যৌন অপরাধে শাস্তির বৈষম্য ও আইনি বিশ্লেষণ


বাংলাদেশের দণ্ডবিধিতে যৌন সহিংসতাসংক্রান্ত অপরাধগুলোর মধ্যে ধারা ৩৭৫ (ধর্ষণ) এবং ধারা ৩৭৭ (প্রকৃতিবিরুদ্ধ যৌনসঙ্গম) অন্যতম। দীর্ঘদিন ধরে এটি একটি একাডেমিক আলোচনার বিষয়। উভয় ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীর শারীরিক স্বায়ত্তশাসন, মর্যাদা, হেনস্তা এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে গুরুত্বপূর্ণভাবে। কিন্তু শাস্তির ক্ষেত্রে দুই ধারার মধ্যে বিশেষ বৈপরীত্য লক্ষ্য করা যায় এবং উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—যখন উভয় অপরাধই মানুষের ইজ্জত ও মর্যাদার সঙ্গে সম্পর্কিত, তখন আইনের দৃষ্টিতে এই বৈষম্যের যৌক্তিকতা কী? আদৌ এখানে আইন কারো প্রতি বৈষম্য বিমুখতা করেই চলছে।

আইনের ভাষায় দুই ধারা

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৩৭৫ ধর্ষণের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে এবং ধারা ৩৭৬ তার যথাযথ শাস্তি নির্ধারণ করে। সাম্প্রতিক সংশোধনের পর ধর্ষণের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত শাস্তির বিধান রয়েছে বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী। বিচারক তার এখতিয়ারে এই শাস্তি প্রয়োগ করতে পারেন। অন্যদিকে ধারা ৩৭৭ “প্রকৃতিবিরুদ্ধ যৌনসঙ্গম”কে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে—যা একদমই অপ্রচলিত এবং এর জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পর্যন্ত অথবা দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও জরিমানার বিধান রেখেছে বিশেষ বিবেচনায়।

আমরা জানি আইনগতভাবে ধারা ৩৭৭ কেবল সম্মতিহীন যৌন সহিংসতা নয় আইনের বিধান ও চর্চা অনুসারে। বরং এর ঐতিহাসিক কাঠামো সম্মতিমূলক কিছু যৌন আচরণকেও অপরাধের আওতায় এনেছে সময়ের প্রয়োজনে। এ কারণেই এই ধারাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে বলে লক্ষ করা যায়।

শাস্তির বৈষম্যের ঐতিহাসিক কারণ

ধারা ৩৭৫ ও ৩৭৭ উভয়ই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে প্রণীত হয়। সে সময় ধর্ষণকে মূলত নারী-পুরুষ সম্পর্কের নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হতো এবং ঐতিহাসিকভাবে দেখা হতো। অপরদিকে ধারা ৩৭৭-এর উদ্দেশ্য ছিল ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার আলোকে “অপ্রাকৃতিক” বিবেচিত যৌন আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা—যা অনেক আগে হতে চলে আসছে। ফলে দুই ধারার ভিত্তি এক নয় সমাজের চর্চায়। ধারা ৩৭৫-এ মূলত সম্মতির অনুপস্থিতি বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। এই ধারায় নারীর ওপর যৌন সহিংসতার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আইনের দর্শন। অন্যদিকে ধারা ৩৭৭ নৈতিকতা-ভিত্তিক একটি অপরাধধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই সময়। যদিও ৩৭৭ শুধু নৈতিকতার মানদণ্ড নয়, এই ঐতিহাসিক পার্থক্য আজও শাস্তির কাঠামোতে প্রতিফলিত হচ্ছে ভিন্ন এক আঙ্গিকে, ভিন্ন এক সত্তায়।

আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক মামলা Navtej Singh Johar v. Union of India-এ আদালত উল্লেখ করেন, “সম্মতিমূলক সমকামী সম্পর্ককে অপরাধের আওতা থেকে বাদ দিতে হবে।” আদালত মত দেয় যে ব্যক্তিগত মর্যাদা, গোপনীয়তা, সম্মতি এবং সাংবিধানিক স্বাধীনতা রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ঊর্ধ্বে হতে হবে।

বাংলাদেশে ধারা ৩৭৭ এখনো বহাল থাকলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং বিভিন্ন দেশের বিচারিক সিদ্ধান্তে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে—সম্মতিহীন যৌন সহিংসতা এবং সম্মতিমূলক ব্যক্তিগত আচরণকে একই আইনি কাঠামোতে বিচার করা দ্যর্থতামূলক। অন্যদিকে ধর্ষণসংক্রান্ত মামলায় বাংলাদেশের উচ্চ আদালত বারবার উল্লেখ করেছেন যে ধর্ষণ শুধু একটি শারীরিক আক্রমণ নয়, এর সাথে জড়িত ভুক্তভোগীর মর্যাদা, আত্মসম্মান ও মৌলিক অধিকার। অতএব ধর্ষণ ব্যক্তিগত সত্তার ওপর গুরুতর আঘাত।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

আইনবিদদের একটি অংশের মতে, শাস্তির মাত্রা নির্ধারণে অপরাধের সামাজিক প্রভাব এবং প্রমাণগত বাস্তবতা বিবেচনা করতে হবে। তাঁদের মতে, ধর্ষণ একটি নির্দিষ্ট সহিংস অপরাধ এবং একটি স্বতন্ত্র অপরাধ। এই ধর্ষণে যেখানে ভুক্তভোগীর সম্মতি অনুপস্থিত থাকে প্রথম থেকেই, তাই কঠোর শাস্তি যৌক্তিক বলে তাঁরা মনে করেন।

তবে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, যদি ধারা ৩৭৭-এর আওতায় কোনো সম্মতিহীন যৌন নির্যাতনের ঘটনা আসে, তবে ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত ক্ষতির মাত্রা অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষণের শিকারের সমতুল্য হতে হবে স্বাভাবিকভাবেই। সেক্ষেত্রে শাস্তির কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন অধিকাংশ এক্সপার্ট। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক অধ্যাপকগণ বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করেছেন যে আধুনিক ফৌজদারি আইন ক্রমশ “সম্মতি” (consent)-কে কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসছে—যদিও অপরাধের ক্ষেত্রে সম্মতি ভিত্তি হতে পারে না। অর্থাৎ যৌন অপরাধের বিচার হওয়া উচিত ভুক্তভোগীর সম্মতি ছিল কি না তার উপর এবং এই অপরাধ কতটা সহিংসতা সংঘটিত হয়েছে এই ভিত্তিতে। বরং অপরাধটি ঐতিহাসিকভাবে কোন ধারায় পড়ে তার ভিত্তিতে হওয়া উচিত নয়।

বর্তমান আইনের সীমাবদ্ধতা

আমরা জানি ধারা ৩৭৫-এর একটি বড় সমালোচনা হলো এটি ঐতিহ্যগতভাবে নারী ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক বিষয়। ফলে পুরুষ বা তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিরা যৌন সহিংসতার শিকার হলে আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দিতে পারে স্বাভাবিকভাবেই। অন্যদিকে ধারা ৩৭৭ এতটাই বিস্তৃত ভাষায় রচিত যে এতে সম্মতিমূলক, আধা সম্মতি, সম্মতিহীন আচরণের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য সব সময় প্রতিফলিত হয় না। ফলে আধুনিক মানবাধিকার দর্শনের সঙ্গে এই বিষয়টি সাংঘর্ষিক বলে অনেক আইনবিদ মনে করেন। তাঁরা এই আইনের যথাযথ সংস্কারও দাবি করেন।

সংস্কারের প্রয়োজন কি?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যৌন অপরাধ আইন সংস্কারের মূল লক্ষ্য হয়েছে “gender-neutral sexual assault law” বা লিঙ্গনিরপেক্ষ যৌন সহিংসতা আইন প্রণয়ন করা জনগণের স্বার্থে। এতে নারী, পুরুষ বা তৃতীয় লিঙ্গ—সব ভুক্তভোগী সমান আইনি সুরক্ষা পান নিয়মতান্ত্রিকভাবে। বাংলাদেশেও আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে অপরাধের ধরন ও ভুক্তভোগীর ক্ষতির মাত্রাকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন কাঠামো প্রয়োজন সময়ের প্রয়োজনে। এতে ধর্ষণ, পায়ুকামভিত্তিক জোরপূর্বক নির্যাতন কিংবা অন্যান্য যৌন সহিংসতার ক্ষেত্রে শাস্তির যৌক্তিক সামঞ্জস্য আনা সম্ভব বলে মনে করেন অধিকাংশ আইনবিদ।

আমি মনে করি ধারা ৩৭৫ ও ধারা ৩৭৭ উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের মর্যাদা, শারীরিক স্বাধীনতা, স্বাতন্ত্র্যবোধ এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তবে ঐতিহাসিকভাবে দুই ধারার উদ্দেশ্য ও আইনি ভিত্তি ভিন্ন হওয়ায় শাস্তিতেও পার্থক্য তৈরি হয়েছে ঐতিহাসিকভাবে। তবু আধুনিক মানবাধিকার ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—যদি ভুক্তভোগীর ক্ষতি ও মর্যাদাহানি একই ধরনের হয়, তাহলে আইনের সুরক্ষা ও শাস্তির কাঠামো কি আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত নয় কি ন্যায়বিচারের স্বার্থে? আমাদের এই আলোচনায় উঠে আসে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে কেবল শাস্তির পরিমাণ নয় বরং যৌন অপরাধের পুরো আইনগত কাঠামোকে নতুন করে সংস্কার করতে হবে। তখনই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে যে আইন মানুষের মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে সমানভাবে কার্যকর, পরীক্ষিত এবং ন্যায়সঙ্গতভাবে জনগণের জন্য কাজ করবে।

লেখক: ফাইজুল ইসলাম; লেকচারার, আইন বিভাগ, প্রাইম ইউনিভার্সিটি এবং এমফিল রিসার্চার, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *