মহাকবির ব্যারিস্টার হয়ে ওঠার নেপথ্য গল্প


শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান [প্রবন্ধটি শিক্ষানবিশ আইনজীবী শাহ্‌ সাদেক আহমেদকে উৎসর্গকৃত]

মহাকবি, নাট্যকার, বাংলা ভাষার সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩) বাঙালি পথিকৃৎ ব্যারিস্টারদের অন্যতম। তিনি কলকাতা হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠার সমকালে ব্যারিস্টারি শিক্ষার জন্য ১৮৬২ সালের ৯ই জুন কলকাতা থেকে বিলেতে যাত্রা করেন। প্রায় এক মাস পর ১৯শে জুলাই তাঁকে বহনকারী জাহাজ ভেড়ে ইংল্যান্ডের উপকূলে। ইংরেজি সাহিত্যে বড়ো কবি হওয়ার স্বপ্ন তাঁর ফুরিয়ে গেছে। এখন আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভের জন্য তিনি ব্যারিস্টারি হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বিলেতে এলেন। বাল্যকালে বাড়িতে তাঁর পিতা রাজনারায়ণ দত্তের আইনের চর্চা দেখেছিলেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত খুব মেধাবী ছিলেন। প্রায় চল্লিশ বছর বয়সে তিনি নব্য উদ্যমে ব্যারিস্টারি পড়ার অধ্যয়ন শুরু করেন।

প্রচুর ধনসম্পত্তির মালিক হতে গেলে তাঁকে ব্যারিস্টার হয়ে ফিরতে হবে দেশে, এই ছিল তাঁর অভিপ্রায়। তিনি তাঁর বাবাকে দেখেছেন ওকালতি করে যথেষ্ট আয় করতে। তিনি জানতেন খুব শীঘ্রই কলকাতায় হাইকোর্ট প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি সেই হাইকোর্টে ওকালতি করবেন। ওকালতি করে তাঁর প্রতিষ্ঠা লাভের স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। ব্যারিস্টারি শিক্ষার জন্য লন্ডনে চারটি ইনস অব কোর্ট রয়েছে। ইহা ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের ঐতিহ্যবাহী পেশাগত সংস্থা। যারা ব্যারিস্টারদের বারে কল করতে পারে। প্রত্যেক ব্যারিস্টারকে কোনো না কোনো ইনের সদস্য হতে হয়। এই ইনগুলো হলো—লিঙ্কনস ইন, ইনার টেম্পল, গ্রেজ ইন এবং মিডল টেম্পল। এই চারটি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে বলা হয় ইনস অব কোর্ট। ১৮৬২ সালের ১৯শে আগস্ট মাইকেল মধুসূদন দত্ত গ্রেজ ইন-এ ভর্তি হলেন। তাঁর ভর্তির রশিদ ও দলিলের আলোকচিত্র সংশ্লিষ্ট ইনে আজও সংরক্ষিত রয়েছে।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ব্যারিস্টারি শিক্ষার পথ সুগম ছিল না। তিনি এ সময় চরম অর্থ সংকটে পড়েন। দেনার দায়ে তাঁর জেলখানায় যাওয়ার উপক্রম হয়। কোনো টাকা-পয়সা না পেয়ে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে চিঠি লিখে সবকিছু জানান এবং তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করেন। বিদ্যাসাগর তাঁর অর্থকষ্টে এগিয়ে এলেন। তিনি মধুসূদনকে টাকা পাঠান। টাকা পেয়ে মধুসূদন ধার দেনা পরিশোধ করে নিশ্চিত জেলের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করেন। ওদিকে তিনি গ্রেজ ইন-এ যে টাকা জমা দিয়েছিলেন সেখান থেকে চারশ পঞ্চাশ টাকা ধার করেছিলেন। সেই টাকা সময়মতো পরিশোধ করতে না পারায় তাঁকে কর্তৃপক্ষ বহিষ্কার করে। একপ্রকার অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তাঁর ব্যারিস্টারি শিক্ষা। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে তিনি এক চিঠিতে লেখেন:

দুদিনের ভেতরেই এ বছরের প্রথম টার্ম [হিলারি টার্ম] শুরু হচ্ছে। এ সময়ের ভেতর আমার লন্ডনে ফিরে যাবার জন্য কোনো রকমের পার্থিব সম্ভাবনা আমি দেখছি না। আরও কতকগুলো টার্ম যে আমাকে হারাতে হবে, তা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। যদি আমাকে কোনো বাধার মুখোমুখি না হতে হতো, তাহলে আগামী জুনের ভেতর আমি ব্যারিস্টার হয়ে নিজের দেশে ফিরে যেতে পারতাম। তারপরও আমি হতাশাবাদী মানুষ নই। ভাগ্যবিড়ম্বিত এ প্রবাস জীবনের যতখানি সদ্ব্যবহার করা সম্ভব, তা করছি। এ কারণে মনে হয় কোনো প্রকার গর্ব না করেই আমি বলতে পারি, বর্তমানে জীবিত কোনো বাঙালির ভেতর আমিই সবচেয়ে বেশি ভাষা জানি। কিন্তু বিদ্যার্জন তো টাকা নয়! অথচ আমাদের ভেতর অন্তঃসারশূন্য মানুষগুলোর কাছে টাকাই তো সব। একমাত্র আপনি আমাকে এ সংকটময় অবস্থা থেকে মুক্ত করুন, প্রিয় বিদ্যাসাগর।

এই চরম দুঃসময়ে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তাঁকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি প্রদান করা হয়। যাতে প্রয়োজনে দেশে মাইকেল মধুসূদন দত্তের সম্পত্তি বিক্রয় করে তিনি টাকা পাঠাতে পারেন। বিদ্যাসাগর কখনোই মধুসূদনের সম্পত্তি বিক্রয় করে নয়, বরং বন্ধক রেখে তাঁকে টাকা পাঠাতেন। সেই টাকা পেয়ে মাইকেল মধুসূদন শেষ করেন তাঁর ব্যারিস্টারি শিক্ষা। ১৮৬৬ সালের ১৭ই নভেম্বর তিনি ব্যারিস্টারি পাশ করেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর পাশে না দাঁড়ালে কোনো প্রকারেই তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না ব্যারিস্টারি শিক্ষা শেষ করা। কৃতজ্ঞ চিত্তে তিনি চিঠিতে প্রকাশ করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মহত্ত্বের কথা। ঐদিন তিনি এক পত্রে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে লিখেছেন:

প্রিয় বন্ধু, জেনে খুশি হবেন যে, গ্রেজ ইন সোসাইটি গতকাল রাতে আমাকে ব্যারিস্টার হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমি এখন ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল। এসব কিছুর জন্য আমি প্রথমত ঈশ্বরের কাছে ঋণী, তারপর আপনার কাছে। আপনাকে নিশ্চিত বলতে পারি, চিরকাল আমি আপনাকে আমার মহৎ শুভাকাঙ্ক্ষী ও প্রকৃত বন্ধু বলে মনে রাখব। আপনি যদি না থাকতেন, তাহলে আমার অবস্থা কী হতো কে জানে।

মাইকেল মধুসূদন দত্ত লন্ডন থেকে ফিরে আসার আগে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে অনুরোধ করেছিলেন, তাঁর জন্য একটা ভালো দোতলা বাড়ি ঠিক করে রাখতে। যার উপরতলায় তিনি থাকবেন, আর নিচতলায় হবে অফিস। বিদ্যাসাগর তাঁর জন্য প্রেসিডেন্সি কলেজের সহকারী অধ্যাপক রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২৩ নম্বর সুকিয়া স্ট্রিটে একটি চমৎকার বাড়ি ভাড়া করে রেখেছিলেন। কিন্তু মাইকেল মধুসূদন দত্ত সেখানে উঠলেন না। ব্যারিস্টার মধুসূদন উঠলেন সমকালে কলকাতার সবচেয়ে ব্যয়বহুল স্পেনসেস হোটেলে।

এদিকে হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করার অনুমতি চেয়ে আবেদন করলে প্রত্যাখ্যাত হয় ব্যারিস্টার মধুসূদনের আবেদন। হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি স্যার বার্নস পীকক, বিচারপতি জি লখ, বেইলি, জেবি নর্ম্যান, এফ এ বি গ্লেভার, সিটন কার এবং এফ বি কেম্প ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও বিচারপতি এল এস জ্যাকসন জানান যে, মতামত দেওয়ার আগে তিনি কিছু খোঁজখবর নিতে চান। ব্যারিস্টার মধুসূদনকে গ্রহণের ব্যাপারে তীব্র বিরোধিতা করেন বিচারপতি এ জি ম্যাকফারসন। তিনি লিখেছিলেন:

আমার মনে হয় যতোদিন না আরো বেশি এবং আরো সন্তোষজনক প্রমাণ পাওয়া যায় যে, তিনি অ্যাডভোকেট হবার মতো লোক, ততোদিন মিস্টার দত্তকে অ্যাডভোকেট হিসেবে গ্রহণ করা উচিত হবে না। মিস্টার দত্তের অতীত এবং পুলিশ কোর্টের দোভাষী হিসেবে তাঁর চাকরির খতিয়ান থেকে মনে হয় যে, তিনি তেমন ব্যক্তি নন। … এটা বেশ লক্ষণীয় যে, মি. দত্ত ইংল্যান্ডের কারো চিঠিপত্র দাখিল করেননি। এমনকি, কোনো সরকারি কর্মকর্তার অথবা তিনি সেখানে যাবার আগে যাঁদের অধীনে কাজ করেছিলেন, তাঁদের কোনো চিঠিও নয়।

বিচারপতি ম্যাকফারসনের তীব্র বিরোধিতার কারণে বিচারপতি জেবি নর্ম্যানও আগের মতামত প্রত্যাহার করে মতামত দেন যে, “মিস্টার দত্ত যত কম টার্ম লেখাপড়া শিখেছেন এবং তাঁর বদনামের পরিপ্রেক্ষিতে, আমি তাঁকে হাইকোর্টে গ্রহণ করার পক্ষে সম্মতি দিতে পারছি না—যতোদিন মিস্টার দত্তের যোগ্যতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট প্রশংসাপত্র এবং চরিত্র সম্পর্কে সন্তোষজনক প্রমাণ পাওয়া যায়।”

মাইকেল মধুসূদন ভাবতে পারেননি, এমনটা ঘটতে পারে। দেশীয় বিচারপতি শম্ভুনাথ পণ্ডিত পক্ষে থাকার পরও, নর্ম্যান একটু নমনীয় হলেও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রধান বিচারপতি পীকক তাঁর পক্ষে যে মতামত দিয়েছিলেন, তা প্রত্যাহার করে নেন। শম্ভুনাথ পণ্ডিত এটিকে দেশীয়দের বিরুদ্ধে সাহেবদের ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করে মধুসূদনের পাশে দাঁড়ান। ১৮৬৭ সালের ১১ই এপ্রিল তিনি মধুসূদনকে প্রশংসাপত্র জোগাড় করতে বলেন। এ বিষয়ে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে ব্যারিস্টার মধুসূদন এক পত্রে লিখেছেন:

আজ সকালে আমি পণ্ডিতজির কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে যত বেশি সম্ভব গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সনদপত্র সংগ্রহ করতে বলেছেন। তারপর আমি দিগম্বর মিত্রের কাছে গিয়েছি। সে আমাকে রাজেন্দ্রলাল মিত্রকে সাথে নিয়ে রাজা কালীকৃণের কাছে যাবার জন্য বলেছে। রাজেন্দ্র আজ বিকেলেই যেতে চেয়েছেন। তারপর আমি আর জি ঘোষের সাথে দেখা করে একটা সনদ চেয়েছি। তিনি আমাকে আগামী শনিবার যেতে বলেছেন। শম্ভুনাথের কাছ থেকে জেনেছি, আমাদের শত্রুরা জজ সাহেবদের কান ভাঙিয়েছেন। তাই বিষের চেয়ে কড়া প্রতিষেধক দরকার। তিনি চাইছেন আপনি কলকাতায় চলে আসুন। আমি আমার নিজের কথা কী বলব, জানি না। একটু সময় নষ্ট না করে আগামী সপ্তাহের প্রথম দিকেই কাগজপত্র নিয়ে আমাকে হাজির হতে হবে। নিতান্তই আপনি যদি না আসতে পারেন, তাহলে ফেরত ডাকে আমাকে একটা প্রশংসা সনদ পাঠিয়ে দেবেন। তারপর আমি দিগম্বরকে নিয়ে দেখি কতদূর কী করতে পারি। যদিও তাকে আমি খুব একটা পছন্দ করি না। সেটা আপনি জানেন। শম্ভুনাথ বলেছেন, ‘এ বিষয়ে না জিতলে মান থাকবে না।’ সবার সমর্থন পেলে সফল হওয়া সম্ভব, এটা তিনি আশা করেন। দ্রুত আর্থিক সংকটে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে আমার। গাড়িভাড়ার জন্য প্রতিদিন বেশ পয়সা খরচ হচ্ছে। অন্যদিকে চাকরগুলো মার্চ মাসের বেতনের জন্য তাগিদ দিচ্ছে। হোটেলের বিল এ মাসের শেষেও দিলে চলবে। …প্রশংসাপত্র পাবার চেষ্টায় এখন আমি যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের কাছে যাচ্ছি।

ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হলেও মধুসূদন ছাড়ার পাত্র নন। ১৮৬৭ সালের ১১ই এপ্রিল থেকে ২২শে এপ্রিল এই এগারো দিনে কলকাতার নামজাদা ব্যক্তিদের প্রশংসাপত্র তিনি জোগাড় করেন। যারা প্রশংসাপত্র দেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জমিদার যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, সম্পাদক ও ওয়ার্ডস ইনস্টিটিউটের পরিচালক রাজেন্দ্রলাল মিত্র, হাইকোর্টের উকিল কৃষ্ণকিশোর ঘোষ, উকিল (পরে বিচারপতি) অনুকূলচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, উকিল মহেশচন্দ্র চৌধুরী, উকিল (পরে বিচারপতি) দ্বারকানাথ মিত্র, সাহিত্যিক ও এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড হর্টিকালচারাল সোসাইটির ভাইস প্রেসিডেন্ট প্যারিচাঁদ মিত্র, জমিদার রাজেন্দ্র মল্লিক, বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য রমানাথ ঠাকুর, জমিদার দেবেন্দ্র মল্লিক, টিপু সুলতানের পুত্র গোলাম মহম্মদ, সংস্কৃত কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, সংস্কৃত কলেজের অধ্যাপক প্রসন্নকুমার সর্বাধিকারী, সংস্কৃত কলেজের সহকারী অধ্যাপক রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অ্যাটর্নি রমানাথ লাহা, অ্যাটর্নি গিরিশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, অ্যাটর্নি ব্রজনাথ মিত্র, অ্যাটর্নি তারাবল্লভ চট্টোপাধ্যায়, জমিদার হরলাল শীল, জমিদার যাদবকৃষ্ণ সিংহ, জমিদার ও. সি দত্ত, জমিদার গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জমিদার দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ।

এরা সবাই ব্যারিস্টার মধুসূদনের পিতৃপরিচয় তুলে ধরে ব্যক্তিচরিত্র এবং কবি হিসেবে প্রশংসা করেন। কলকাতার এত সব বিখ্যাত ব্যক্তিদের প্রশংসাপত্র পাওয়ার পর মধুসূদনের আবেদন নাকচ করা আর সম্ভব হয়নি। অবশেষে ১৮৬৭ সালের ৩রা মে তারিখে তাঁর আবেদনপত্র গৃহীত হয়। ৭ই মে থেকে মধুসূদন নিয়মিত হাইকোর্টে তাঁর প্র্যাকটিস শুরু করেন। প্র্যাকটিসের প্রথমদিকে টাকা-পয়সা যা পেয়েছেন দুই হাতে উড়িয়েছেন তিনি। বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে হৈ-হুল্লোড় করে কাটিয়েছেন তিনি।

ব্যারিস্টার মধুসূদনের জীবনীকার জানিয়েছেন: “একা মানুষ, কিন্তু হোটেলে ভাড়া নিয়েছিলেন তিনটি ঘর। সেখানে একটি দুটি নয়, প্রতি বেলায় নাকি ছটি ডিশ খেতেন। তা ছাড়া, বন্ধু-বান্ধবদের দেশীয় এবং বিদেশি খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। ভোজ দিতেন মাঝেমধ্যে। আর নিজের সুরাগারে রাখতেন শেরি, শ্যাম্পেন, হুইস্কি, বিয়ার—নানা রকমের শরাব এবং তা অকাতরে বিলাতেন বন্ধুদের। এভাবে অনেক টাকা উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তা নয়। কিন্তু তাঁকে স্থূল উদর-পূজারী হিসেবে কল্পনা করা অসম্ভব। জীবনের গভীর আস্বাদ নেবার জন্য তিনি অন্য কী উপাচার সাজিয়েছিলেন, আজ আর তা বলার উপায় নেই। সমসাময়িক অনেক নাম-করা লোকের মতো তিনি রক্ষিতা রাখেননি, এটা অবশ্য নিশ্চিতভাবে বলা যায়।”

আর্থিক সংকটের এক পর্যায়ে তিনি হোটেল ছাড়তে বাধ্য হন। ব্যারিস্টারি পেশা থেকে যা আয় হতো তা ছিল ব্যয়ের তুলনায় খুব সামান্য। তিনি আইন ব্যবসায় সফল হতে পারেননি। পরিচিত লোক হলে তিনি তাদের কাছ থেকে টাকা না নিয়ে মামলা পরিচালনা করতেন। আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে চিঠি নিয়ে কেউ এলে কোনো টাকা-পয়সা ছাড়াই মামলা পরিচালনা করতেন তিনি। কখনো এক বোতল মদের বিনিময়েও মামলার কাজ করতেন। গবেষক ও জীবনীকারদের সূত্রে আরও জানা যায়, তিনি যে মামলার পক্ষে কাজ করতেন; অধিকাংশ ক্ষেত্রে সমর্থনকারী পক্ষ হিসেবে তিনি পরাজিত হতেন। এ ঘটনা আদালত পাড়ায় রটে গেলে তাঁর পেশার প্রভূত ক্ষতি হয়।

জানা যায়, সমকালে প্রসন্নকুমার ঠাকুরের উইল ভাতা নামক ইস্যু নিয়ে একটি মামলা চলেছিল। ব্যারিস্টার মধুসূদন ছিলেন বাবু জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের পক্ষ সমর্থনকারী কৌসুলি। সমকালে সংবাদ প্রভাকরে এ খবর প্রকাশিত হয়: “এই সপ্তাহের প্রথমাবধি হাইকোর্টে বাবু প্রসন্নকুমার ঠাকুরের উইলের মোকদ্দমা হইতেছে। শ্রীযুক্ত বাবু যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরের পক্ষে প্রায় সমস্ত ব্যারিস্টার নিযুক্ত হইয়াছেন। বাবু জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরের পক্ষে কেবল কেনেডি সাহেব ও মাইকেল মধুসূদন দত্ত আছেন।”

এই মামলায় ব্যারিস্টার মধুসূদনের পক্ষ পরাজিত হয়। কলকাতা হাইকোর্টের জনৈক মাইকেল মধুসূদন দত্তের স্নেহভাজন এক দাতা ব্যারিস্টারি পেশা সম্পর্কে বলেছিলেন: “কোর্টে তাঁর সাবমিশন ছিল খুব মজার। তিনি হাইকোর্টে ব্যারিস্টারি করার সময় খুব উঁচুগলায় কথা বলতেন। তাঁর বক্তৃতাও ছিল অত্যন্ত তেজোদীপ্ত। মাঝে মাঝে তিনি উত্তেজিত হয়ে উঠতেন, অন্যদের মতো তোষামোদ করে বিচারকের মন তুষ্ট করার চেষ্টা করতেন না। একবার জজ জ্যাকসনের এজলাসে মধুসূদন খুব উঁচুগলায় বক্তৃতা দেওয়ায় জজ বিরক্ত হয়ে বললেন, The Court orders you to speake slowly. The Court has ears. মধুসূদন তৎক্ষণাৎ জবাব দিলেন, But pretty too long, My lord.”

ব্যারিস্টার মধুসূদন অনেক মামলায় জিতেছিলেন; ১৮৬৮ সালে তিনি শ্রীরামপুরের জমিদার গোপীকৃষ্ণ গোঁসাই-এর মামলাসহ একাধিক মামলায় জয়ী হয়েছিলেন। এই সময়েই শ্যামাচরণ সান্যাল নামক এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নাটক লিখে কুৎসা রটানোর অভিযোগে মামলা দায়ের হয়। মধুসূদন শ্যামাচরণের পক্ষ অবলম্বন করে মামলায় জয়লাভ করতে পারেননি। সমকালে সংবাদ ‘ভাস্কর’ পত্রিকায় এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল।

ঢাকাবাসীর অভিনন্দনের উত্তরে ব্যারিস্টার মাইকেল মদুসূদন দত্তের লেখা সনেট, সাথে প্রখ্যাত শিল্পী অতুল বসুর আঁকা কবি মধুসূদনের প্রতিকৃতি। প্রতিকৃতিটি বর্তমানে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে সংরক্ষিত আছে।
ঢাকাবাসীর অভিনন্দনের উত্তরে ব্যারিস্টার মাইকেল মদুসূদন দত্তের লেখা সনেট, সাথে প্রখ্যাত শিল্পী অতুল বসুর আঁকা কবি মধুসূদনের প্রতিকৃতি। প্রতিকৃতিটি বর্তমানে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে সংরক্ষিত আছে। ঢাকাবাসীর অভিনন্দনের উত্তরে ব্যারিস্টার মাইকেল মদুসূদন দত্তের লেখা সনেট, সাথে প্রখ্যাত শিল্পী অতুল বসুর আঁকা কবি মধুসূদনের প্রতিকৃতি। প্রতিকৃতিটি বর্তমানে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে সংরক্ষিত আছে।

ব্যারিস্টার হিসেবে মাইকেল মধুসূদন খুব খ্যাতি অর্জন না করলেও তাঁর মক্কেলের কমতি ছিল না। একদিনের এক ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। ১৮৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে জুলাই বন্ধু গৌরদাস বসাক দেখা করতে যান ব্যারিস্টার মধুসূদনের সাথে। কিন্তু সেদিন তিনি এত ব্যস্ত ছিলেন প্রিয় বন্ধুর সাথেও কথা বলার সুযোগ পাননি। পরে বন্ধুকে চিঠি লিখে অনুশোচনা করছেন মধুসূদন। জানা যায়, ১৮৬৮-৬৯ সালের দিকে মাইকেল মধুসূদন মাসে দেড়-দুই হাজার টাকা আয় করতেন। সে সময়ের তুলনায় এ টাকা খুব সামান্য নয়। মধুসূদন শুধু হাইকোর্টে মামলা পরিচালনা করতেন না, তিনি মফস্বলেও যেতেন মামলার কাজে। কখনও কৃষ্ণনগর, কখনও বর্ধমান, কখনও যশোর। একবার গিয়েছিলেন বারুইপুরে। তখন সেখানে হাকিম ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ব্যারিস্টার মধুসূদন মাঝেমধ্যে মোকদ্দমার কাজে ঢাকা, পুরুলিয়াতেও যেতেন। তখন তাঁর চেম্বার ছিল কলকাতার ৭ নম্বর পোস্ট অফিস স্ট্রিটে।

এত কিছুর পরও যখন শোনা যায়, মধুসূদন সফল ব্যারিস্টার ছিলেন না; এ কথা একবারে সত্য নয়। তাঁর অসাধারণ প্রতিভা ছিল। সমকালে কলকাতা হাইকোর্টে ইংরেজ ব্যারিস্টারসহ হাতেগোনা কয়েকজন ব্যারিস্টার থাকলেও, তাদের মধ্যে ছিল ভয়ানক প্রতিযোগিতা। মধুসূদন ভালো ব্যারিস্টার ছিলেন, তবে আইন পেশায় ব্যাপক পসার ঘটাতে পারেননি।

ব্যারিস্টার মধুসূদন যাদের সঙ্গে মিশতেন, তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতেন। কিন্তু সবার সঙ্গে মিশতেন না, তিনি জনতার সঙ্গে অন্যান্য আইনজীবীদের মতো নিজেকে সেভাবে মেলাতে পারতেন না। কিন্তু তিনি যে পেশা বেছে নিয়েছিলেন, সেটা জনতার সঙ্গেই মিশতে হয়, কাজ করতে হতো। তিনি ব্যারিস্টারি থেকে তাঁর আর্থিক অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি ঘটাতে পারেননি—এ কেবল মক্কেলের অভাবে নয়। মক্কেলের কাছ থেকে টাকা আদায় করার মতো কৌশল অথবা মনোবৃত্তিও তাঁর ছিল না। দুঃসহ অনটনের মধ্যেও তিনি প্রতিবেশী-পরিচিতদের কাছ থেকে টাকা নিতে পারতেন না। সমকালের বন্ধু, সহকর্মীগণ তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এ কথা বারবার উচ্চারণ করেছেন।

ব্যারিস্টারিতে আশানুরূপ সাফল্য না আসায় তিনি প্র্যাকটিস ছেড়ে ১৮৭০ সালের জুন মাসে চাকরি হিসেবে হাইকোর্টের প্রিভি কাউন্সিলে আপিল বিভাগের অনুবাদ বিভাগে পরীক্ষকের পদ গ্রহণ করেন। ব্যারিস্টার মধুসূদনের এই সিদ্ধান্তকে সমকালে অনেকেই স্বাগত জানান। সমকালে পত্র-পত্রিকাগুলো এ সংক্রান্ত খবর ছেপে তাকে স্বাগত জানায় কেউ কেউ। সমকালে ইংরেজি পত্রিকা ইংলিশম্যান সংবাদ প্রকাশ করে জানায় যে, এর চেয়ে ভালো মনোনয়ন আর হতে পারে না, কেননা মধুসূদনের মতো ভালো ইংরেজি জানা দেশীয় কোনো ব্যক্তি দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে না।

ব্যারিস্টার মধুসূদনের বন্ধু ভূদেব মুখোপাধ্যায় এই সংবাদে লেখেন: “আমরা আহ্লাদিত হইয়াছি, মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রিভি কাউন্সিলে আপীলের অনুবাদ সমস্তের প্রধান পরীক্ষক নিযুক্ত হইয়াছেন। ইংলিশম্যান উক্ত দত্তজের কি ইংরাজি, কি দেশীয় উভয় সাহিত্যজ্ঞানের বিশেষ প্রশংসা করিয়াছেন।”

বছরখানেকের একটু বেশি সময় চাকরি করার পর আবার তিনি ১৮৭২ সালের দিকে আইন ব্যবসায় ফিরে আসেন। ঢাকায় ব্যারিস্টার হিসেবে কাজ করার সুযোগ আছে বিধায় সমকালে বেঙ্গল ডাইরেক্টরিতে [বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তাদের যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত বাংলাদেশ ডিরেক্টরির ন্যায়] তাঁর ঢাকার চেম্বারের ঠিকানা লেখা ছিল। এসময় তিনি পোস্ট অফিস রোডের চেম্বার ছেড়ে দেন। তিনি ঢাকায় স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। ঢাকায় এলে ঢাকার সুধী সমাজ কবিকে সংবর্ধিত করে। দ্বিতীয়বার এসে ঢাকাকে উদ্দেশ্য করে একটি সনেট রচনা করেন তিনি।

ঢাকা থেকে ফিরে মধুসূদনের চেম্বার নেই, প্র্যাকটিস করার মতো শারীরিক শক্তিও তাঁর নেই। এমন সময় ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দের গোড়ার দিকে একটি মোকদ্দমায় বাদীপক্ষের ডাক পেলেন পুরুলিয়া থেকে। ফেব্রুয়ারি মাসের তৃতীয় সপ্তাহে তিনি পুরুলিয়া গেলেন। পুরুলিয়াতেও তিনি সংবর্ধিত হন। মধুসূদন পুরুলিয়া এসেছেন শুনে পঞ্চকোটের রাজা নীলমণি সিংহদেব ব্যারিস্টার মধুসূদনকে নিতে লোক পাঠান, ততদিনে মধুসূদন কলকাতা ফিরে এসেছেন। কিছুদিন পর পঞ্চকোটের রাজা কলকাতায় লোক পাঠিয়ে তাঁর ম্যানেজার পদ বা আইন উপদেষ্টার পদ গ্রহণের জন্য মধুসূদনকে প্রস্তাব দেন। মধুসূদনও চরম সংকট মুহূর্তে এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন।

এ সময় রাজা নীলমণি সিংহ একটি দেওয়ানি মামলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। ম্যানেজার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পরে প্রথমেই কবির ওপর প্রধান দায়িত্ব পড়ে শারদাপ্রসাদের বিরুদ্ধে মামলায় তদবির করা। মধুসূদন এ মামলায় নিম্ন আদালতে পরাজিত হন। মামলায় হেরে গিয়ে তিনি হাইকোর্টে আপিল করেন। এই আপিলে জেতানোর ভার পড়ে মধুসূদনের ওপর। কিন্তু আপিলে নিম্ন আদালতের রায় ও ডিক্রি বহাল থাকে। এতে রাজা দেব মনোক্ষুণ্ন হন এবং ব্যারিস্টার মধুসূদনের ওপর ক্ষুব্ধ হন।

এরপর ব্যারিস্টার মধুসূদন শারীরিক অসুস্থতা ও অর্থাভাবে জর্জরিত হয়ে পড়েন। তাঁর পক্ষে আর পুরোপুরিভাবে ব্যারিস্টারি পেশায় ফিরে আসা সম্ভব হয়নি এবং স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটেনি। তিনি ১৮৭৩ সালের ২৯শে জুন কলকাতার আলীপুর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। পেশাগত দিক থেকে একজন নীতিবান প্রাজ্ঞ ব্যারিস্টার হিসেবে মাইকেল মধুসূদন ব্যারিস্টারি জীবনে তিনি যে কঠোর সাধনা করেছেন, পরিশ্রম করেছিলেন, তা আজও আইনাঙ্গনের গবেষক, শিক্ষার্থী ও আইনজীবী এবং বিচারকদের নিকট শিক্ষণীয়। ব্যারিস্টার হিসেবে তিনি বিশেষ সফল হতে পারেননি বটে। তবে পরিবার, আত্মীয়পরিজন, পরিচিতজনসহ মানুষের জন্য আইনি সেবায় তাঁর যে মানবিক অনুভূতি এবং সরলতা আজও প্রাসঙ্গিক। একজন পথিকৃৎ বাঙালি ব্যারিস্টার হিসেবে ব্যারিস্টার মধুসূদনকে বাঙালি জাতি চিরকাল স্মরণ করবে এবং আইনাঙ্গনেও চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

সহায়ক গ্রন্থ: ১. ‘লিগ্যাল ইস্যু’, আরিফ খান (সম্পাদক), ঢাকা, এপ্রিল ২০১৬, বাঙালি ব্যারিস্টারদের ইতিহাস, পৃ. ৩-১২। ২. প্রাগুক্ত, ব্যারিস্টারদের তীর্থস্থান: ইনস্ আব কোর্ট, পৃ. ১৮-২২। ৩. খসরু পারভেজ, জানা অজানা মধুসূদন, কথা প্রকাশ, ঢাকা, প্রকাশ কাল ২০২৫, পৃ. ৬৪-৭৭। ৪. বাংলাপিডিয়া: সিরাজুল ইসলাম (প্রধান সম্পাদক), প্রকাশকাল ২০০৩, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা।

লেখক: শাহ্ মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান; গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য-সমালোচক।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *