হাইকোর্টে মামলার নথি প্রেরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রিট


কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে মামলার নথি (Case Records) যথাসময়ে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে উপস্থাপন নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, গাফিলতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। ফাইল আদান-প্রদানে গতি আনতে সুনির্দিষ্ট সেকশন কর্মীদের ‘স্পীড মানি’ বা ঘুষ দাবির অনৈতিক সংস্কৃতি বন্ধ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে এই আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

আজ মঙ্গলবার (১৬ জুন) সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী এডভোকেট ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় জনস্বার্থে এই রিট পিটিশনটি দায়ের করেন।

রিটে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে পক্ষ (Respondent) করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে এই রিটটি শুনানির জন্য হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হবে।

এর আগে একই বিষয়ে গত ২৪ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে রেজিস্ট্রার জেনারেল বরাবর লিখিত আবেদন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় গত ০৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে রেজিস্টার্ড এডি (Registered A/D) ডাকযোগে একটি লিগ্যাল নোটিশ (Notice Demanding Justice) পাঠানো হয়। সেই নোটিশেও সংশ্লিষ্টদের নিষ্ক্রিয়তা ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে ব্যর্থতা চ্যালেঞ্জ করেই আজ এই রিটটি দায়ের করা হলো।

‘স্পীড মানি’ বা অবৈধ অর্থ ছাড়া ফাইল এগোয় না

উচ্চ আদালতে রিট দায়েরের পর এই প্রাতিষ্ঠানিক সংকট ও বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির বিষয়ে আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, ‘একটি মামলার কার্যকর শুনানি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি নির্ধারিত সময়ে আদালতে উপস্থিত থাকার উপর। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুনানির দিন ফাইল আদালতে পৌঁছায় না, মামলার নথি অনুপস্থিত থাকায় মাননীয় বিচারপতিগণ শুনানি নিতে পারেন না। ফলে মামলাগুলো বারবার মুলতবি (adjournment) হচ্ছে। এই পরিস্থিতি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।’

তিনি তাঁর সুনির্দিষ্ট অভিযোগে আরও বলেন:

এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা – কিছু বেঞ্চ অফিসার ও সেকশন স্টাফ “স্পিড মানি” দাবি করে। ফাইল দ্রুত পাঠাতে হলে অনানুষ্ঠানিক অর্থ প্রদান করতে হয়। এতে একটি অস্বচ্ছ ও অনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। যা সরাসরি বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

রিটকারী আইনজীবী উল্লেখ করেন যে, ফাইল প্রেরণে অযৌক্তিক বিলম্ব করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ফাইল “গায়েব” বা “খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না” বলা হয়। ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা তদবির ছাড়া ফাইল এগোয় না, এমনকি অবৈধ অর্থ লেনদেন ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে ফাইল বেঞ্চে পাঠানো হয় না।

সুপ্রিম কোর্ট রুলসের লঙ্ঘন ও আইনি বাধ্যবাধকতা

রিট আবেদনে সুপ্রিম কোর্টের নিজস্ব রুলস এবং শৃঙ্খলা বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে:

  • সুপ্রীম কোর্ট (হাইকোর্ট বিভাগ) রুলস, ১৯৭৩ (Chapter-IVA, Rule-08): এই বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ অফিসারকে প্রতিদিন বিকাল ৩টার মধ্যে রিকুইজিশনে স্বাক্ষর করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট শাখা বা সেকশনকে পরদিন সকাল ৯:৩০টার মধ্যে মামলার নথি সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে পাঠাতে হবে।

  • সুপ্রীম কোর্ট রুলস, ১৯৬৬ (Rule-06 ও Rule-07): আদালতের অনুমতি ছাড়া কোনো নথি আদালতের হেফাজত থেকে বাইরে নেওয়া যাবে না এবং নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় রিকুইজিশনের ভিত্তিতেই কেবল নথি প্রেরণ করা যাবে।

  • Employees (Discipline & Appeal) Rules, 1983: এই বিধি অনুযায়ী দায়িত্ব অবহেলা, অসদাচরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অমান্য করা শাস্তিযোগ্য গুরুতর অপরাধ।

বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের ভোগান্তি এবং সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন

রিটে উল্লেখ করা হয়েছে, ফাইল সময়মতো আদালতে না পৌঁছানো উচ্চ আদালতে মামলার জট বৃদ্ধির একটি প্রধান কারণ। এর ফলে একটি মামলা মাসের পর মাস কজ লিস্টে (Cause List) থেকে গেলেও মূল শুনানি শুরুই করা যাচ্ছে না। বিজ্ঞ আইনজীবীদের ক্ষেত্রে তাদের মূল কাজ (আইন গবেষণা, ড্রাফটিং, যুক্তি উপস্থাপন) ব্যাহত হচ্ছে এবং ফাইল আনা-নেওয়ার কাজে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়ে পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। অন্যদিকে, বিচারপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে দেখা যায় বারবার আদালতে এসে ফিরে যেতে হচ্ছে; যার ফলে তাদের সময়, অর্থ এবং মানসিক শক্তির অপচয় হচ্ছে এবং ন্যায়বিচারের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে।

সংবিধানের দুই প্রধান অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন টেনে আইনজীবী ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২ অনুযায়ী জীবনের অধিকার মানে শুধু বেঁচে থাকা নয়, বরং ন্যায়বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তাও এর অন্তর্ভুক্ত এবং অনুচ্ছেদ ৩৫(৩) অনুযায়ী প্রত্যেক ব্যক্তির দ্রুত ও উন্মুক্ত বিচারের অধিকার রয়েছে। ফাইল না থাকায় শুনানি না হওয়া এই মৌলিক অধিকারকে সরাসরি ব্যাহত করছে।’

দায়েরকৃত এই রিটে আদালতের পূর্বের সকল সার্কুলার ও অফিস আদেশ কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, ফাইল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং সুনির্দিষ্টভাবে ঘুষ ও অনিয়ম বন্ধে কার্যকর নজরদারি চালুর আবেদন জানানো হয়েছে।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *