এমপিওভুক্তদের নতুন শর্তের বেড়াজালে আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না


বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগকালীন বিধিমালা উপেক্ষা করে নতুন কোনো শর্ত বা বিধি অতীত থেকে বলবৎ দেখিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীদের আইনগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না, মর্মে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

এমপিও সংক্রান্ত চার শিক্ষকের করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল যথাযথ ঘোষণা করে দেওয়া রায়ে এমন যুগান্তকারী পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ‘মো. আবু হানিফ ও অন্যান্য বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য’ শীর্ষক মামলায় হাইকোর্ট এমন পর্যবেক্ষণ দেন।

গত ৩০ জুন বিচারপতি শশাঙ্ক শেখর সরকার এবং বিচারপতি উর্মি রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চের দেওয়া ওই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি আজ সোমবার (১০ আগস্ট ) প্রকাশিত হয়েছে। ওই মামলার মূল রায়টি লিখেছেন বেঞ্চের কনিষ্ঠ বিচারপতি উর্মী রহমান।

রায় প্রদানকালে আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. আতাউর রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ ওয়ালিউল ইসলাম অলি ও মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান।

মামলার পটভূমি

মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আলোকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রবিধান (রেগুলেশন ২০১৫) অনুসরণ করে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার রোজি মোজাম্মেল মহিলা কলেজে অর্থনীতি, মনোবিজ্ঞান, ইংরেজি ও সমাজকল্যাণ বিভাগে প্রভাষক (তৃতীয় শিক্ষক) পদে ২০১৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর নিয়োগ পান মো. আবু হানিফসহ চারজন শিক্ষক। নিয়োগের পরদিন ৩০ ডিসেম্বর তারা প্রভাষক পদে যোগদান করেন।

পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের ১৯ এপ্রিল কলেজটি এমপিওভুক্ত হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তারিখের এনটিআরসিএ পরিপত্রের পূর্বে বিজ্ঞপ্তিপ্রাপ্ত এবং ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নিয়োগপ্রাপ্ত তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির সুযোগ দেওয়া হয়।

সেই মোতাবেক মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) কর্তৃক প্রকাশিত ৭২৬ জন শিক্ষকের তালিকায় তাদের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু চূড়ান্ত পর্যায়ে অনলাইন প্রক্রিয়ায় তাদের এমপিও আবেদন এই অজুহাতে নামঞ্জুর করা হয় যে, তাদের ‘NTRCA সনদ নেই’। পরে ওই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেই চার শিক্ষক উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেন।

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ও সিদ্ধান্ত

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের প্রশাসনিক প্রয়োজনে চাকরির বিধিমালা পরিবর্তন বা পরিমার্জনের এখতিয়ার রয়েছে, তবে তা কোনোভাবেই ইতোপূর্বে চাকরিতে যোগদানকারী কর্মচারীর অর্জিত অধিকারকে ক্ষুণ্ন করতে পারে না।

রায়ে নিয়োগকালীন প্রবিধানের প্রাধান্য পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে আদালত বলেছেন, ২০১৫ সালে যখন এই চার শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়, তখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধিমালায় এনটিআরসিএ সনদের কোনো শর্ত ছিল না। ডিগ্রি (পাস) পর্যায়ের কলেজ শিক্ষকদের জন্য এই সনদের বাধ্যবাধকতা ২০১৯ সালের প্রবিধানে প্রথম জারি করা হয়।

আদালত আরও বলেছেন, রাষ্ট্রপক্ষ তৃতীয় শিক্ষক পদটি জনবল কাঠামোতে নেই বলে দাবি করলেও সরকার নিজেই একাধিক পরিপত্রের মাধ্যমে তৃতীয় শিক্ষকদের এমপিও সুবিধার আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে এই দাবির কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

আদালত বলেন, এমপিও মঞ্জুর করা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয় হলেও, তা যদি যুক্তিসঙ্গত আইনি ভিত্তি ছাড়া খেয়ালখুশিমতো বা স্বেচ্ছাচারী উপায়ে করা হয়, তবে তা সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচার্য বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

চূড়ান্ত রায়ে হাইকোর্ট এনটিআরসিএ সনদ না থাকার অজুহাতে চার প্রভাষকের এমপিও আবেদন প্রত্যাখ্যানের অনলাইন সিদ্ধান্তকে বাতিল করে ২০২৪ সালের নভেম্বর মাস থেকে রিটকারী চারজনের নাম মান্থলি পে অর্ডার (এমপিও) তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন।

রায়ে আদেশের অনুলিপি প্রাপ্তির ৬০ (ষাট) দিনের মধ্যে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে প্রযোজ্য সব বকেয়াসহ আর্থিক সুবিধাদি চার রিটকারীদের পরিশোধ করার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিবসহ বিবাদীদের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *