বাংলাদেশে বার নির্বাচনে ভয়ভীতি ও বঞ্চনা: ‘জেএমবিএফ’-এর বিশেষ রিপোর্ট


আন্তর্জাতিক ডেস্ক | মানবাধিকার সংস্থা জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) বাংলাদেশের বার অ্যাসোসিয়েশন (আইনজীবী সমিতি) নির্বাচনগুলোর গণতান্ত্রিক পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা এবং আইনজীবীদের পেশাগত অধিকার নিয়ে একটি বিশেষ ও চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

আজ ১ জুন (সোমবার) ফ্রান্সের প্যারিস থেকে জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্স (জেএমবিএফ) “Silencing the Legal Profession: Escalating Intimidation, Exclusion, and Obstruction of Bar Association Elections in Bangladesh (17 February–30 May 2026)” শীর্ষক একটি বিশেষ প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে।

প্রতিবেদনটি যৌথভাবে গবেষণা করেছেন জেএমবিএফ-এর নির্বাহী কমিটির সদস্য মোসা: জান্নাতুল ফেরদৌস এবং এটি সম্পাদনা করেছেন সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট শাহানূর ইসলাম।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ মে ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনের তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে প্রস্তুতকৃত এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে বিবেচিত আইনজীবীদের বিরুদ্ধে একটি উদ্বেগজনক দমন-পীড়নের ধারা গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; বরং দেশের আইন পেশার প্রতিষ্ঠানগুলোতে, এমনকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিতেও, এটি একটি ক্রমবর্ধমান ও সুসংগঠিত প্রবণতার প্রতিফলন।

প্রতিবেদনে অন্তত ২৩টি বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে প্রায় ৩৬৫ জন আইনজীবী ও প্রার্থী এবং ৩৩৪টি নির্বাহী পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বাধ্যতামূলক বিরত রাখা, মনোনয়নপত্র সংগ্রহে বাধা, জমা দেওয়ার পর মনোনয়ন বাতিল, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সহিংসতার হুমকি। প্রতিবেদনের মতে, এসব কর্মকাণ্ড আইন পেশার ভেতরে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

প্রধান অনুসন্ধানসমূহ

ব্যাপকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন নিশ্চিতকরণ

প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি যে প্রবণতার কথা উঠে এসেছে তা হলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বাধ্যতামূলক বিরত রাখা। অন্তত ১৪টি বার অ্যাসোসিয়েশনে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে, যা প্রায় ১৮৮ জন আইনজীবী ও প্রার্থী এবং ১৮১টি নির্বাহী পদকে প্রভাবিত করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগ-সমর্থক হিসেবে বিবেচিত অনেক আইনজীবী মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার, ভয়ভীতি, রাজনৈতিক চাপ এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় বিএনপি-সমর্থিত প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, ফলে প্রকৃত অর্থে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুপস্থিত ছিল।

মনোনয়নপত্র সংগ্রহে বাধা

অন্তত চারটি বার অ্যাসোসিয়েশনে মনোনয়নপত্র সংগ্রহে বাধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা প্রায় ৯২ জন আইনজীবী ও প্রার্থীকে প্রভাবিত করেছে।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর একটি গাজীপুরে ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যেখানে ৩৯ জন আইনজীবীকে মনোনয়নপত্র দেওয়া হয়নি। একই ধরনের অভিযোগ চট্টগ্রাম থেকেও পাওয়া গেছে, যেখানে ২১ জন আইনজীবী নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের চেষ্টা করতে গিয়ে বাধা ও শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া রাজশাহীসহ আরও কয়েকটি জেলায় একই ধরনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। প্রতিবেদনের মতে, এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে বঞ্চনামূলক কার্যক্রম কেবল পরোক্ষ চাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি প্রক্রিয়াগত বাধা সৃষ্টি করে আইনজীবীদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় প্রবেশই ঠেকিয়ে দেওয়া হয়েছে।

মনোনয়ন বাতিল ও অযোগ্য ঘোষণা

প্রতিবেদনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হিসেবে মনোনয়ন জমা দেওয়ার পর তা বাতিল বা প্রার্থীদের অযোগ্য ঘোষণার বিষয়টি উঠে এসেছে।

অন্তত তিনটি বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে প্রায় ৬৯ জন আইনজীবী ও প্রার্থী এ ধরনের সিদ্ধান্তের শিকার হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচন, যেখানে ৪২ জনেরও বেশি আইনজীবীর প্রার্থিতা বাতিল বা অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ময়মনসিংহ ও মুন্সীগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতিসহ আরও কয়েকটি স্থানেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনা নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

ভয়ভীতি ও হুমকি

প্রতিবেদনে নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করার হাতিয়ার হিসেবে ভয়ভীতি ও হুমকি ব্যবহারের অভিযোগও তুলে ধরা হয়েছে।

অন্তত দুটি বার অ্যাসোসিয়েশনে এ ধরনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে, যা প্রায় ১৬ জন আইনজীবী ও প্রার্থীকে প্রভাবিত করেছে। কুমিল্লা ও ঠাকুরগাঁওয়ের ঘটনাগুলোতে কিছু আইনজীবী সহিংসতার হুমকি, রাজনৈতিক হয়রানি, পেশাগত প্রতিশোধ এবং তাদের সমর্থক ও নির্বাচনী কর্মীদের লক্ষ্য করে ভয়ভীতি প্রদর্শনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদনের মতে, এসব কর্মকাণ্ড আইনজীবী সমাজের মধ্যে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যা অংশগ্রহণকে নিরুৎসাহিত করেছে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ন্যায়সংগততা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর আস্থা কমিয়ে দিয়েছে।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিয়ে উদ্বেগ

JMBF সতর্ক করে বলেছে যে বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচনে বঞ্চনা ও ভয়ভীতির এই ধারাবাহিকতা আইন পেশার স্বাধীনতা, পেশাগত প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক পরিচালনা এবং সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের আইনের শাসনের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।

বার অ্যাসোসিয়েশনগুলো বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা, আইনগত অধিকার সংরক্ষণ এবং বিচারব্যবস্থার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এসব প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার বা অংশগ্রহণ সীমিত করার যেকোনো প্রচেষ্টা আইন পেশার মর্যাদা এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ।

করণীয় সম্পর্কে আহ্বান

JMBF বাংলাদেশ সরকার, বার অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃপক্ষ, বিচার বিভাগীয় প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের প্রতি অবাধ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বার অ্যাসোসিয়েশন নির্বাচন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।

সংস্থাটি একই সঙ্গে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, আইনজীবী সংগঠন এবং গণতান্ত্রিক অংশীদারদের প্রতি বাংলাদেশের আইন পেশার স্বাধীনতার ওপর প্রভাব ফেলছে এমন ঘটনাবলি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার এবং আইনজীবীদের ভয়ভীতি, বৈষম্য ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আশঙ্কা ছাড়াই পেশাগত প্রতিষ্ঠানে অংশগ্রহণের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *