময় হকার আনোয়ার প্রকাশ্যে বলেন, “পুলিশ আমাদের কেনা, ওদেরকে আমরা ডেইলি টাকা দিই, আমরা এখানে যা বলবো তাই হবে।”
এ ছাড়া সমুদ্রসৈকতে ছাতা ভাড়া দেওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে তাঁরা জানতে পারেন, এএসআই আরজু ও কনস্টেবল শাহাদাত সৈকতের হকারদের কাছ থেকে প্রতিদিন অবৈধভাবে চাঁদা নেন এবং এর বিনিময়ে হকারদের বিভিন্ন অবৈধ কাজে সহযোগিতা করেন।
তবে এসব অভিযোগ এজাহারে বাদীপক্ষের করা অভিযোগ; তদন্তে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই হওয়ার বিষয় রয়েছে।
টাকা ছিনিয়ে নেওয়া ও হত্যার হুমকির অভিযোগ
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, পুলিশ সদস্যরা চলে যাওয়ার পর অন্য আসামিরা আইনজীবীদের উদ্দেশে হুমকি দিয়ে বলেন, “কাল সকালে যেন তোদের কক্সবাজারে না দেখি, দেখলে জানে মেরে ফেলবো।”
একপর্যায়ে হামলাকারীরা আইনজীবী জালালের কাছ থেকে আক্রমণ করে ৪ হাজার ৫০০ টাকা ছিনিয়ে নেয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আইনজীবী ফিরোজ আলমকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারধর করে গুরুতর আহত করার এবং আনোয়ার তাঁর হাতে থাকা হাতুড়ি দিয়ে ফিরোজের মাথায় আঘাত করার অভিযোগও করা হয়েছে।
চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে আশপাশের লোকজন জড়ো হতে থাকলে আসামিরা জীবননাশের হুমকি দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা
এজাহারে বলা হয়, আহতদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁদের চিকিৎসার জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাঁদের চিকিৎসা দেন এবং ওষুধ সেবন ও সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকার পরামর্শ দেন।
আহতদের চিকিৎসা, পরিবারের সদস্য ও সিনিয়র আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা শেষে থানায় এসে এজাহার দিতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলেও বাদী উল্লেখ করেছেন।
মামলা নেওয়ার আবেদন
ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এজাহারে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৪৩/১৪৭/১৪৮/৩২৩/৩২৫/৩২৬/৩০৭/৩৭৯/৩৮৫/৫০৬/১০৯/৩৪ ধারায় মামলা রুজু করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে আবেদন করা হয়েছে।
এজাহারের সঙ্গে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্রের তিন পৃষ্ঠা ফটোকপি সংযুক্ত করা হয়েছে।
Source link
tags]
Leave a Reply