তিন মাস আগেই দেশ ছাড়েন বিচারপতি শাহেদ নূর উদ্দিন, নিয়েছেন কানাডার নাগরিকত্ব!


হাইকোর্টের বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিনের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগের অনুসন্ধান চলছিল সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে। অনুসন্ধান পর্যায়েই লাল পাসপোর্ট সারেন্ডার করে তিন মাস আগেই কানাডায় পাড়ি জমান তিনি।

সেখান থেকেই চলতি সপ্তাহে রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান উচ্চ আদালতের এই বিচারক। পদত্যাগপত্রটি আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়েছে। ২০২৭ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি তার অবসরে যাওয়ার দিন ছিল। এর আগেই তিনি পদত্যাগ করলেন।

এদিকে অসদাচরণের অভিযোগ অনুসন্ধান পর্যায়ে থাকা হাইকোর্টে আরো দুই অতিরিক্ত বিচারপতিকে স্থায়ী বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেয়নি সরকার। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ২০২২ সালে মোট ১১ জনকে হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ দেয়।

এদের মধ্যে ৯ জন গত ৩০ জুলাই স্থায়ী বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান। কিন্তু অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলাম ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলনকে স্থায়ী না করে তখন আরো ছয় মাসের জন্য অতিরিক্ত বিচারপতি পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হয়।

অনুসন্ধান পর্যায়ে ছুটিতে থাকায় এই দুই বিচারপতিও আর বেঞ্চে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাননি। গতকাল ছয় মাস শেষ হওয়ার আগেই স্থায়ী বিচারক হিসেবে নিয়োগ না দেওয়ায় তাদের বিচার আসনে ফেরার সুযোগ আর থাকল না।

এদিকে বেঞ্চ না দিয়ে বিচারকাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় ১২ বিচারপতিকে। যাদের মধ্যে বিচারপতি মো. আতাউর রহমান খান নভেম্বরে এবং বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাস গত বুধবার (২৯ জানুয়ারি) অবসরে যান। স্থায়ী না হওয়ায় বিচার আসন থেকে বিদায় নেন বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলাম ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলন। পদত্যাগ করলেন বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিন।

পাঁচ বিচারপতি বিদায় নেওয়ায় এখন অসদাচরণের অভিযোগে অনুসন্ধান ও তদন্তে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের অধীনে সাত বিচারপতি। এর মধ্যে কয়েক জন বিচারপতির বিরুদ্ধে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করছে কাউন্সিল।

প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের কাউন্সিল এই তদন্ত পরিচালনা করছেন। কাউন্সিলের অপর দুই সদস্য হলেন আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ দুই বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী।

নভেম্বরে দেশ ছাড়েন বিচারপতি নূরউদ্দিন

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দাবির মুখে অসদাচরণের অভিযোগে বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিনকেও ছুটিতে পাঠানো হয় গত ১৬ অক্টোবর। ছুটিতে গিয়ে তিনি সুপ্রিম কোর্ট রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরকে অবহিত করে লাল পাসপোর্ট সারেন্ডার করেন।

এরপর তার করা আবেদনের ভিত্তিতে দেওয়া হয় সবুজ পাসপোর্ট। সেই পাসপোর্ট নিয়েই ৯ নভেম্বর কানাডার উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করেন ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় রায়দানকারী এই বিচারক।

সূত্র জানিয়েছে, কানাডা থেকে ছুটি বাড়ানোর জন্য প্রধান বিচারপতি বরাবর আবেদন করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই আবেদন মঞ্জুর না হওয়ায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরপরই প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবর পদত্যাগপত্র পাঠান।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল কর্তৃক অনুসন্ধান পরিচালনাধীন বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিন প্রধান বিচারপতির মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির নিকট স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র প্রেরণ করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিইচ্ছুক বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিনের দুইজন ঘনিষ্ট ব্যক্তি গণমাধ্যমকে বলেন, বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিনের দুই সন্তান কানাডার নাগরিক। তিনি কানাডায় যাওয়া আসা করতেন। কয়েক মাস আগে তিনি লাল পাসপোর্ট সারেন্ডার করে সাধারণ পাসপোর্ট গ্রহণ করেন।

তারা জানান, গত বছরের ১৬ অক্টোবর ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে কাজ করার অভিযোগে তাকে ছুটিতে পাঠানো হয় ও বিচারকাজ থেকে বিরত রাখা হয়। এর কয়েকদিন পর তিনি কানাডা পাড়ি জমান। ৩ মাস আগে তিনি কানাডার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। সেখানই স্থায়ীভাবে বসবাস করবেন বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিন।

আরও পড়ুনবিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিনের পদত্যাগ

সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা জেনেছি বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিন কানাডার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেছেন। কানাডা থেকে তিনি পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, গত ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। ছাত্র-জনতার দাবির মুখে সাবেক প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতি পদত্যাগে বাধ্য হন। গত ১৫ অক্টোবর রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সারজিস আলম নিজ ফেসবুক পেজে পোস্ট দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট ঘেরাও কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেন।

পোস্টে তারা বলেন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগী দুর্নীতি ও দলবাজ বিচারপতিদের অপসারণে হাইকোর্ট অভিমুখে পদযাত্রা করা হবে। ঘোষণা অনুযায়ী পরদিন শিক্ষার্থীরা সুপ্রিম কোর্ট ঘেরাও করেন। তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের ১২ বিচারপতি ছুটিতে যান।

গত ২০ অক্টোবর দেশের সর্বোচ্চ আদালত বিচারপতি অপসারণ সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর বিধান বাতিলের রায় বহাল রাখে আপিল বিভাগ। ফলে সংবিধানে পুনর্বহাল হয় সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের বিধান।

এই কাউন্সিল উচ্চ আদালতের বেশ কয়েক জন বিচারপতির আচরণ সংক্রান্ত অভিযোগ অনুসন্ধান করে রাষ্ট্রপতির কাছে তথ্য পাঠান। গত ১৯ নভেম্বর হাইকোর্টের তিন বিচারপতি পদত্যাগ করেন। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অসদাচরণের অভিযোগ সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলে প্রমাণিত হয়।



Source link

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *