দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো আইন: বিধান ও শাস্তি


আশরাফুল করিম সাগর : বাংলাদেশের সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত দেয়ালে ছবি, পোস্টার বা দেয়াল লিখন লাগানোর ক্ষেত্রে আইনি বিধি-নিষেধ রয়েছে। বাংলাদেশে মূলত “দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২”-এর মাধ্যমে এই বিষয়টি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

এই আইনের মূল বিধান ও বিধি-নিষেধগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:

১. সাধারণ বিধি-নিষেধ

  • পূর্বানুমতি ছাড়া দেয়াল লিখন বা পোস্টার নিষিদ্ধ: আইনের ৪ ধারা অনুযায়ী, নির্ধারিত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগাম অনুমতি না নিয়ে কোনো সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন দেয়ালে কোনো প্রকার দেয়াল লিখন (চুন বা রং দিয়ে লেখা) বা পোস্টার লাগানো যাবে না।

  • অনুমোদিত স্থান ব্যবহার: কোনো এলাকায় পোস্টার লাগাতে বা দেয়াল লিখন করতে চাইলে, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ (যেমন: সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা) কর্তৃক নির্ধারিত স্থান বা দেয়ালেই কেবল তা করতে হবে।

২. ব্যতিক্রম (যেখানে অনুমতি প্রয়োজন নেই) আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী, কিছু ক্ষেত্রে এই বিধি-নিষেধ শিথিল থাকে:

  • নির্বাচনী প্রচারণার সময় নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত নিয়ম মেনে পোস্টার লাগানো বা দেয়াল লিখন।

  • সরকারি কোনো জরুরি বা জনস্বার্থমূলক বিজ্ঞপ্তি, যা সরকার নিজেই প্রচার করছে।

৩. অপরাধ ও শাস্তির বিধান যদি কেউ এই আইন অমান্য করে সরকারি বা অনুমোদিত নয় এমন দেয়ালে পোস্টার লাগায় বা দেয়াল লিখন করে, তবে আইনের ৬ ধারা অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে:

  • অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড: সর্বনিম্ন ৫ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড হতে পারে। অনাদায়ে ১৫ দিন পর্যন্ত বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হতে পারে।

  • অপসারণের খরচ বহন: যিনি বা যে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পোস্টার লাগানো হয়েছে, তাকে নিজস্ব খরচে বা দায়িত্বে সেটি অপসারণ বা দেয়ালটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দিতে হবে। ব্যর্থ হলে কর্তৃপক্ষ তা অপসারণ করবে এবং সেই খরচ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কাছ থেকে আদায় করা হবে।

  • কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে: যদি কোনো কোম্পানি বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এই অপরাধ করে, তবে উক্ত প্রতিষ্ঠানের মালিক, পরিচালক বা ব্যবস্থাপক এই অপরাধের জন্য দায়ী হবেন (যদি না তারা প্রমাণ করতে পারেন যে এটি তাদের অজ্ঞাতসারে হয়েছে)।

৪. স্থানীয় সরকার ও সিটি কর্পোরেশনের বিধিমালা এই মূল আইনের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান (যেমন: ঢাকা উত্তর/দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন) নিজস্ব উপ-আইন বা আদেশের মাধ্যমে সৌন্দর্য রক্ষার্থে সরকারি সম্পত্তি, ফ্লাইওভারের পিলার, কিংবা ফুটওভার ব্রিজে পোস্টার লাগানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। এসব ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) তাৎক্ষণিক জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থা করে থাকে।

৫. সরকারি দেয়ালে অবৈধ দেয়াল লিখন এবং পোস্টার লাগানোর অপরাধ বা প্রবণতা কমানোর জন্য আইনি প্রয়োগের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত, কাঠামোগত এবং সচেতনতামূলক বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

নিচে কার্যকর কিছু ব্যবস্থার বিবরণ দেওয়া হলো:

ক. আইনের কঠোর ও তাৎক্ষণিক প্রয়োগ

  • মোবাইল কোর্ট (ভ্রাম্যমাণ আদালত) পরিচালনা: সিটি কর্পোরেশন ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে অপরাধীকে হাতেনাতে ধরা এবং তাৎক্ষণিক জরিমানা করা।

  • বেনিফিশিয়ারি বা সুবিধাভোগীকে জবাবদিহিতায় আনা: পোস্টার যিনি লাগাচ্ছেন তিনি সাধারণত দিনমজুর বা কর্মী হয়ে থাকেন। তাই কেবল তাদের শাস্তি না দিয়ে, পোস্টারে যার নাম, ছবি বা যে প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন রয়েছে (সুবিধাভোগী), তাদের বিরুদ্ধে সরাসরি মামলা বা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।

  • সেবা সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ: বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রে পোস্টারে দেওয়া ফোন নম্বরের মোবাইল সংযোগ বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স সাময়িকভাবে বাতিল করার বিধান রাখা।

খ. আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার

  • সিসিটিভি (CCTV) নজরদারি: শহরের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দেয়াল, ফ্লাইওভার এবং পাবলিক প্লেসগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা। রাতে বা ভোরে যখন সাধারণত পোস্টার লাগানো হয়, তখন ডিজিটাল নজরদারি জোরদার করা।

  • অ্যান্টি-পোস্টার কোটিং (Anti-Poster Coating): গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দেয়াল এবং ফ্লাইওভারের পিলারে বিশেষ ধরনের হাইড্রোফোবিক বা টেক্সচার্ড পেইন্ট ব্যবহার করা যেতে পারে, যেগুলোর ওপর কোনো আঠা বা পোস্টার সহজে টিকে না এবং সহজে তুলে ফেলা যায়।

  • ডিজিটাল ট্র্যাকিং: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও ক্যামেরার সাহায্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেয়াল লিখনের ছবি স্ক্যান করে অপরাধী বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে চিহ্নিত করা।

গ. বিকল্প ও বৈধ মাধ্যমের সুযোগ তৈরি

  • ডিজিটাল বিলবোর্ড ও স্ক্রিন স্থাপন: শহরের নির্দিষ্ট কিছু মোড়ে সরকারি উদ্যোগে ডিজিটাল এলইডি স্ক্রিন স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে নির্দিষ্ট ফির বিনিময়ে স্বল্পমেয়াদী বিজ্ঞাপন বা প্রচারণার সুযোগ থাকবে।

  • নির্ধারিত ‘পোস্টার জোন’ বা ‘ফ্রি ওয়াল’: সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা কর্তৃক শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে নির্দিষ্ট কিছু বোর্ড বা দেয়াল ‘পোস্টার লাগানোর নির্ধারিত স্থান’ হিসেবে ঘোষণা করা। এর বাইরে অন্য কোথাও পোস্টার লাগানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।

ঘ. সৌন্দর্যবর্ধন ও দেয়াল চিত্র (Wall Art)

  • গ্রাফিতি ও দেয়াল চিত্র: ফাঁকা বা চুনকাম করা দেয়ালে পোস্টার লাগানোর প্রবণতা বেশি থাকে। সেই সরকারি দেয়ালগুলোতে যদি স্থানীয় চারুকলা বা তরুণ শিল্পীদের দিয়ে দৃষ্টিনন্দন সামাজিক সচেতনতামূলক দেয়াল চিত্র, ঐতিহ্য বা ক্যালিগ্রাফি করিয়ে দেওয়া হয়, তবে সাধারণত কেউ সহজে তার ওপর পোস্টার লাগাতে চায় না।

ঙ. জনসচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ

  • সিটিজেন রিপোর্টিং অ্যাপ: সাধারণ নাগরিকরা যাতে অবৈধ পোস্টার বা দেয়াল লিখনের ছবি তুলে সরাসরি সিটি কর্পোরেশন বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে অ্যাপের মাধ্যমে জানাতে পারেন, তেমন ব্যবস্থা (যেমন “সবার ঢাকা” অ্যাপের আধুনিকায়ন) জোরদার করা।

  • জনসচেতনতা তৈরি: গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে “দেয়াল লিখন ও পোস্টার লাগানো (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১২” এবং এর শাস্তি সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার চালানো, যাতে মানুষ বুঝতে পারে এটি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ।

সরকারি কোনো দেয়ালে বা সম্পত্তিতে ছবি বা পোস্টার লাগাতে চাইলে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষের (সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা) লিখিত অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক, অন্যথায় এটি দণ্ডনীয় অপরাধ।

লেখক: আশরাফুল করিম সাগর অ্যাডভোকেট বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *