ব্যক্তিগত সম্মানের সুরক্ষা এবং আমাদের নৈতিক মানদণ্ড
রওশন জাদীদ : ইউনিভার্সাল ডিক্লারেশন অব হিউম্যান রাইটস (UDHR) যাকে আমরা সাধারণত মানবাধিকার সনদ বলে থাকি, এর ৩০টি অনুচ্ছেদের আলোকে আমাদের প্রাণপ্রিয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ন্যায়সঙ্গতভাবে মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। এর ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, বাসস্থান কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগে ইচ্ছাকৃত বা অবৈধভাবে হস্তক্ষেপ করা যাবে না। একইসঙ্গে কারও সম্মান ও সুনামের ওপর আক্রমণ করাও নিষিদ্ধ। এ ধরনের হস্তক্ষেপ বা আক্রমণের বিরুদ্ধে আইনের সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার প্রত্যেক মানুষের রয়েছে।
এই নীতির আলোকে স্পষ্টভাবে বলা যায়, একটি ভদ্র, সংবেদনশীল ও উন্নত সমাজ গঠনের জন্য অন্যের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার, বাসস্থান ও ব্যক্তিগত যোগাযোগে অযাচিত হস্তক্ষেপ করা কাম্য নয়। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা একটি মৌলিক অধিকার। পাশাপাশি শিশু ও নাবালকদের সুশিক্ষা ও সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক দায়িত্ব।
কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, ব্যক্তিগত আক্রোশ, সাময়িক বিনোদন কিংবা নিজেকে সামাজিকভাবে ফেরেশতা প্রমাণের প্রবণতা থেকে আমরা অনেকেই অন্যের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ছবি বা তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেই। সেসব নিয়ে অনধিকার চর্চা করি। এর ফলে একদিকে যেমন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ হয়, অন্যদিকে নাবালক ও তরুণরা ভুল বার্তা পেতে পারে। আমরা কেউই এমন আচরণের শিকার যেমন হতে চাই না; তেমনি অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে অযথা চর্চা বা প্রচার কিংবা শতভাগ সত্য না জেনে সত্য বলে প্রচার করাও কারো কাম্য হতে পারে না।
আরও পড়ুন : ন্যায়বিচার দোরগোড়ায়: রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় মাঠভিত্তিক এডিআরের মাধ্যমে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির এক বাস্তব অভিজ্ঞতা
জাতিসংঘের ঘোষণার এই নীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বাংলাদেশের সংবিধানও ব্যক্তিগত অধিকার ও সুরক্ষাকে গুরুত্ব দিয়েছে। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী, আইন দ্বারা প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি ছাড়া কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির ক্ষতি করা যাবে না। জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কাউকে আইনগত ভিত্তি ছাড়া বঞ্চিত করা যাবে না। একইসঙ্গে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত সীমার মধ্যে দেশের সর্বত্র অবাধ চলাফেরার অধিকার এবং চিঠিপত্র ও যোগাযোগের গোপনীয়তার অধিকারও সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত।
অন্যদিকে সংবিধান এটিও স্বীকার করে যে, প্রত্যেকের চিন্তা, বিবেক, বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা রয়েছে; তবে তা অবশ্যই শালীনতা, নৈতিকতা ও আইনগত সীমার মধ্যে থাকতে হবে। তাই প্রশ্ন ওঠে—যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সম্মান বা গোপনীয়তা নিয়ে অযথা কৌতূহল বা বিনোদনের উদ্দেশ্যে বিষয়গুলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন, তারা কতটা নৈতিকতার মানদণ্ড বজায় রেখে কাজগুলো করছেন?
এটিও মনে রাখা জরুরি যে, পাবলিক স্থানে থাকলেও কারও অনুমতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ধারণ করা নৈতিকভাবে অনুচিত হতে পারে, এবং পরিস্থিতিভেদে তা আইনগত জটিলতারও সৃষ্টি করতে পারে। একইভাবে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বা ব্যক্তিগত রেকর্ডিং অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করাও অনেক ক্ষেত্রে গোপনীয়তা লঙ্ঘনের শামিল।
সবশেষে বলা যায়, বিষয়টি শুধু আইনের নয়, এটি আমাদের নৈতিকতারও প্রশ্ন। আইন ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষা করে, তবে কখনো পারে আবার পারে না, কিন্তু সমাজকে আরও মানবিক ও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে আমাদের নৈতিকতা ও সচেতনতা। আমাদের বিশ্বাস করা জরুরি যে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সম্মান ও মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াই একটি উন্নত সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি।
লেখক : রওশন জাদীদ;অ্যাডভোকেট, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট। ই-মেইল : [email protected]
Source link
tags]
Leave a Reply