সংরক্ষিত আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেলেন একঝাঁক নারী আইনজীবী


ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের জন্য প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। সোমবার (২০ এপ্রিল) দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ তালিকা প্রকাশ করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী

এবারের তালিকায় বিশেষভাবে প্রাধান্য পেয়েছেন আইনজীবী, তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠক, ছাত্রনেত্রী এবং দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় নারীরা। বিশেষ করে গত প্রায় ১৭ বছরের রাজনৈতিক বাস্তবতায় যারা মাঠপর্যায়ে সক্রিয় থেকেছেন, মামলা-হামলা, কারাভোগ এবং রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তাদের অভিজ্ঞতা ও ত্যাগকে গুরুত্ব দিয়ে তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে।

ফাহিমা নাসরিন মুন্নি

সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফাহিমা নাসরিন মুন্নি সংরক্ষিত নারী আসনের তালিকায় অন্যতম আলোচিত নাম। বিএনপি সরকারের সময় তিনি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি বিএনপির আন্তর্জাতিক-বিষয়ক সহ-সম্পাদক এবং দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

আইনজীবী সমাজে সুপরিচিত এই নেত্রী দীর্ঘদিন ধরে সুপ্রিম কোর্ট বারকেন্দ্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ও তিনি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন, যা তার পেশাগত গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার প্রতিফলন।

তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনাল উইমেন লইয়ার্স অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি, বাংলাদেশ ল’ অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য। রাজনৈতিক কারণে তিনি একাধিক মামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং তার পরিবারও প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। তবুও তিনি মাঠের রাজনীতি এবং টেলিভিশন টকশোতে সক্রিয় থেকে দলীয় অবস্থান তুলে ধরেছেন।

ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা

সংরক্ষিত নারী আসনের আলোচনায় থাকা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা। তিনি সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশায় নিয়োজিত এবং জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক।

তার পারিবারিক পরিচয়ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তার পিতা মরহুম সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও হুইপ ছিলেন। ২০১৫ সালে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে তাকে উগ্রবাদে অর্থায়নের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় এবং জননিরাপত্তা আইনে রিমান্ডে নেওয়া হয়। দীর্ঘ কারাভোগের পর তিনি মামলা থেকে অব্যাহতি পান।

তিনি চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। যদিও তার মনোনয়ন বাতিল হয়, পরে তিনি দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানান। বর্তমানে সংরক্ষিত নারী আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে তার নাম গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হচ্ছে।

আরিফা সুলতানা রুমা

ঢাকা বারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয়। তিনি ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকার কারণে তিনি একাধিকবার হামলা-মামলার শিকার হন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময় কয়েকবার কারাবরণ করেন। পেশাগত দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় রয়েছেন। বর্তমানে তিনি চাটমোহর পাইলট গার্লস হাইস্কুলের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বগুড়া অঞ্চল থেকে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।

শামীম আরা স্বপ্না

কক্সবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামীম আরা স্বপ্না দেশের প্রথম নারী পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে পরিচিত।

তিনি ১৯৮৬ সালে আইন পেশায় যোগ দেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) এবং ২০০১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি UNHCR-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় প্রতিষ্ঠানে লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবেও কাজ করেছেন।

ছাত্রজীবনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে পরবর্তীতে বিএনপির মূলধারার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘদিন কক্সবাজার জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০০৯ সাল থেকে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তার নেতৃত্বে সাম্প্রতিক নির্বাচনে কক্সবাজারের চারটি সংসদীয় আসনে বিএনপির বিজয় দলীয় মহলে তার সাংগঠনিক দক্ষতার বড় প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক জীবনে একাধিক মামলায় হয়রানির শিকার হলেও তিনি সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দিয়ে আসছেন।

নিপুণ রায় চৌধুরী

অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরী একজন পরিচিত নারী আইনজীবী ও সংগঠক। তিনি ঢাকা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং দলের নির্বাহী কমিটির সদস্য।

তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও বর্তমান সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরীর কন্যা এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের পুত্রবধূ। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম ও বেড়ে ওঠার কারণে ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন।

তিনি বর্তমানে নারী ও শিশু অধিকার ফোরামের সদস্য সচিব এবং দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ শাখা বিএনপির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। সাংগঠনিক দক্ষতা ও মাঠপর্যায়ের সক্রিয়তার কারণে সংরক্ষিত নারী আসনের তালিকায় তার অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।

মাধবী মারমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলার আইনজীবী ও সমাজকর্মী মাধবী মারমা সংরক্ষিত নারী আসনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন।

তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে পড়াশোনা করেন। বর্তমানে বান্দরবান জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য, দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সহ-সভাপতি এবং পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

পার্বত্য অঞ্চলে নারীর অধিকার, ভূমি বিরোধ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। তার অন্তর্ভুক্তি পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকে শক্তিশালী করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

মানছুরা আক্তার

জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মানছুরা আক্তার সংরক্ষিত নারী আসনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী এবং কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় এই নেত্রী দীর্ঘদিন ধরে রাজপথের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন।

২০২২ সালের মে মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের মিছিলে হামলার শিকার হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন এবং তার হাত ভেঙে যায়। পরে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন এবং এ ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।

২০২৩ সালেও তিনি পুনরায় হামলার শিকার হন। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে ভুয়া তথ্য প্রচার করা হয়, যা পরবর্তীতে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। সব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে তার রাজনৈতিক সক্রিয়তা তাকে নতুন প্রজন্মের শক্তিশালী প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

জহরত আদিব চৌধুরী

বিএনপির মনোনীত তালিকায় ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরী মনোনয়ন পেয়েছেন। নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে প্রথমবারের মতো মনোনয়ন পেয়েছেন জহরত আদিব চৌধুরী।

তিনি মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসন‌ থেকে একাধিকবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য, বিএনপির সাবেক প্রতিমন্ত্রী মর‌হুম অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরীর সন্তান।

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ব্যবস্থা। এই আসনগুলোর মাধ্যমে নারীরা সরাসরি সংসদীয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান এবং জাতীয় উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন।

বিএনপির এবারের তালিকায় আইনজীবী, তৃণমূল সংগঠক, ছাত্রনেত্রী এবং পেশাজীবীদের সমন্বয় ঘটানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একদিকে অভিজ্ঞতা ও ত্যাগকে মূল্যায়ন করছে, অন্যদিকে নতুন নেতৃত্বের উত্থানের পথও সুগম করছে।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *