১ মাস ২১ দিন পর ‘আয়নাবাজি’র শিকার নিরপরাধ সোনা মিঞার কারামুক্তি


মুহাম্মদ আবু সিদ্দিক ওসমানী : কক্সবাজারে মাদকের মামলায় মূল আসামির চরম জালিয়াতি ও অভিনব প্রতারণার শিকার হয়ে ১ মাস ২১ দিন অন্যায়ভাবে কারাভোগের পর অবশেষে মুক্ত হয়েছেন নিরপরাধ সোনা মিঞা। বাস্তব জীবনের এক নির্মম ‘আয়নাবাজি’র বলির পাঠা হয়ে মৃত্যুদণ্ডের সাজা পরোয়ানার হুলিয়া মাথায় নিয়ে থাকা সোনা মিঞা আদালতের দেওয়া ৪টি কঠোর শর্ত সাপেক্ষে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেছেন।

গতকাল শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় সকল আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. ওবায়াদুর রহমান।

কারাগারের ফটক থেকে মুক্ত বাতাসে বেরিয়ে আসার পর মারাত্মক আবেগাপ্লুত সোনা মিঞা মন্তব্য করেন যে, এটি তাঁর জীবনে ‘দ্বিতীয় জন্ম’। তিনি গভীর আক্ষেপ নিয়ে বলেন, “রোহিঙ্গাদের বিশ্বাস করা ও তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা মহাপাপ। এই পাপ যেন আর দেশের কোনো মানুষ না করেন।”

নিজের সাথে ঘটা এই মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে সোনা মিঞা বলেন, “যে রোহিঙ্গা আমার নাম-পরিচয় ব্যবহার করে ইয়াবা মামলায় প্রধান আসামিদের একজন হয়েছে, তার সঙ্গে প্রায় ১০ বছর আগে আমার পরিচয় ছিল। কিন্তু সে গোপনে কীভাবে আমার জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি হাতিয়ে নিয়েছে, তা আমি কোনো দিন ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি। র‍্যাব যখন আমাকে গ্রেপ্তার করে, তখনও আমি বুঝতে পারিনি আমার অপরাধ কী বা আমার বিরুদ্ধে কী মামলা! পরবর্তীতে কারাগারে গিয়ে যখন জানতে পারি আমি নাকি ১ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, তখন আমার মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়েছিল।”

আরও পড়ুন : মাদক মামলার আসল আসামি উধাও, সাজার মুখে নিরপরাধ ব্যক্তি

তিনি আরও বলেন, “আমি কারাগারে চিৎকার করে বারবার বলেছি— জীবনে কখনো কোনো অপরাধ বা মামলায় জড়াইনি, আমাকে দয়া করে একটু তদন্ত করে দেখুন। পরবর্তীতে ছবি, আঙুলের ছাপ, শারীরিক গঠন ও পারিবারিক অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে প্রমাণ হলো আমি সেই ইয়াবা মামলার আসামি নই। মূল অপরাধী রোহিঙ্গা রমজান আমার পরিচয় ব্যবহার করে এই আয়নাবাজি চালিছিল। এই অন্যায়ের কারণে আমি প্রায় দেড় মাস বিনাদোষে জেলে বন্দি ছিলাম। আমার জীবনের মূল্যবান সময় এবং সামাজিক সম্মান ধূলিসাৎ হয়েছে, আমি এর উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ চাই। আর যে রমজান আমার পরিচয় ব্যবহার করে আমার জীবনটা প্রায় শেষ করে দিয়েছিল, আমি তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। আজ নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখা আইনজীবী, পুলিশ, গণমাধ্যমকর্মী এবং জেল সুপারের কাছে আমি আজীবন কৃতজ্ঞ।”

ঘটনার শুরু, তদন্তের গাফিলতি ও রায়ের ইতিহাস

ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল ২০২০ সালের ১ মার্চ। ওই দিন কক্সবাজার জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) শহরের কুতুবদিয়াপাড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯০ হাজার পিস ইয়াবাসহ ৫ জনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে। উক্ত মামলার এজাহারে ২ নম্বর আসামি হিসেবে নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়— ‘সোনা মিঞা, পিতা: মৃত নজির আহমদ, বর্তমান ঠিকানা: কুতুবদিয়াপাড়া, ১ নম্বর ওয়ার্ড, কক্সবাজার পৌরসভা এবং স্থায়ী ঠিকানা: গর্জনিয়া, রামু’। অভিযানের সময় গ্রেপ্তার ব্যক্তি কাছে রাখা সোনা মিঞার জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি দেখিয়ে নিজের পরিচয় নিশ্চিত করেছিল।

আদালত সূত্রে প্রাপ্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে জানা যায়, মামলার তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ডিবির পরিদর্শক মানস বড়ুয়া ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করেন। চার্জশিটে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, ২ নম্বর আসামি সোনা মিঞার দেওয়া নাম-ঠিকানা কক্সবাজার সদর ও রামু থানা পুলিশ দিয়ে অনুসন্ধান করেও সঠিক পাওয়া যায়নি। তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিটে আসামির দেওয়া পরিচয় ভুয়া বলে উল্লেখ করলেও, তাকে জেলহাজতে রেখে পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অদ্ভুত অনুরোধ জানান।

পরবর্তীতে নথি অনুযায়ী, নাম-ঠিকানা সঠিক না থাকা সত্ত্বেও ২০২২ সালের ১৩ জুন উক্ত ‘সোনা মিঞা’ পরিচয়ে থাকা আসামি কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে যান। জামিন পেয়েই আসল অপরাধী সটকে পড়ে ও আত্মগোপনে চলে যায়।

এর দীর্ঘ সময় পর, ২০২৫ সালের নভেম্বরে আদালত ওই মাদক মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করেন। রায়ে সোনা মিঞাসহ সংশ্লিষ্ট ৫ জন আসামির মধ্যে ২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ২ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১ জনকে খালাস দেওয়া হয়।

রায়ের ওপর ভিত্তি করে জারি হওয়া সাজা পরোয়ানাবলে ২০২৬ সালের ২৩ জুন র‍্যাব-১৫-এর একজন সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার আসল সোনা মিঞাকে তাঁর নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে কক্সবাজার জেলা কারাগারে পাঠিয়ে দেন।

কারাগারে জালিয়াতি উন্মোচন ও দুই ব্যক্তির নথির অমিল

কারাগারে যাওয়ার ২/৩ দিন পর আসল সোনা মিঞা বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পেরে জেলা জেল সুপার বরাবর একটি লিখিত আবেদন পেশ করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন যে তিনি এই মামলার আসামি নন এবং কখনোই পুলিশ বা গোয়েন্দাদের হাতে আটক হননি।

চিঠি পেয়ে জেলা জেল সুপার কালবিলম্ব না করে বিষয়টি কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতকে অবহিত করেন। আদালত বিষয়টির সত্যতা যাচাই করে কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। নির্দেশ পেয়ে গত ২ জুলাই কক্সবাজার সদর থানা পুলিশ আদালতে বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।

পুলিশের প্রতিবেদনে স্পষ্ট উঠে আসে যে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হয়ে জামিন পাওয়া ব্যক্তি এবং রায়ের পর ২০২৬ সালের ২৩ জুন গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিঞা একই ব্যক্তি নন। ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া মূল আসামির প্রকৃত নাম ‘রমজান’।

সদর থানার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গ্রেপ্তার সোনা মিঞাকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, মূল অপরাধী রমজান ও তিনি একই সময় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাস করতেন। পরবর্তীতে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে তারা কক্সবাজার শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় দীর্ঘদিন একই ঘরে ভাড়া থাকতেন। সেই সুযোগে কোনো এক সময় সোনা মিঞার মূল জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি রমজান নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন এবং গ্রেপ্তার হওয়ার পর নিজের পরিচয় লুকাতে সেটি পুলিশকে দেখান।

কারাগারে সংরক্ষিত ২০২০ সাল এবং ২০২৬ সালের দুটি নথিপত্র মিলিয়ে দেখা যায়—

১. ২০২০ সালের আসামি (রোহিঙ্গা রমজান): পিতা মৃত নজির আহমদ, মাতা সোনারা বেগম, স্ত্রী আয়েশা, সন্তান চারজন (দুই ছেলে ও দুই মেয়ে; বড় ছেলে মোহাম্মদ আলী)। শারীরিক গঠন— উচ্চতা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, ওজন ৫০ কেজি, গায়ের রং শ্যামলা এবং শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে দুই গালে ও ডান বাহুতে ক্ষতের চিহ্ন রয়েছে।

২. ২০২৬ সালে গ্রেপ্তার (নিরপরাধ সোনা মিঞা): পিতা মৃত নজির আহমদ, মাতা মাহমুদা খাতুন, স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস, সন্তান চারজন (এক ছেলে ও তিন মেয়ে; ছেলের নাম ওমর ফারুক ও মেয়ের নাম নাহিদা)। শারীরিক গঠন— উচ্চতা ৫ ফুট ১ ইঞ্চি, ওজন ৪২ কেজি, গায়ের রং শ্যামলা এবং শনাক্তকরণ চিহ্ন হিসেবে ডান বাহু, পেটের বামে ও পিঠের মাঝখানে সুস্পষ্ট তিলের চিহ্ন রয়েছে।

আদালতের নির্দেশ ও ৪ শর্তে মুক্তি

পুলিশের দেওয়া এই আলামত ও প্রতিবেদন আমলে নিয়ে গত ১২ আগস্ট আদালত সোনা মিঞাকে মুক্তির ঐতিহাসিক রায় ও সিদ্ধান্ত প্রদান করেন।

কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের জেলা নাজির বেদারুল আলম নিশ্চিত করেছেন যে, কারামুক্ত সোনা মিঞাকে নিম্নলিখিত ৪টি আইনি শর্ত মেনে চলতে হবে:

১. কারাগারে থাকা সোনা মিঞার মূল জাতীয় পরিচয়পত্র (NID Card) আদালতে জমা দিতে হবে।

২. প্রতি সপ্তাহে নিজ এলাকার সংশ্লিষ্ট থানায় গিয়ে হাজিরা দিতে হবে।

৩. আদালতের অনুমতি ছাড়া কোনোভাবেই দেশ ত্যাগ করতে পারবেন না।

৪. প্রতি ৩ মাস পর পর বিজ্ঞ আদালতে উপস্থিত হয়ে স্বশরীরে হাজিরা দিতে হবে।

এর পাশাপাশি, আসল জালিয়াতি ও মূল অপরাধী রোহিঙ্গা রমজানকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সনাক্ত ও গ্রেপ্তার করে আদালতের সোপর্দ করার জন্য পুলিশ প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।

কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আবদুল মন্নান মন্তব্য করেন, “এজাহার দায়ের ও চার্জশিট দাখিলসহ পুরো প্রক্রিয়ায় ডিবির তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তার মারাত্মক গাফিলতি ও দায়িত্বহীনতা প্রকাশ পেয়েছে। অন্য কারো জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করলে তা আসল নাকি ভুয়া, তা যাচাই করা পুলিশের প্রাথমিক কাজ। কিন্তু পরিচয় সঠিক নয় লিখে চার্জশিট দিয়ে তারা দায় এড়িয়েছেন। ফলে মূল আসামি জামিনে পালিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় মাথার ওপর নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর একজন নিরপরাধ মানুষকে সাজা ভোগ করতে জেলে আসতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত আদালতের নির্দেশে সত্য উদঘাটিত হয়েছে এবং আসল আসামি রমজানের কারসাজি জনসমক্ষে এসেছে।”

কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, দীর্ঘ পুলিশি তদন্তে সোনা মিঞার নাম ব্যবহার করে রমজান নামের ওই ব্যক্তির অভিনব আয়নাবাজির সত্যতা সুনির্দিষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে এবং আদালতের নির্দেশে সোনা মিঞাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *