ডিসঅনার স্লিপ না থাকলেই চেকের মামলা ব্যর্থ হয়ে যায় না: হাইকোর্ট


ব্যাংকের চেক প্রত্যাখ্যানের স্লিপ বা ‘ডিসঅনার স্লিপ’ আদালতে উপস্থাপন করা না হলেই সংশ্লিষ্ট মামলা ব্যর্থ হবে না বলে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারার মামলায় চেক প্রত্যাখ্যানের ঘটনা অন্য গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রতিষ্ঠিত হলে শুধু ডিসঅনার স্লিপের অনুপস্থিতিকে আসামির খালাসের একমাত্র ভিত্তি করা যায় না।

ঢাকার শেয়ারবাজারকেন্দ্রিক লেনদেনের সূত্রে ২৫ লাখ টাকার চেক প্রত্যাখ্যানের মামলায় নিম্ন আদালতের খালাসের রায় বাতিল করে অভিযুক্ত নাজিনা হাসিনকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন হাইকোর্ট। তাঁকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং চেকের সমপরিমাণ ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ আইন অনুযায়ী অভিযোগকারীকে পরিশোধের নির্দেশও দিয়েছেন আদালত।

বিচারপতি মো. বশির উল্লাহ গত ১৩ সেপ্টেম্বর এ রায় দেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। ফৌজদারি আপিল নং ৬৮৬৭/২০১৮-এ দেওয়া রায়ে আদালত ঢাকার মহানগর যুগ্ম দায়রা জজ, প্রথম আদালতের ২০১৮ সালের ১৪ মার্চের খালাসের রায় বাতিল করেন।

যে কারণে মামলা

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযোগকারী নিজাম উদ্দিন মাহমুদ অভিযুক্ত নাজিনা হাসিনের ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার লেনদেন করতেন। তাঁদের মধ্যে একাধিক লেনদেনের পর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বকেয়া হয়। এ বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে ২০১২ সালের ২৬ এপ্রিল উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হয়।

সমঝোতা অনুযায়ী, আইনগতভাবে পরিশোধযোগ্য দায়ের বিপরীতে নাজিনা হাসিন অভিযোগকারীর অনুকূলে পাঁচটি চেক দেন। এর মধ্যে সিটি ব্যাংক লিমিটেডের ইসলামী ব্যাংকিং শাখা, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ইউনিটে পরিচালিত হিসাবের ১০২৮০৮১ নম্বর চেকটি ছিল ২৫ লাখ টাকার। চেকটির তারিখ ছিল ২০১২ সালের ২০ মে।

অভিযোগকারী ২০১২ সালের ১০ সেপ্টেম্বর চেকটি ব্যাংকে নগদায়নের জন্য জমা দেন। পরদিন, ১১ সেপ্টেম্বর, ‘পর্যাপ্ত অর্থ নেই’ মর্মে চেকটি প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপর ১৯ সেপ্টেম্বর অভিযুক্তের স্বীকৃত ঠিকানায় রেজিস্ট্রি ডাকযোগে প্রাপ্তিস্বীকারপত্রসহ আইনি নোটিশ পাঠানো হয়। অভিযোগকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, নোটিশটি ২৫ সেপ্টেম্বর গ্রহণ করা হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চেকের অর্থ পরিশোধ করা হয়নি।

এ পরিস্থিতিতে ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে সি.আর. মামলা নং ২৫৫৪/২০১২ দায়ের করা হয়। পরে মামলাটি মহানগর দায়রা আদালত হয়ে মহানগর যুগ্ম দায়রা জজ, প্রথম আদালতে স্থানান্তরিত হয় এবং মহানগর দায়রা মামলা নং ৪৩৯৪/২০১৩ হিসেবে বিচার চলে। ২০১৪ সালের ৩০ জানুয়ারি নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় অভিযোগ গঠন করা হয়।

বিচার শেষে ২০১৮ সালের ১৪ মার্চ আদালত নাজিনা হাসিনকে খালাস দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী ফৌজদারি আপিল করেন।

আপিলের সময় হারিয়ে যায় ডিসঅনার স্লিপ

আপিল চলাকালে অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ উপস্থাপনের আবেদন করা হয়। তাঁর আইনজীবীর বক্তব্য ছিল, বিচার চলার সময় অভিযোগকারী সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়ার সময় চেক প্রত্যাখ্যানের স্লিপ আদালতে উপস্থাপন করেছিলেন এবং সেটি প্রদর্শনী-২ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যুক্তিতর্কের পর্যায়ে নথিতে ওই স্লিপটি খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এটি পুনরুদ্ধারের আবেদন ২০১৭ সালের ৩০ জুলাই করা হলেও বিচারিক আদালত ২৯ অক্টোবর তা নাকচ করেন এবং মূল ডিসঅনার স্লিপ দাখিল করতে বলেন। পরে অভিযোগকারী ব্যাংক কর্তৃক সত্যায়িত স্লিপ, মূল ব্যাংক বিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাকে সাক্ষী হিসেবে হাজির করার আবেদন করেন। এসব আবেদনও শেষ পর্যন্ত খালাসের রায়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যাত হয়।

হাইকোর্ট ২০২৬ সালের ৩ মে অতিরিক্ত সাক্ষ্যগ্রহণের আবেদন মঞ্জুর করে চেক প্রত্যাখ্যানসংক্রান্ত অতিরিক্ত প্রমাণ গ্রহণের নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশে ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখে অভিযোগকারীর অতিরিক্ত সাক্ষ্য নেওয়া হয়। এ সময় ব্যাংক কর্তৃক সত্যায়িত ডিসঅনার স্লিপের অনুলিপি প্রদর্শনী-৮ এবং ২০১৭ সালের ২ আগস্টের মূল ব্যাংক বিবরণী প্রদর্শনী-৯ হিসেবে নথিভুক্ত হয়।

রায়ে উল্লেখ করা হয়, অতিরিক্ত সাক্ষ্যগ্রহণের সময় অভিযুক্ত আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তবে তিনি অভিযোগকারীকে জেরা করেননি এবং প্রদর্শনী-৮ ও ৯ নথিভুক্ত করার বিরুদ্ধেও কোনো আপত্তি তোলেননি।

অভিযোগকারীর বক্তব্য

আপিলকারীর আইনজীবী মো. মুনিরুজ্জামান আদালতে যুক্তি দেন, বিচারিক আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথভাবে মূল্যায়ন না করে অভিযুক্তকে খালাস দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগকারী চেক প্রত্যাখ্যানের ঘটনা এবং আইনি নোটিশ পাঠানোর বিষয়টি সাক্ষ্যে প্রমাণ করেছেন।

আইনজীবী আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, মামলার নথিতে থাকা প্রদর্শনী-৭-এ নাজিনা হাসিনের ২০১২ সালের ২৯ এপ্রিল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে দেওয়া একটি লিখিত বক্তব্য রয়েছে। সেখানে তিনি পাঁচটি চেক দেওয়ার কথা স্বীকার করেছিলেন। চেকগুলোর মধ্যে ৫০ লাখ, ২০ লাখ, ২০ লাখ, ২৫ লাখ ও ২৫ লাখ টাকার চেক ছিল। এর মধ্যে দুটি চেক নগদায়ন হয় এবং তিনটি প্রত্যাখ্যাত হয় বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। প্রত্যাখ্যাত তিনটি চেকের জন্য পৃথক মামলা করা হয়েছিল।

অভিযোগকারীর পক্ষ আরও যুক্তি দেয়, প্রদর্শনী-৩/১-এ ডাক রসিদের মাধ্যমে অভিযুক্তের স্বীকৃত ঠিকানায় নোটিশ পাঠানোর প্রমাণ রয়েছে এবং প্রদর্শনী-৩/২-এ ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১২ তারিখে নোটিশ গ্রহণের তথ্য রয়েছে। সাধারণ ধারা আইন, ১৮৯৭-এর ২৭ ধারার বিধান অনুযায়ী, নির্ধারিত নিয়মে সঠিক ঠিকানায় রেজিস্ট্রি ডাকযোগে নোটিশ পাঠানো হলে বিপরীত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত যথাযথভাবে নোটিশ পৌঁছেছে বলে অনুমান করা যায়—এ যুক্তিও তুলে ধরা হয়।

আসামিপক্ষের আপত্তি

নাজিনা হাসিনের পক্ষে আইনজীবী মো. গোলাম কিবরিয়া যুক্তি দেন, অভিযোগ দায়েরের সময় ডিসঅনার স্লিপ অভিযোগপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়নি। অভিযোগকারীর সাক্ষ্যগ্রহণের সময়ও মূল স্লিপ উপস্থাপন করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, প্রদর্শনী-৬ ও ৭ দেরিতে নথিভুক্ত হওয়ায় সেগুলোর গ্রহণযোগ্যতা ও সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আসামিপক্ষ আরও দাবি করে, সংশ্লিষ্ট চেকটি নিরাপত্তা জামানত হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ৭০ লাখ টাকা পরিশোধের পর তিনটি চেক ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও অভিযোগকারী চেকগুলো ফেরত দেননি। আইনি নোটিশের প্রাপ্তিস্বীকারপত্রে ‘সোহাগ’ নামের একজনের স্বাক্ষর থাকলেও তিনি অভিযুক্তের অনুমোদিত প্রতিনিধি বা কর্মচারী ছিলেন কি না, তা প্রমাণিত হয়নি বলেও আপত্তি তোলা হয়।

অতিরিক্ত সাক্ষ্যগ্রহণের সময় কার্যকরভাবে জেরা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি—এমন যুক্তিও আসামিপক্ষ তুলে ধরে। তবে হাইকোর্ট নথি পর্যালোচনা করে দেখতে পান, অভিযুক্ত জেরা করেননি এবং জেরার জন্য সময়ও চাননি। ব্যাংকের সত্যায়িত স্লিপ ও ব্যাংক বিবরণী উপস্থাপনের সময়ও কোনো আপত্তি তোলা হয়নি।

শুধু ডিসঅনার স্লিপ না থাকাই খালাসের যথেষ্ট কারণ নয়

হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণে বলেন, ব্যাংকের ডিসঅনার স্লিপ বা রিটার্ন মেমো চেক প্রত্যাখ্যানের ঘটনা প্রমাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। তবে শুধু এই নথি উপস্থাপন করা হয়নি বলে সব ক্ষেত্রে মামলাটি ব্যর্থ হবে—আইন এমন বাধ্যবাধকতা আরোপ করে না। চেক ব্যাংকে উপস্থাপন ও প্রত্যাখ্যানের ঘটনা নথিতে থাকা অন্যান্য আইনসম্মত ও বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির মাধ্যমে প্রমাণিত হলে সেগুলোর সামগ্রিক মূল্যায়ন করতে হবে।

আদালতের মতে, বিচারিক আদালত ডিসঅনার স্লিপ প্রদর্শনী হিসেবে না থাকাকে চূড়ান্ত গুরুত্ব দিয়ে অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণ যথাযথভাবে বিবেচনা করেননি। এতে সাক্ষ্যপ্রমাণ মূল্যায়নে অতিরিক্ত কারিগরি দৃষ্টিভঙ্গি নেওয়া হয়েছে এবং মামলার সামগ্রিক প্রমাণ উপেক্ষিত হয়েছে।

হাইকোর্ট আরও বলেন, অভিযোগকারী চেকটি উপস্থাপন ও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বিষয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ জেরায় নড়বড়ে হয়নি। চেকের অর্থ দাবি করে আইনি নোটিশ পাঠানো এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ না করার ঘটনাও অভিযোগকারীর বক্তব্যকে সমর্থন করে।

চেকের স্বাক্ষর স্বীকার করলে প্রমাণের ভার আসামির ওপর

রায়ে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ১১৮(ক) ধারার বিধানও আলোচনা করা হয়েছে। আদালত বলেন, চেক সম্পাদন ও স্বাক্ষর স্বীকার করা হলে বা প্রমাণিত হলে চেকটি প্রতিদানের বিনিময়ে দেওয়া হয়েছে—এমন আইনগত অনুমান চেকধারীর পক্ষে কার্যকর হয়, যদি না বিপরীতটি প্রমাণিত হয়।

এ ক্ষেত্রে শুধু মৌখিকভাবে চেকটি নিরাপত্তা জামানত হিসেবে দেওয়া হয়েছিল বা কোনো দেনা ছিল না বলে দাবি করলেই আইনগত অনুমান খণ্ডিত হয় না। এর বিপরীতে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ বা সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠা করার মতো সাক্ষ্যপ্রমাণ প্রয়োজন।

আদালত আরও উল্লেখ করেন, প্রদর্শনী-৯ হিসেবে দাখিল করা মূল ব্যাংক বিবরণী চেকটি ১১ সেপ্টেম্বর ২০১২ তারিখে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় প্রত্যাখ্যাত হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে। পাশাপাশি, নোটিশ পাঠানো ও গ্রহণের প্রমাণ এবং অভিযুক্তের পক্ষ থেকে নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ না করার বিষয়টিও আদালতের বিবেচনায় আসে।

এসব প্রমাণের সামগ্রিক মূল্যায়নে হাইকোর্ট মনে করেন, অভিযোগকারী নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার অভিযোগ যুক্তিসংগত সন্দেহের ঊর্ধ্বে প্রমাণ করতে পেরেছেন।

খালাসের রায় বাতিল, ছয় মাসের কারাদণ্ড

সবশেষে হাইকোর্ট ফৌজদারি আপিল মঞ্জুর করেন এবং ২০১৮ সালের ১৪ মার্চ ঢাকার মহানগর যুগ্ম দায়রা জজ, প্রথম আদালতের দেওয়া খালাসের রায় বাতিল করেন। আদালত নাজিনা হাসিনকে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার অর্থ অভিযোগকারীকে পরিশোধ করতে হবে।

রায়ের অনুলিপি পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নাজিনা হাসিনকে সাজা ভোগের জন্য বিচারিক আদালতে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে সাজা কার্যকর ও তাঁকে গ্রেপ্তার করতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন হাইকোর্ট।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *