লিগ্যাল এইড অধিদপ্তর বিচার ব্যবস্থায় সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে: কক্সবাজারে মহাপরিচালক


মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী : আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন বলেছেন, পূর্ণাঙ্গ অধিদপ্তর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর ব্যাপক পরিসরে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। এর ফলে বিচারপ্রার্থীরা লিগ্যাল এইডের বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন এবং দেশের সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থায় সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

সোমবার (৩১ আগস্ট) কক্সবাজার জেলা লিগ্যাল কমিটির উদ্যোগে জেলা জজ আদালতের সম্মেলন কক্ষে সরকারি আইনগত সহায়তা কার্যক্রম সম্প্রসারণে বিচারক, স্পেশাল মেডিয়েটর, আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থী জনগণের অংশগ্রহণে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

জেলা লিগ্যাল কমিটির সভাপতি ও সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আবদুর রহিমের সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। সভা সঞ্চালনা করেন জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সিভিল জজ অভিজিৎ চৌধুরী।

পূর্ণাঙ্গ অধিদপ্তর হওয়ায় কাজের পরিধি বেড়েছে

মো. মঞ্জুরুল হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থাকে অধিদপ্তরে রূপান্তরের জন্য অধ্যাদেশ জারি করেছিল। পরবর্তীতে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত বিল পাসের মাধ্যমে আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থাকে একটি পূর্ণাঙ্গ অধিদপ্তরে রূপান্তর করেছে।

তিনি বলেন, আইনটি পাসের ক্ষেত্রে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান এমপি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। পূর্ণাঙ্গ অধিদপ্তর হওয়ার কারণে আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর এখন ব্যাপক পরিসরে কাজ করতে পারছে। বিচারপ্রার্থীরাও লিগ্যাল এইডের অবারিত বিচারিক সুবিধা গ্রহণ করতে পারছেন।

মহাপরিচালক বলেন, পূর্ণাঙ্গ বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর দেশের সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থায় সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মোচিত করেছে।

প্রি-কেইস সুবিধায় উপকৃত হচ্ছেন কক্সবাজারবাসী

মতবিনিময় সভায় মহাপরিচালক বলেন, কক্সবাজারসহ দেশের কয়েকটি জেলাকে লিগ্যাল এইড অধিদপ্তর মডেল জেলা হিসেবে গ্রহণ করায় এসব এলাকার মানুষ বিচার-পূর্ব আইনগত সহায়তা বা প্রি-কেইস সুবিধা ব্যাপকভাবে গ্রহণ করতে পারছেন।

মিডিয়েশনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বে প্রায় ৯০ শতাংশ বিরোধ মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়। জাপানে আনুষ্ঠানিক আদালতে মামলা দায়েরকে অনেক সময় অসম্মানজনক ও মর্যাদাহানিকর বিষয় হিসেবে দেখা হয়। ফলে বিরোধে জড়িত পক্ষগুলো টেবিল আলোচনার মাধ্যমে অধিকাংশ বিরোধ নিষ্পত্তি করে থাকে।

তিনি বলেন, মিডিয়েশনের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি হলে সামাজিক বন্ধন অটুট থাকে। বিপরীতে আনুষ্ঠানিক বিচারপ্রক্রিয়ায় অনেক সময় পক্ষগুলোর মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়, যা সমাজ ও সভ্যতার অগ্রগতির অন্তরায় হতে পারে।

ধীরে ধীরে সংকট কাটিয়ে ওঠার পরিকল্পনা

আইনগত সহায়তা অধিদপ্তর নতুনভাবে পূর্ণাঙ্গ অধিদপ্তর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় শুরুতে বিভিন্ন ধরনের জটিলতা, সংকট ও সীমাবদ্ধতা থাকা স্বাভাবিক বলেও মন্তব্য করেন মহাপরিচালক।

তিনি বলেন, সরকার সীমিত সম্পদের সুষম ব্যবহার করে অবকাঠামোগত সংকট, জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্টসহ পর্যায়ক্রমে সব সমস্যার সমাধানের পরিকল্পনা নিয়েছে।

বিচার ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে জেন-জি বুকের রক্ত দিয়ে মানুষের ধারণাকে পাল্টে দিয়েছে। ভবিষ্যতে জেনারেশন আলফা যদি মামলার দীর্ঘসূত্রিতা ও বিচারের অন্যান্য বিলম্বিত পদ্ধতি দেখে বিদ্রোহ করে, তাহলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না।

এ কারণে সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল, মানবিক ও সময়োপযোগী করার জন্য বার, বেঞ্চ, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

লিগ্যাল এইড অফিস স্থানান্তরের উদ্যোগ

সভায় স্বাগত বক্তব্যে কক্সবাজারের সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ আবদুর রহিম বলেন, কক্সবাজারসহ দেশের কয়েকটি জেলাকে মডেল জেলা হিসেবে নেওয়ায় এখানকার মানুষ প্রি-কেইস লিগ্যাল এইড সুবিধার ব্যাপক সুফল পাচ্ছেন।

তিনি বলেন, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের অবকাঠামোগত সমস্যা দূর করতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনের জেলা বিচার বিভাগের পুরোনো ভবনে লিগ্যাল এইড অফিস স্থানান্তর করা হবে।

ফরমাল বিচারের তুলনায় মিডিয়েশনের মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি অনেক বেশি সুন্দর ও কল্যাণকর বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মামলা জট কমাতে পারে মিডিয়েশন

মতবিনিময় সভায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক (জেলা জজ) মোহাম্মদ আবু হানিফ বলেন, মিডিয়েশন কার্যক্রমের জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে এ কার্যক্রম আরও গতিশীল ও গণমুখী হবে। এর ফলে ফরমাল আদালতে মামলার জটও অনেকটা কমে আসবে।

কক্সবাজারের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শফিউল আযম বলেন, লিগ্যাল এইড একদিকে যেমন সব নাগরিকের বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করেছে, অন্যদিকে পূর্ণাঙ্গ লিগ্যাল এইড অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার ফলে এর কার্যক্রম আরও সহজে গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

সভা শুরুর আগে কক্সবাজার জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির সার্বিক কার্যক্রমের ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। এটি উপস্থাপন করেন জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সিভিল জজ অভিজিৎ চৌধুরী।

আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের অংশগ্রহণ

মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মন্নান, সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আখতার উদ্দিন হেলালী, জিপি অ্যাডভোকেট শামসুল হুদা, পিপি অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ইউনুছ, প্যানেল আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাকী এ কাউসার, অ্যাডভোকেট তৌহিদুল এহেছান, স্পেশাল মেডিয়েটর অ্যাডভোকেট ইয়াসমিন শওকত জাহান রোজী, অ্যাডভোকেট শাহ আলম, অ্যাডভোকেট মিফতাহ উদ্দিন এবং লিগ্যাল এইডের উপকারভোগী হেলাল উদ্দিন ও ক্লিটন দে।

এ সময় কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ পঞ্চম আদালতের বিচারক মোহাম্মদ আবুল মনসুর সিদ্দিকী, যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের বিচারক ইকবাল হোসাইন, সিনিয়র সিভিল জজ মোহাম্মদ বেলাল উদ্দিনসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডাররা উপস্থিত ছিলেন।

লিগ্যাল এইড অফিস পরিদর্শন

একই দিন আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেন জেলা লিগ্যাল এইড অফিস পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তিনি অফিসের সার্বিক কার্যক্রম দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং কার্যক্রমের প্রশংসা করেন।

এ সময় তিনি জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে লিগ্যাল এইড অফিসে আসা বিচারপ্রার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিনা খরচে বিচার পেতে তাদের কী ধরনের সুবিধা ও অসুবিধার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা জানতে চান।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বিচারপ্রার্থীরা মহাপরিচালককে জানান, তারা লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে বিনা খরচে, দ্রুততম সময়ে এবং ঝামেলাবিহীনভাবে বিচারিক সুবিধা পাচ্ছেন।

মহাপরিচালক জানান, লিগ্যাল এইড কার্যক্রম সম্প্রসারণে সরকার পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করেছে।

এ সময় জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার অভিজিৎ চৌধুরী জানান, বাধ্যতামূলক বিচার-পূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রমে কক্সবাজারবাসী অভূতপূর্ব সাড়া দিচ্ছেন।

মহাপরিচালক লিগ্যাল এইড অধিদপ্তরের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এজেন্সির সঙ্গে লিগ্যাল এইড অফিসের কার্যক্রম সম্প্রসারণে সম্পাদিত চুক্তি নিয়েও আলোচনা করেন।

পাশাপাশি কক্সবাজারে দ্রুত লিগ্যাল এইড ভবন নির্মাণের জন্য উপযুক্ত জমি নির্বাচন করার নির্দেশনা দেন তিনি।

মতবিনিময় সভায় ফুল ও ক্রেস্ট দিয়ে প্রধান অতিথি আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হোসেনকে বরণ করে নেওয়া হয়।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *