প্রস্তাবিত সম্পত্তি হস্তান্তর সংশোধন আইন: সম্ভাব্য জটিলতা ও করণীয়


মতিউর রহমান: সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো পদক্ষেপ। তবে, আইনটির কিছু অস্পষ্টতার ফলে সম্ভাব্য যেসব সমস্যা উদ্ভূত হতে পারে, সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা সমীচীন মনে করি।

১. জীবনস্বত্ব (Life-time Enjoyment Right) সংরক্ষণ ও সম্ভাব্য অপরাধমূলক ঝুঁকি

জীবনস্বত্ব (life-time enjoyment right) সংরক্ষণ রেখে এই ধরনের দান অনেকটাই ওসিয়তের মতো। সম্পত্তি দান করে হস্তান্তর করা হলেও দখল ও ভোগস্বত্ব দানকারীর কাছেই থাকছে। “The right to life-time enjoyment (usufruct right)”-এর কোনো স্পষ্ট সংজ্ঞায়ন নেই। ফলে আনুষ্ঠানিক দখল হস্তান্তর না থাকার বিষয়টিই প্রতীয়মান হয়। অর্থাৎ, দানকারী সম্পত্তি নিজের কাছে রেখে তা আমৃত্যু ভোগ-দখল করার অধিকার সংরক্ষণ করবেন। ফলে কাগজে-কলমে দান সম্পন্ন হলেও বাস্তবে সম্পত্তির হস্তান্তর দৃশ্যমান হবে না। এই ধরনের হস্তান্তর একান্তই পরিবারের আপন সদস্যদের মধ্যে হবে। তাই এই সুযোগে বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কার্যক্রম ও প্রতারণামূলক হস্তান্তর সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেমন:

ক) পূর্বের গোপনেকৃত দান ও পরবর্তী প্রতারণা

পূর্বে গোপনে জীবনস্বত্ব (life-time enjoyment right) সংরক্ষণ রেখে দান দলিল সম্পাদন করে রাখা হতে পারে এবং পরবর্তীতে একই জমি অন্যত্র কবলা বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে পরবর্তী তৃতীয় পক্ষের হস্তান্তরগ্রহীতা পূর্ববর্তী দান সম্পর্কে না জানাটিই স্বাভাবিক, কারণ এই প্রকার দানে পূর্বে সম্পত্তির দখল হস্তান্তরিত হয় না এবং এই প্রকার হস্তান্তর শুধুই পরিবারের সদস্যদের মধ্যে হয়। অথচ দখল হস্তান্তর ছাড়াই পূর্বের দানটি বৈধ হওয়ায় পরবর্তী তৃতীয় পক্ষ হস্তান্তরগ্রহীতার দলিলটি অকার্যকর হয়ে পড়বে। ফলে পরবর্তী গ্রহীতা প্রতারিত হবেন। কিন্তু তিনি এই প্রতারণার জন্য প্রতারক হস্তান্তরকারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার সুযোগও হয়তো পাবেন না, কারণ ততদিনে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। কারণ, হস্তান্তরকারীর মৃত্যুর পরে জীবনস্বত্ব বিলোপ অন্তেই সাধারণত দখল নিয়ে প্রশ্ন উঠে এই বিবাদ সামনে আসবে। আবার, সিভিল মামলা করে পূর্ববর্তী হস্তান্তর প্রতারণামূলক (Fraudulent Transfer) তা প্রমাণ করাও তার জন্য কঠিন হবে, তাই উপযুক্ত প্রতিকার পাওয়া কঠিন হবে।

খ) ভুয়া দলিলের দৌরাত্ম্য ও মামলা বৃদ্ধি

আমরা বর্তমানে অনেক সময়ই দেখি, সন্তান বা নাতি-নাতনিরা হঠাৎ পূর্বসূরিদের কোনো একটি দলিল বের করে জমির মালিকানা দাবি করে বসেন। পরবর্তীতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, দলিলটি অকার্যকর বা জাল। জীবনস্বত্ব রেখে প্রকৃত দখল হস্তান্তর ছাড়াই দলিলভিত্তিক দানের সুযোগ থাকায় ভবিষ্যতে এভাবে ভুয়া দলিল বের করে জমির দাবি এবং এ-সংক্রান্ত মামলা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গ) অননুচিত প্রভাব (Undue Influence) ও গোপন দলিল

কোনো লোভী সন্তান বা নাতি-নাতনি বৃদ্ধ পিতা-মাতা কিংবা দাদা-দাদির সরলতার সুযোগ নিয়ে, প্ররোচিত করে বা অন্য কোনোভাবে তাঁদের অনিচ্ছা সত্ত্বেও গোপনে জীবনস্বত্বসহ দানের দলিল করে নিতে পারেন এবং সেটি গোপন করে রাখতে পারেন। পরবর্তীতে তাঁদের মৃত্যুর পর দান দলিলটি প্রকাশ করা হতে পারে। আইনত দানটি বৈধ হওয়ায়, দানকারী আদৌ বিষয়টি বুঝে দান করেছিলেন কি না কিংবা undue influence-এর মাধ্যমে দানটি সম্পাদিত হয়েছিল কি না—তা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। আনুষ্ঠানিক দখল হস্তান্তরের বাধ্যবাধকতা থাকলে এ ধরনের গোপনে কাগুজে দলিল করে রাখার সুযোগ অনেকাংশেই থাকে না।

ঘ) উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করার আশঙ্কা

আগেই বলা হয়েছে, এই ধরনের দান অনেকটাই ওসিয়তের মতো, কারণ মূলত দানকারীর মৃত্যুর পর এর প্রকৃত ফল দৃশ্যমান হবে। মুসলিম ওসিয়তের ক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশের বেশি সম্পত্তি ওসিয়ত করা যায় না—এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো উত্তরাধিকারীদের সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত করার সুযোগ রোধ করা। কিন্তু প্রস্তাবিত দানের ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। ফলে উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পিতা-মাতা কিংবা দাদা-দাদির অনেকেই তাঁদের প্রকৃত উত্তরাধিকারীদের মধ্যে কাউকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে অন্য কোনো উত্তরাধিকারীর কাছে বিভিন্নভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর করে দেন। প্রচলিত পদ্ধতিতে দখল হস্তান্তর বাধ্যতামূলক হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা তা করতে পারেন না। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সেই সুযোগ অনেকটাই অবারিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঙ) মিথ্যা মামলার সুযোগ সৃষ্টি

পূর্বে আলোচিত প্রতারণামূলক হস্তান্তর বা অসৎ কার্যক্রমগুলো সংঘটিত না হলেও, প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে দানের মাধ্যমে সম্পত্তির প্রকৃত হস্তান্তরকে ব্যর্থ করার উদ্দেশ্যে উক্ত বিভিন্ন ধরনের অসত্য কারণ দেখিয়ে আদালতে মিথ্যা মামলা দায়েরের সুযোগ থাকায় মিথ্যা মামলা বাড়তে পারে।

সম্ভাব্য সমাধান:

  • হস্তান্তরের সময়ে সেই সময়ের সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীদের সম্মতির বিধান রাখা যেতে পারে। অথবা, এ ধরনের হস্তান্তরের ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদন বা অনুমতি বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।

  • উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিতকরণ রোধে হস্তান্তরের পরিমাণের একটি সীমারেখা নির্ধারণ করা যেতে পারে।

  • “The right to life-time enjoyment (usufruct right)”-এর একটি স্পষ্ট সংজ্ঞা প্রদান করে এমন বিধান করা যেতে পারে যে, সম্পত্তির দখল হস্তান্তর হবে; তবে সম্পত্তি থেকে প্রাপ্ত আয়ের কোনো অংশ বা সম্পত্তি ভোগের সুনির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি হস্তান্তরকারীর জন্য সংরক্ষণ করা যাবে।

২. হস্তান্তরগ্রহীতার পরবর্তী হস্তান্তরের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা

প্রস্তাবিত হস্তান্তর পদ্ধতিতে জীবনস্বত্ব হস্তান্তরকারীর কাছে থাকলেও সম্পত্তির অন্যান্য যাবতীয় স্বত্ব হস্তান্তরগ্রহীতার বরাবর অর্পিত হচ্ছে। হস্তান্তরগ্রহীতা মৃত্যুবরণ করলে তাঁর উত্তরাধিকারীদের বরাবর একই ধরনের স্বত্ব অর্পিত হওয়ার বিষয়টি আইনে স্পষ্ট আছে।

কিন্তু উক্ত হস্তান্তরগ্রহীতা যদি হস্তান্তরকারীর জীবদ্দশায় সম্পত্তিটি বিক্রি বা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করেন, তাহলে তার ফল কী হবে—সে বিষয়টি স্পষ্ট নয়। হস্তান্তরগ্রহীতা হস্তান্তরকারীর জীবদ্দশায় সম্পত্তিটি হস্তান্তর করতে পারবেন কি না, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে, তৃতীয় পক্ষীয় হস্তান্তরগ্রহীতার স্বত্বের প্রকৃতি এবং এ ধরনের পরবর্তী হস্তান্তরের আইনগত ফলাফল সম্পর্কেও সুস্পষ্ট বিধান রাখা প্রয়োজন।

৩. নামজারি ও দখলসংক্রান্ত জটিলতা

খাজনা প্রদান, খতিয়ানে নামভুক্তি ও নামজারির ক্ষেত্রে দখল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রস্তাবিত হস্তান্তর পদ্ধতিতে ভোগদখল হস্তান্তরকারীর কাছেই থাকবে বলে মনে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে উক্ত বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কী ধরনের অসুবিধা সৃষ্টি হতে পারে, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন এবং প্রয়োজনে অস্পষ্টতা দূর করতে হবে। Physical Possession হস্তান্তরগ্রহীতার না থাকলেও তার নামেই রেকর্ড ও নামজারি হওয়ার সুযোগ থাকা উচিত এবং তারই খাজনা প্রদানের বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত।

বিশেষত, এ ধরনের হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নামজারির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হলে ভালো হয়। তাহলে পূর্বে এই ধরনের হস্তান্তর করে গোপন রেখে নিজ দখল দেখিয়ে পরবর্তী হস্তান্তর অথবা ব্যাংক ঋণ গ্রহণের মতো প্রতারণামূলক কার্যক্রম কমানো সম্ভব হতে পারে।

৪. স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে হস্তান্তর এবং সম্পর্কের বিচ্ছেদের পরিণতি

প্রস্তাবিত হস্তান্তর পদ্ধতিতে স্বামী-স্ত্রীও পরস্পরের মধ্যে এইভাবে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারবেন। সন্তান, নাতি-নাতনির সঙ্গে সম্পর্ক রক্তের এবং স্থায়ী প্রকৃতির সম্পর্ক হলেও দাম্পত্য সম্পর্ক অস্থায়ী প্রকৃতির বলে বিবেচিত হয়। সে ক্ষেত্রে বিবাহবিচ্ছেদের পর এ ধরনের হস্তান্তর নিয়ে বিভিন্ন জটিলতা ও মামলার উদ্ভব হতে পারে।

এই ধরনের হস্তান্তর পদ্ধতি যেহেতু নিকট সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়েই আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, সেহেতু ওই সম্পর্কের বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে হস্তান্তরের পরিণতি কী হবে, সে বিষয়েও স্পষ্ট বিধান থাকা উচিত বলে মনে করি।

আইনের বিধানগুলো সৎ উদ্দেশ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও বাস্তবতা হলো—খারাপ মানুষেরা প্রায়ই আইনের ফাঁকফোকর খুঁজে তা অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেন। তাই, শুধু আইনের উদ্দেশ্য বিবেচনা করলেই হবে না; এর মাঠপর্যায়ের প্রয়োগ ও সম্ভাব্য অপব্যবহারের দিকটিও বিবেচনায় নিতে হবে।

৫. দাতার জীবনের নিরাপত্তা ও ঝুঁকি হ্রাস

ছেলে-মেয়ে বা পোষ্যকে সহায়-সম্পত্তি দান করার পর দাতাকে দেখাশোনা করা হয় না, অবহেলা করা হয়, পর্যাপ্ত ভরণপোষণ দেওয়া হয় না—মূলত এটিকে প্রতিরোধ করার জন্যই এই সংশোধনীটি আনয়ন করা হয়েছে।

এখন প্রশ্ন হলো, যে ছেলে-মেয়ে বা পোষ্য সম্পত্তি লিখে নেওয়ার পরে সম্পত্তি দাতার কোনো কেয়ার নেয় না, এমন ক্ষেত্রে জীবনস্বত্ব দানের ক্ষেত্রে তারা সম্পত্তি দাতার পার্থিব জীবন সংক্ষিপ্ত করার নানাবিধ প্রয়াস নেবে না—তার গ্যারান্টি কতটুকু? এ ক্ষেত্রে সম্পত্তি দাতার জীবনের ঝুঁকি বেড়ে গেল কি না, সেটিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তাই, দানগ্রহীতার দ্বারা দাতার প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটলে দান বাতিল হয়ে যাবে মর্মে সুনির্দিষ্ট বিধান থাকা উচিত।

উপসংহার

প্রস্তাবিত সংশোধনীর মূল উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে, বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগের ক্ষেত্রে যাতে নতুন ধরনের প্রতারণা, জালিয়াতি, উত্তরাধিকারবঞ্চনা এবং মামলা-মোকদ্দমার সুযোগ সৃষ্টি না হয়, সে জন্য আইনের সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। প্রয়োজনবোধে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হলে প্রস্তাবিত আইনের উদ্দেশ্য যেমন সফল হবে, তেমনি এর অপব্যবহারের সম্ভাবনাও অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।

লেখক: মতিউর রহমান, সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, পাবনা।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *