স্বাক্ষর করা চেক অন্যের হাতে থাকলেই কি সাজা? জানুন আইন


সিরাজ প্রামাণিক : ধরুন, আপনি কারও পরিচিত। ব্যবসার সূত্রে বা বন্ধুত্বের সুবাদে তার সঙ্গে আসা-যাওয়া আছে। একদিন শুনলেন, আপনার নামে আদালতে একটি চেক ডিসঅনার মামলা হয়েছে। অথচ আপনি কখনো তার কাছ থেকে কোনো টাকা ধার নেননি, কোনো লেনদেনও হয়নি। তাহলে কি আপনাকে এমনিতেই সাজা পেতে হবে, শুধু একটি চেকে আপনার স্বাক্ষর আছে বলে?

উত্তর হলো—না। বাংলাদেশের উচ্চ আদালতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে, শুধু চেক থাকলেই বা ব্যাংক তা ডিসঅনার করলেই কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। প্রতিদিন হাজারো মানুষ এন.আই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় মামলার শিকার হচ্ছেন, যাদের অনেকেই আসলে কোনো অপরাধ করেননি। তাই এই বিষয়টি সবার জানা জরুরি।

আমাদের দেশে চেক ডিসঅনার হওয়া একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড অথবা চেকে লেখা টাকার তিনগুণ পর্যন্ত জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডই হতে পারে। এই ভয়েই বহু মানুষ আতঙ্কিত থাকেন।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, চেক ডিসঅনার হলেই মামলা “টিকে যায়” না। মামলা তখনই টেকে, যখন প্রমাণ হয় যে চেকটি সত্যিকারের কোনো ঋণ বা দেনা পরিশোধের জন্য ইস্যু করা হয়েছিল। আইনের ভাষায় একে বলে “কনসিডারেশন” বা প্রতিদান। আর এই প্রতিদান প্রমাণ করার দায়িত্ব বাদীর, আসামির নয়।

চুক্তি আইন এবং এন.আই অ্যাক্টের বিধান অনুযায়ী, কোনো প্রকার প্রতিদান বা বিনিময় ছাড়া কোনো হস্তান্তরযোগ্য দলিল (চেকও এর মধ্যে পড়ে) আইনগতভাবে কার্যকর ধরা হয় না। অর্থাৎ, শুধু কারও স্বাক্ষর করা চেক অন্যের হাতে থাকা মানেই এই নয় যে তার মধ্যে বৈধ কোনো লেনদেন ছিল।

বাস্তবে দেখা যায়, অনেক সময় পূর্বপরিচিত ব্যক্তি, ব্যবসায়িক অংশীদার বা বন্ধুর দোকানে যাতায়াতের সুযোগে কারও কাছ থেকে সিকিউরিটি হিসেবে বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নেওয়া একটি ফাঁকা (ব্লাঙ্ক) চেক পরবর্তীতে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে মামলা করা হয়। এমনকি কখনো কখনো চেক চুরি করে বা প্রতারণার মাধ্যমেও হাতিয়ে নেওয়া হয়। এমন ক্ষেত্রে চেকের পেছনে কোনো প্রকৃত ঋণ বা প্রতিদান না থাকায়, আইনের চোখে সেই চেক দিয়ে সাজা দেওয়া যায় না।

এ বিষয়ে একটি উল্লেখযোগ্য নজির হলো কুমিল্লার একটি মামলার রায় (৩৮ বিএলডি, পৃষ্ঠা ৬১৬-৬২০)। সেখানে ৪০ লক্ষ টাকার চেক ডিসঅনার হওয়া সত্ত্বেও আদালত আসামিকে খালাস দেন, এবং পরে হাইকোর্ট বিভাগও সেই রায় বহাল রাখে। আদালত স্পষ্ট করে বলেন, বাদী যদি চেকের বিপরীতে কী প্রতিদান ছিল তা প্রমাণ করতে ব্যর্থ হন, আর আসামি যদি প্রমাণ করতে পারেন যে কোনো ঋণ পরিশোধের জন্য চেক দেওয়া হয়নি, তাহলে আসামি খালাস পাবেন। শুধু চেক হাতে থাকলেই কেউ আইনের ভাষায় “হোল্ডার-ইন-ডিউ-কোর্স” হয়ে যান না।

অনেকের ধারণা, চেকে স্বাক্ষর মিলে গেলেই আসামির সাজা অবধারিত। কিন্তু উচ্চ আদালত এই যান্ত্রিক ধারণা বহুবার নাকচ করেছেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে (১৯ এএলআর, পৃষ্ঠা ৫৬) বলা হয়েছে, ১৩৮ ধারার বিচার শুধু চেকের বাহ্যিক সত্যতা যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। আদালতকে অবশ্যই বাদীর দাবির যৌক্তিকতা এবং আসামির আত্মপক্ষ সমর্থনের বিষয়টিও গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে।

অর্থাৎ, আসামি যদি যুক্তিসংগতভাবে প্রমাণ করতে পারেন যে চেকটি জোরপূর্বক, প্রতারণামূলকভাবে বা কোনো প্রকৃত লেনদেন ছাড়াই হাতিয়ে নেওয়া হয়েছিল, আদালত তা বিবেচনায় নিতে বাধ্য।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হাতের লেখা। অনেক সময় দেখা যায়, চেকের স্বাক্ষর একরকম, কিন্তু টাকার অংক ও প্রাপকের নাম লেখা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন হাতে, ভিন্ন কালিতে। এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে চেকটি প্রথমে ফাঁকা অবস্থায় ছিল এবং পরবর্তীতে অন্য কেউ নিজের ইচ্ছামতো তা পূরণ করেছেন।

এ বিষয়ে ৫৬ ডিএলআর, পৃষ্ঠা ৬ ৩৬-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে আদালত বলেছেন, আসামির স্বাক্ষর, টাকার অংক এবং প্রাপকের নাম যদি ভিন্ন ভিন্ন হাতের লেখায় হয়, তাহলে এন.আই অ্যাক্টের ৩(ই) ধারা অনুযায়ী একে বৈধভাবে “ইস্যু করা চেক” বলা যাবে না। ফলে এমন চেক আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে গণ্য হয় না।

অনেকে মনে করেন, চেক মামলায় আসামিকেই প্রমাণ করতে হয় যে তিনি নির্দোষ। বাস্তবে বিষয়টি এমন নয়। ২০২১ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে (২৬ বিএলসি, এইচসিডি, পৃষ্ঠা ৩১৫) হাইকোর্ট স্পষ্ট করে বলেছেন, চেক প্রদানের সময় প্রকৃতপক্ষে কোনো বিনিময় বা প্রতিদান নেওয়া হয়েছিল কিনা, তা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার দায়িত্ব বাদী বা রাষ্ট্রপক্ষের। এই প্রমাণে ব্যর্থ হলে মামলা টেকে না, চেকে আসামির স্বাক্ষর থাকলেও তা “বিনিময়হীন” বলে গণ্য হয়।

যারা এই মুহূর্তে ভিত্তিহীন চেক মামলার শিকার হয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন, তাদের জন্য এই বিষয়গুলো জানা অত্যন্ত জরুরি। আইন কখনোই কাউকে অন্যায়ভাবে সাজা দেওয়ার পক্ষে নয়। একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে যথাযথ তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষ্য নিয়ে আদালতে নিজের অবস্থান তুলে ধরাই সবচেয়ে কার্যকর পথ।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা, আইনগবেষক ও পিএইচ.ডি-ইন-ল (ফেলো)।  ইমেইল: seraj.pramanik@gmail.com



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *