দেশের প্রথম ‘ক্যাশলেস কারাগার’ চালু মুন্সিগঞ্জে
কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | বাংলাদেশে আধুনিক ও যুগোপযোগী কারা প্রশাসন গড়ে তোলার লক্ষ্যে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সূচনা হলো। কারাগারের অভ্যন্তরীণ লেনদেনে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এবং অনিয়ম রুখতে দেশে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে ‘ক্যাশলেস কারা ব্যবস্থাপনা’। এই যুগান্তকারী ডিজিটাল পদক্ষেপের অংশ হিসেবে দেশের প্রথম সম্পূর্ণ নগদ টাকাহীন বা ক্যাশলেস কারাগার হিসেবে গৌরবময় যাত্রা শুরু করেছে মুন্সিগঞ্জ জেলা কারাগার।
আজ রোববার (২১ জুন) কারা অধিদপ্তর থেকে গণমাধ্যমে প্রেরিত এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক প্রযুক্তিগত সংস্কারের তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ‘নিরাপদ লেনদেন, স্বচ্ছ হিসাব, আধুনিক সেবা’—এই মূল স্লোগানকে সামনে রেখে এখন থেকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে মুন্সিগঞ্জ জেলা কারাগার। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, এই আধুনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্দিদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সার্বক্ষণিক অবস্থান শনাক্তকরণ এবং আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়েছে।
আরএফআইডি প্রযুক্তির ব্যবহার ও আর কোনো নগদ লেনদেন নয়
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, আধুনিক ও সুরক্ষিত এই ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (RFID) প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ও নিখুঁত ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে কারাগারের বিশাল সীমানার ভেতর বন্দিদের অবস্থান যেকোনো মুহূর্তে সহজেই শনাক্ত করা যাবে। একই সাথে আরএফআইডি প্রযুক্তির কল্যাণে বন্দি ওয়ার্ডগুলোতে প্রতিদিন ডিজিটাল পদ্ধতিতে বন্দিদের নির্ভুল গণনা (লক-আপ কাউন্টিং) এবং কারাগারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিখুঁতভাবে তদারকি করা সম্ভব হবে।
নতুন এই ক্যাশলেস নিয়মের ফলে কারাগারের ভেতরে বন্দি কিংবা দায়িত্বরত কর্মীদের মাঝে কোনো ধরনের নগদ টাকার (ক্যাশ) আদান-প্রদান বা লেনদেনের সুযোগ থাকবে না। বন্দিদের আত্মীয়-স্বজনরা কারাগারে এসে তাদের জন্য যে অর্থ প্রদান করবেন, তা সরাসরি ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট বন্দির নির্দিষ্ট ডিজিটাল ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে (হিসাব) জমা হয়ে যাবে।
এরপর বন্দিরা তাদের অনুকূলে থাকা বিশেষ আরএফআইডি (RFID) কার্ডের মাধ্যমে কারা ক্যান্টিন থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বা খাদ্যসামগ্রী স্পর্শহীনভাবে কেনাকাটা করতে পারবেন। এর ফলে কারাগারের ভেতর নগদ টাকা কেন্দ্রিক তদবির, অবৈধ লেনদেন বা চাঁদাবাজির চিরতরে অবসান ঘটবে বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ।
ডিজিটাল আর্থিক লেনদেনের ৬টি সুনির্দিষ্ট ধাপ
কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এই সম্পূর্ণ নিরাপদ ও ক্যাশলেস লেনদেন ব্যবস্থাটি মোট ৬টি সুনির্দিষ্ট ধাপে সম্পন্ন হবে:
১. টাকা নিয়ে আগমন: বন্দির আত্মীয় বা স্বজনরা বন্দির খরচের জন্য টাকা নিয়ে প্রথমে কারাগারে আসবেন।
২. টাকা গ্রহণ ও হিসাবভুক্তকরণ: দায়িত্বরত কারারক্ষী বা কর্মকর্তা স্বজনদের কাছ থেকে নগদ টাকা গ্রহণ করে সঙ্গে সঙ্গে তা সংশ্লিষ্ট বন্দির নামে ডিজিটাল সফটওয়্যারে হিসাবভুক্ত করবেন।
৩. ব্যাংকে জমা: স্বজনদের কাছ থেকে সংগৃহীত এই সমস্ত নগদ টাকা প্রতিদিনের শেষে সঙ্গে সঙ্গেই সরকারি অফিশিয়াল ব্যাংকে জমা করে দেওয়া হবে।
৪. অ্যাকাউন্ট ক্রেডিট: ব্যাংকে টাকা স্থানান্তরের সাথে সাথে সেই সমপরিমাণ টাকাটি বন্দির ব্যক্তিগত অনলাইন অ্যাকাউন্টে জমা (ক্রেডিট) হয়ে যাবে।
৫. খরচ ও সেবা বাবদ পেমেন্ট: কারাগারের ভেতরে বন্দি ক্যান্টিন থেকে খাদ্য ক্রয়সহ যেকোনো সেবা বা খরচ বাবদ সব প্রকার লেনদেন বন্দির সেই অনলাইন অ্যাকাউন্ট ও আরএফআইডি কার্ড স্পর্শ করে কেটে নেওয়া হবে।
৬. জামিনে মুক্তির পর অবশিষ্ট টাকা উত্তোলন: বন্দি ব্যক্তি আদালত থেকে জামিনে বা খালাস পেয়ে মুক্ত হওয়ার পর তার অ্যাকাউন্টে অবশিষ্ট থাকা টাকা মোবাইল ব্যাংকিং (বিকাশ/রকেট/নগদ), অনলাইন ব্যাংকিং বা অনুমোদিত এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উত্তোলন করে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারবেন।
আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, দেশের কারাগারগুলো নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা বন্দি নির্যাতন ও সিট-ক্যান্টিন বাণিজ্যের যে অভিযোগ ছিল, তা এই ক্যাশলেস ও আরএফআইডি কার্ড সিস্টেম চালুর মাধ্যমে শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। মুন্সিগঞ্জ জেলা কারাগারের এই মডেল ক্রমান্বয়ে দেশের বাকি ৬৩টি জেলা কারাগারেও দ্রুত চালুর দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
Source link
tags]
Leave a Reply