উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিক না হলে জমির অগ্রক্রয় আবেদন অগ্রহণযোগ্য, হাইকোর্টের রায়


জমির প্রি-এম্পশন বা অগ্রক্রয় অধিকার দাবি করতে হলে উত্তরাধিকারসূত্রে সংশ্লিষ্ট জমির সহ-শরিক হতে হবে—এমন বিধানের ভিত্তিতে একটি প্রি-এম্পশন আবেদন খারিজের আদেশ পুনর্বহাল করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে আপিলযোগ্য আদেশের বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে রিভিশন গ্রহণ করে তা বাতিল করার সিদ্ধান্তকেও আইনগত এখতিয়ারবহির্ভূত বলে উল্লেখ করেছেন আদালত।

লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জে ২৪ শতাংশ জমির প্রি-এম্পশন-সংক্রান্ত মামলায় ২০২৬ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক রায়ে এসব পর্যবেক্ষণ দেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি রেজাউল করিম। সিভিল রিভিশন নম্বর ৬৩৩/২০০৯-এর রায়ে আদালত লক্ষ্মীপুরের জেলা জজের ২০০৯ সালের ২৮ জানুয়ারির আদেশ বাতিল করে রামগঞ্জের সহকারী জজের ২০০৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারির আদেশ পুনর্বহাল করেন। সম্প্রতি এই রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে।

২৪ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধ

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ১৮ এপ্রিল নিবন্ধিত বিনিময় দলিলের মাধ্যমে রায়হানা বেগমের স্বামী ২৪ শতাংশ জমি আবদুর রশিদ পাটোয়ারীর কাছে হস্তান্তর করেন। ওই জমির অগ্রক্রয় অধিকার দাবি করে রায়হানা বেগম ২০০৭ সালের ১৭ জুন লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জের সহকারী জজ আদালতে বিবিধ মামলা নম্বর ৮৯/২০০৭ দায়ের করেন।

আবেদনে রায়হানা বেগম দাবি করেন, ১৯৯৬ ও ১৯৯৮ সালের দুটি নিবন্ধিত বিক্রয় দলিল এবং ২০০২ সালের একটি নিবন্ধিত বিনিময় দলিলের মাধ্যমে তিনি সংশ্লিষ্ট হোল্ডিংয়ের অংশীদার হয়েছেন। তিনি নিজেকে ক্রয় ও বিনিময়ের মাধ্যমে সহ-শরিক এবং আবদুর রশিদ পাটোয়ারীকে বহিরাগত ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

তাঁর অভিযোগ ছিল, জমি হস্তান্তরের দলিলটি প্রকৃতপক্ষে বিক্রয় দলিল হলেও অগ্রক্রয়ের অধিকার এড়াতে সেটিকে বিনিময় দলিল হিসেবে দেখানো হয়েছে।

বিনিময় দলিল ও সহ-শরিকের অধিকার নিয়ে আপত্তি

আবদুর রশিদ পাটোয়ারী মামলাটি খারিজের আবেদন করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, দলিলটি প্রকৃত বিনিময় দলিল। ২০০৬ সালে সংশোধিত রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৬ ধারায় অগ্রক্রয়ের আবেদন করার অধিকার কেবল উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিক ব্যক্তির রয়েছে এবং এ অধিকার প্রযোজ্য বিক্রয়ের ক্ষেত্রে, বিনিময়ের ক্ষেত্রে নয়।

এ ছাড়া প্রয়োজনীয় অর্থ জমা দেওয়া হয়নি বলেও তিনি আপত্তি তোলেন।

২০০৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি রামগঞ্জের সহকারী জজ আদালত আবেদনটি খারিজ করেন। আদালত বলেন, আবেদনকারী নিজেকে ক্রয় ও বিনিময়ের মাধ্যমে সহ-শরিক হিসেবে দাবি করেছেন; উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিক হিসেবে দাবি করেননি। সংশোধিত আইনের বিধান অনুযায়ী, এ অবস্থায় তাঁর আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়। আদালত জমা দেওয়া অর্থ প্রত্যাহারেরও অনুমতি দেন।

এরপর রায়হানা বেগম লক্ষ্মীপুরের জেলা জজ আদালতে দেওয়ানি রিভিশন নম্বর ৪/২০০৮ দায়ের করেন। ২০০৯ সালের ২৮ জানুয়ারি জেলা জজ সহকারী জজের আদেশ বাতিল করে মামলাটি আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তির জন্য ফেরত পাঠান। জেলা জজের ওই আদেশের বিরুদ্ধেই হাইকোর্টে রিভিশন করেন আবদুর রশিদ পাটোয়ারী ও তাঁর উত্তরাধিকারীরা।

২০০৬ সালের সংশোধিত আইনে কী বলা আছে

হাইকোর্ট রায়ে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন, ১৯৫০-এর ৯৬(১) ধারার সংশোধিত বিধান বিশ্লেষণ করেন। ২০০৬ সালের সংশোধনের পর এ ধারায় অগ্রক্রয়ের অধিকার প্রয়োগের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে।

প্রথমত, কোনো রায়তের হোল্ডিংয়ের অংশ বা শেয়ার এমন ব্যক্তির কাছে বিক্রি হতে হবে, যিনি ওই হোল্ডিংয়ের সহ-শরিক প্রজাস্বত্বধারী নন। দ্বিতীয়ত, আবেদনকারীকে সংশ্লিষ্ট হোল্ডিংয়ের উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিক হতে হবে এবং আইনে নির্ধারিত অন্যান্য শর্তও পূরণ করতে হবে।

আদালত বলেন, ধারাটির প্রথম শর্তাংশে ব্যবহৃত ‘shall lie unless’ শব্দগুলো একটি আইনগত বাধা সৃষ্টি করে। অর্থাৎ, আবেদনকারী উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিক না হলে ৯৬(১) ধারায় তাঁর অগ্রক্রয়ের আবেদন গ্রহণযোগ্য হবে না।

এ মামলায় জমির দলিল নিবন্ধন ও আবেদন দাখিল—দুটিই সংশোধিত আইন কার্যকর হওয়ার পর ২০০৭ সালে হয়েছিল। ফলে সংশোধিত বিধানটি মামলার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিল।

নিজের আবেদনের বক্তব্যেই আইনগত বাধা

হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, দেওয়ানি কার্যবিধির আদেশ ৭, বিধি ১১(ঘ) অনুযায়ী, কোনো আবেদন বা আরজি খারিজের প্রশ্ন বিবেচনার সময় আদালত তাতে উল্লেখ করা বক্তব্যের ভিত্তিতেই প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন; এ পর্যায়ে বক্তব্যগুলো সত্য ধরে নেওয়া হয়।

রায়হানা বেগমের আবেদনে তিনি নিজেকে ক্রয় ও বিনিময়ের মাধ্যমে সহ-শরিক বলে উল্লেখ করলেও উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিক বলে দাবি করেননি। ফলে তাঁর নিজের আবেদনের বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে, ৯৬(১) ধারার প্রথম শর্তাংশ অনুযায়ী আবেদনটি আইনগতভাবে বাধাগ্রস্ত।

আদালত আরও বলেন, বিনিময় দলিলটি প্রকৃতপক্ষে বিক্রয় দলিল কি না, তা তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণের বিষয়। আদেশ ৭, বিধি ১১-এর পর্যায়ে এ প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করার প্রয়োজন নেই। এমনকি আবেদনকারীর অভিযোগের সুবিধার্থে দলিলটিকে বিক্রয় দলিল ধরে নিলেও উত্তরাধিকারসূত্রে সহ-শরিক না হওয়ার স্বতন্ত্র আইনগত বাধা দূর হয় না।

একইভাবে, ৯৬(২) ধারার ওপর আবেদনকারীর নির্ভরতাও যথাযথ নয় বলে আদালত উল্লেখ করেন। ওই উপধারায় আবেদনে কাদের পক্ষভুক্ত করতে হবে, তা বলা হয়েছে; কারা আবেদন করতে পারবেন, তা নির্ধারণ করা হয়নি।

জেলা জজের রিভিশন গ্রহণের এখতিয়ার ছিল না

হাইকোর্ট রায়ে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনগত বিষয় তুলে ধরেন। আদালত বলেন, জেলা জজের কাছে করা রিভিশন আবেদনটিই গ্রহণযোগ্য ছিল না।

দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(২) ধারা অনুযায়ী, যে আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা যায় না, কেবল সে ধরনের আদেশের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্তে জেলা জজ রিভিশন বিবেচনা করতে পারেন। কিন্তু এ মামলায় সহকারী জজের আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ ছিল।

আদালত ব্যাখ্যা করেন, প্রি-এম্পশনের আবেদনটি আরজি হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তা খারিজের আদেশ দেওয়ানি কার্যবিধির ২(২) ধারায় ডিক্রি হিসেবে গণ্য হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ৯৬(১) ধারায় আপিলের সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৬(১৫) ধারায় ওই ধারার অধীনে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে সাধারণ দেওয়ানি আপিল আদালতে আপিলের বিধান রয়েছে।

অতএব, যে ভিত্তিতেই বিবেচনা করা হোক না কেন, সহকারী জজের আদেশের বিরুদ্ধে প্রতিকার চাওয়ার উপায় ছিল আপিল, রিভিশন নয়। জেলা জজের উচিত ছিল রিভিশন আবেদনটি প্রাথমিক পর্যায়েই অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করা। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করে আদেশ বাতিল করায় এখতিয়ারবহির্ভূত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

দুই স্বতন্ত্র কারণে জেলা জজের আদেশ বাতিল

হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, জেলা জজ গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্নে ভুল সিদ্ধান্ত দিয়েছেন এবং এর ফলে ন্যায়বিচার ব্যাহত হয়েছে। এর দুটি স্বতন্ত্র কারণ রয়েছে।

প্রথমত, আপিলযোগ্য আদেশের বিরুদ্ধে রিভিশন গ্রহণ করে জেলা জজ নিজের এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে সহকারী জজের আদেশ বাতিল করেছেন। দ্বিতীয়ত, রিভিশন গ্রহণযোগ্য ছিল ধরে নিলেও তিনি রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৬(১) ধারার প্রথম শর্তাংশ বিবেচনা না করে আইনসম্মতভাবে খারিজ হওয়া একটি আবেদন পুনরুজ্জীবিত করেছেন।

তবে প্রয়োজনীয় অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়ে আইনের ৯৬(৩) ধারার প্রশ্নটি হাইকোর্ট নিষ্পত্তি করেননি। নিম্ন আদালত দুটির কোনোটি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়নি বলে আদালত এ প্রশ্নে মতামত দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

রিভিশন মঞ্জুর, সহকারী জজের আদেশ পুনর্বহাল

সব দিক বিবেচনায় হাইকোর্ট রুল যথাযথ ঘোষণা করে মঞ্জুর করেন। আদালত লক্ষ্মীপুরের জেলা জজের ২০০৯ সালের ২৮ জানুয়ারির আদেশ বাতিল করেন এবং রামগঞ্জের সহকারী জজের ২০০৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারির আদেশ পুনর্বহাল করেন।

একই সঙ্গে রুল জারির সময় দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। আদালত কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে খরচের আদেশ দেননি এবং রায়টি অবিলম্বে সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *