সুপ্রিম কোর্টের বিচারকক্ষে প্রবেশাধিকার পুনর্বহালের দাবিতে সাংবাদিকদের আল্টিমেটাম


সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগসহ হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন বেঞ্চের বিচারকক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ল’ রিপোর্টার্স ফোরাম (এলআরএফ)। দাবি না মানলে সাংবাদিকদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে আদালতে প্রবেশের ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ঘোষণার আল্টিমেটাম দেওয়া হয়েছে।

বুধবার (১২ আগস্ট) অবস্থান কর্মসূচিতে সম্পাদক পরিষদের সভাপতিসহ সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এলআরএফ জানিয়েছে, অবস্থান কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, গত ৭ জানুয়ারি থেকে আপিল বিভাগসহ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিভিন্ন বিচারকক্ষে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার বন্ধ রয়েছে।

এর ফলে বিচারাধীন মামলার কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণ এবং নির্ভরযোগ্যভাবে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা পেশাগতভাবে বাধার মুখে পড়ছেন। আদালতের কার্যক্রম সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ না থাকায় বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, উন্মুক্ত বিচারব্যবস্থা এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকারও প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি মুহাম্মদ ইয়াছিনের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আরাফাত মুন্নার সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও নিউ এইজ সম্পাদক নূরুল কবীর, ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সাবেক সভাপতি ও ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন, ডিআরইউর সাবেক সভাপতি ও আরটিভির হেড অব নিউজ ইলিয়াস হোসেন, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এম এম বাদশাহ, রিপোর্টার্স অ্যাগেইনস্ট করাপশনের সভাপতি শাফি উদ্দীন আহমদ, রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসির সভাপতি কাজী জেবেল, ল’ রিপোর্টার্স ফোরামের সাবেক সভাপতি এম বদি উজ-জামান, আশুতোষ সরকার, শামীমা আক্তার প্রমুখ।

সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর তার বক্তব্যে বলেন, একটি রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক অধিকার ও সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। সেই সময়ে আদালতের কার্যক্রম সম্পর্কে গণমাধ্যমের মাধ্যমে জনগণকে জানানোর কথা। অথচ বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতৃত্ব জনগণকে তথ্য জানার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।

তিনি বলেন, অতীতে বিভিন্ন সরকার যখন আদালত বা বিচার বিভাগের টুঁটি চেপে ধরেছে, তখন সংবাদমাধ্যম বিচার বিভাগের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। সেই সংবাদমাধ্যম যখন তার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের বাধার মুখে পড়ে, তখন বিচার বিভাগের নেতৃত্বের গণতান্ত্রিক মানসিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

নুরুল কবীর বলেন, প্রকাশ্য আদালতে বিচার করা বাংলাদেশের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। সংবিধান প্রদত্ত অধিকার রক্ষার দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত, সেই বিচার বিভাগই যদি মানুষের তথ্য জানার অধিকার ক্ষুণ্ন করে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক, দুর্ভাগ্যজনক ও লজ্জাজনক। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রধান বিচারপতির সাক্ষাৎ চেয়েও পাওয়া যায়নি বলেও তিনি জানান।

নূরুল কবীর আরও বলেন, কোনো কোনো সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের ভুল হতে পারে। বিচারকরাও ভুল করেন বলেই বিচারব্যবস্থায় আপিলের ব্যবস্থা রয়েছে। গণমাধ্যমে ভুল হলে তা সংশোধনের সুযোগও রয়েছে। কিন্তু বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ অভিভাবকেরা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস জেনেশুনে একটি সিদ্ধান্ত বহাল রাখবেন, এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

তিনি বলেন, সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো বাস্তব সমস্যা থাকলে সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তার সমাধান সম্ভব। সর্বোচ্চ আদালতের কর্তৃপক্ষ যেন সাংবাদিকদের বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দিকে ঠেলে না দেয়, সে আহ্বানও জানান তিনি।

এলআরএফের সাবেক সভাপতি ও ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিন বলেন, আজকের এই কর্মসূচি জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য। গত সাত মাস ধরে আদালতে প্রবেশ বন্ধ। এতে আমাদের পেশাগত কাজ বন্ধ নেই। রুটি-রুজিরও প্রশ্ন নেই। তবে সংবিধানে জনগণের তথ্য জানার যে অধিকার দিয়েছে, সেটা আমরা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে পারছি না।

সংবিধানের দুটি অনুচ্ছেদে বলা আছে বিচার হবে প্রকাশ্য আদালতে। অথচ সাংবাদিকদের আদালত থেকে বের করে দিয়ে বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। জনগণকে বিচার বিভাগের কার্যক্রম সম্পর্কে জানার অধিকার দিতে হবে।

ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদুল ইসলাম বলেন, মানুষ যখন অধিকারবঞ্চিত ও অন্যায়ের শিকার হয়, তখন সর্বশেষ আস্থার জায়গা হিসেবে আদালতে যায়। কিন্তু আদালতই যখন মানুষকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে, তখন মানুষ কোথায় যাবে?

তিনি বলেন, আজকের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে যদি অধিকার প্রতিষ্ঠা না হয়, তাহলে সাংবাদিকরা রাজপথে নামতে বাধ্য হবেন।

তথ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে প্রধান বিচারপতির প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিকদের আরও কঠোর কর্মসূচির দিকে ঠেলে দেওয়া উচিত হবে না।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি আবু সালেহ আকন বলেন, সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার মতো কী এমন বিষয় রয়েছে, যা জাতি জানতে পারবে না, এ প্রশ্নের জবাব প্রধান বিচারপতিকে দিতে হবে। এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করে।

তিনি বলেন, অতীতে ফ্যাসিস্ট আমলে আদালতে ফরমায়েশি রায় হয়েছে এবং সেই রায়ের ভিত্তিতে অনেকের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। সাংবাদিকরা বাকস্বাধীনতা ও লেখার স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করেছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না।

তিনি আরও বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে সরকারকে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। অন্যথায় সাংবাদিক সংগঠনগুলো এলআরএফের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলনে নামবে।

এলআরএফের সভাপতি মুহাম্মদ ইয়াছিন বলেন, সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশাধিকার পুনর্বহালের দাবি দীর্ঘদিন ধরে জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। দাবি মানা না হলে শিগগিরই সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারকক্ষে প্রবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

অবস্থান কর্মসূচিতে আরও উপস্থিত ছিলেন এলআরএফের সাবেক সভাপতি সাঈদ আহমেদ খান, ওয়াকিল আহমেদ হিরন, মাশহুদুল হক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান, হাবিবুর রহমান, মনিরুজ্জামান মিশন, সিনিয়র সদস্য শংকর মৈত্র, সাজেদুল হক প্রমুখ।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *