কী পরিবর্তন আসছে নতুন আইনে?
হাইলাইটস:
✔️ লোকসভায় পাশ – বিরোধীদের আপত্তি উপেক্ষা করে নতুন ওয়াকফ বিল গৃহীত
✔️ ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা – কমানো হচ্ছে বোর্ডের স্বায়ত্তশাসন, বাড়ছে সরকারের নিয়ন্ত্রণ
✔️ অমুসলিম সদস্য অন্তর্ভুক্তি – ওয়াকফ বোর্ডে সর্বোচ্চ ৪ জন অমুসলিম সদস্য থাকতে পারবেন
✔️ রাজস্ব আয় বৃদ্ধি – ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পরিকল্পনা
✔️ নারীদের সম্পত্তির অধিকার – ওয়াকফ ঘোষণার আগে বিধবা ও অনাথদের উত্তরাধিকার নিশ্চিতকরণ
ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল ২০২৫: গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ভারতে মুসলিম ও বিরোধী রাজনীতিকদের প্রবল আপত্তির মুখে লোকসভায় পাশ হয়েছে বিতর্কিত ওয়াকফ বিল। গত বুধবার (২ এপ্রিল) গভীর রাতেই বিলটি লোকসভায় পাশ হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংসদের উচ্চকক্ষেও তা পাশ হয়ে যাওয়ায় বিলটির আইনে পরিণত হওয়া শুধু এখন সময়ের অপেক্ষা। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু সই করলেই বদলে যাবে ৭০ বছরের পুরনো আইন।
১৯৫৪ সালের আইনকে সংশোধন করে ১৯৯৫ সালে ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা অনেকটাই বাড়িয়েছিল ভারত সরকার। কিন্তু ৩০ বছর পরে যে সংশোধনে সিলমোহর দিল ভারতীয় সংসদ, তাতে বোর্ডের ক্ষমতা এবং কার্যকারিতার হস্তক্ষেপে বদলে যেতে চলেছে সেই আইন।
ভারতের বিরোধী দলেরই দাবি, ওয়াকফ আইনের এই সংশোধন ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতাকে বেনজির ভাবে খর্ব করে দিচ্ছে।
সমস্ত বিতর্ক এবং সংশোধনী নিয়ে ভোটাভুটি শেষে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ২টা ১৯ মিনিটে ‘ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল, ২০২৫’ পাশ করানোর প্রস্তাব পেশ করেন সংসদীয় বিষয়ক এবং সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। ধ্বনিভোটের ফলাফলে বিরোধী শিবির সন্তুষ্ট হয়নি। তারা বিভাজন (ডিভিশন) চান।
ভোটাভুটি শেষে রাত ২টা ৩৪ মিনিটে ফল ঘোষিত হয়। তাতে দেখা যায় বিলের পক্ষে পড়েছে ১২৮টি ভোট। আর বিপক্ষে পড়েছে ৯৫টি ভোট। ৩৩ ভোটের ব্যবধানে ওয়াকফ বিল রাজ্যসভায় পাশ হয়ে যায়। বিতর্ক চলে ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে।
বিরোধীদের আপত্তি:
ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ, নতুন ওয়াকফ আইন ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা খর্ব করবে এবং সংখ্যালঘু মুসলিমদের স্বার্থের পরিপন্থী হবে। তবে, সরকার বলছে, ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে আয় বাড়াতে এবং দুর্নীতি রোধ করতেই এই সংস্কার।
বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা নাগাদ রাজ্যসভায় ওয়াকফ বিল নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। সংসদীয় বিষয়ক এবং সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর ভাষণের মাধ্যমেই আলোচনা তথা বিতর্কের সূত্রপাত।
রিজিজুর দাবি, ওয়াকফ সম্পত্তির অন্যতম লক্ষ্য হল সেই সম্পত্তির মাধ্যমে মুসলিম সমাজের গরিব, মহিলা ও অনাথ শিশুদের উন্নয়ন। নতুন আইনে বিপুল রাজস্ব আদায় হবে বলেও রিজিজু সংসদে দাবি করেন। তার অভিযোগ, রাজস্ব সংগ্রহ করতে ‘ব্যর্থ’ হয়েছে ওয়াকফ বোর্ড।
২০০৬ সালে সাচার কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৫ লাখ ওয়াকফ সম্পত্তি ছিল। এখান থেকে আয় হওয়া উচিত ছিল ১২ হাজার কোটি টাকা। হয়েছে মাত্র ১৬৩ কোটি টাকা। ২০১৩ সালে ইউপিএ সরকার ওয়াকফ আইনে কিছু পরিবর্তন আনে। কিন্তু তাতেও সে সময়ে ৮ লাখ ৭২ হাজার ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে আয় ছিল মাত্র ১৬৬ কোটি টাকা।
কার্য উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে স্থির হয়েছিল, রাজ্যসভায় এই বিলের ওপরে ৮ ঘণ্টা আলোচনা চলবে। সেই সময়সীমা অনুসারে রাত ৯টায় আলোচনা শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সরকার ও বিরোধী পক্ষের অনেক সাংসদই এই আলোচনায় অংশ নেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায় সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়। রাত ১টা ১১ মিনিট পর্যন্ত চলে আলোচনা।
নতুন আইনে পরিবর্তন কী?
1️⃣ ওয়াকফ বোর্ডের কাঠামোতে পরিবর্তন – বিধিবদ্ধ সংস্থা হিসেবে সব ধর্মের প্রতিনিধিত্ব রাখা হচ্ছে।
2️⃣ অডিট ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কঠোর – ১ লাখ টাকার বেশি আয় হলে রাজ্যের অডিটরদের মাধ্যমে অডিট বাধ্যতামূলক।
3️⃣ সরকারি সম্পত্তি ওয়াকফ দাবি করলে তদন্তের সুযোগ – কালেক্টর বা তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তদন্ত করতে পারবেন।
4️⃣ মহিলাদের অধিকার সংরক্ষণ – ওয়াকফ ঘোষণার আগে বিধবা, বিবাহবিচ্ছিন্না ও অনাথ মহিলাদের সম্পত্তি প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
5️⃣ রাজস্ব সংগ্রহের জোরদার ব্যবস্থা – ৮ লাখের বেশি ওয়াকফ সম্পত্তির আয় কম হওয়ায় নতুন আইনে সরকারি তদারকি বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর দাবি:
সাবেক প্রধানমন্ত্রী এইচডি দেবেগৌড়াও বৃহস্পতিবার ওয়াকফ বিল-বিতর্কে অংশ নেন। নবতিপর দেবেগৌড়াকে দীর্ঘ দিন পরে সংসদে ভাষণ দিতে দেখা যায়। শারীরিক পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে তার আসনে বসেই ভাষণ দেওয়ার অনুমতি দেন চেয়ারম্যান জগদীপ ধনখড়।
দেবেগৌড়া ওয়াকফ বিলকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, এই বিল গরিব মুসলিমদের রক্ষা করবে তাদেরই ধনী অংশের হাত থেকে। ন্যায়ের স্বার্থে এই নতুন বিল আমাদের সংবিধানের বুনিয়াদি নীতিগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তিনি আরও বলেন, ‘এ কথা মনে রাখতে হবে যে, নতুন ওয়াকফ বিল মুসলিমদের ধর্মাচরণে কোনো ভাবেই হস্তক্ষেপ করছে না। দেশে যে বিপুল পরিমাণ ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে, তার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যেই এই বিল আনা হয়েছে বলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী মন্তব্য করেন।
রাত ১২টা ৫৫ নাগাদ সংসদীয় বিষয়ক এবং সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী গোটা বিতর্কের ওপরে জবাবি ভাষণ দেওয়া শুরু করেন। যদিও সে ভাষণের শুরুতেই রিজিজু বলে দেন, তিনি খুব বিশদে উত্তর দেবেন না। কারণ ওয়াকফ বিল নিয়ে ভোটাভুটির পরে অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও রাজ্যসভায় উঠবে। ১৬ মিনিটের ভাষণের শেষে রিজিজু সিএএ পাশ হওয়ার আগের এবং পরের পরিস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেন।
তিনি বলেন, ‘কেউ কেউ বলছেন, আমরা এই বিলের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের ভয় দেখাচ্ছি। কিন্তু ভয় আমরা দেখাচ্ছি না। ভয় আপনারা দেখাচ্ছেন। সিএএর সময়েও অনেকে ভয় দেখিয়েছিলেন।
বলেছিলেন, সিএএ পাশ হলেই অনেকের নাগরিকত্ব চলে যাবে। কিন্তু সিএএ পাশ হওয়ার পরে তেমন কিছু হয়নি। ওয়াকফ বিলের ক্ষেত্রেও আগে থেকে অনেকে ভয় দেখানোর কাজ করছেন। কিন্তু বিল পাশ হওয়ার পর দেখবেন, আগামী কাল থেকেই একে কী ভাবে স্বাগত জানানো হয়।’
সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন,
এই আইন মুসলিমদের ধর্মাচরণে হস্তক্ষেপ করছে না, বরং গরিব মুসলিমদের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।
বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া:
নতুন আইনে কেন ওয়াকফ বোর্ডে অমুসলিম সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে, এই প্রশ্ন বিরোধী শিবির থেকে অনেকেই তুলেছিলেন। সে প্রশ্নের জবাবে রিজিজু বলেন, ‘ওয়াকফ বোর্ড একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা। একটি বিধিবদ্ধ সংস্থায় শুধু মুসলিমরা থাকবেন, আর কেউ থাকতে পারবেন না, এটা কী ভাবে হবে?’
রিজিজুর কথায়, ‘বিধিবদ্ধ সংস্থাকে ধর্মনিরপেক্ষ হতে হবে এবং সব ধর্মের প্রতিনিধিত্ব সেখানে থাকা উচিত।’
তবে রিজিজু এ-ও জানান যে, ২২ সদস্যের বোর্ডে সর্বোচ্চ চারজন অমুসলিম সদস্য থাকতে পারবেন। ফলে বিল পাশ হয়ে তা আইনে পরিণত হলেও ওয়াকফ বোর্ডে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠই থাকবেন।
বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএর চেয়ে ‘ইন্ডিয়া’ সংখ্যায় বেশ পিছিয়ে থাকলেও ‘জাদুসংখ্যা’ এনডিএর হাতেও নেই। তাই লোকসভায় যতটা মসৃণ ভাবে বিলটি পাশ হয়েছিল, রাজ্যসভাতেও ততটা সহজে হবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় ছিল।
তবে ছয়জন মনোনীত সাংসদ এবং দুজন নির্দল সাংসদের ভোট বিজেপি তথা এনডিএর দিকে যেতে পারে বলে আগেই আভাস পাওয়া গেছে। তাই রাজ্যসভায় ১২৫টির মতো ভোট বিলের পক্ষে পড়ার সম্ভাবনাও আঁচ করা যায়। শেষ পর্যন্ত সরকারের পক্ষে ভোট বেড়ে দাঁড়াল ১২৮।
বিরোধীরা বলছেন,
নতুন আইন ওয়াকফ বোর্ডের স্বাধীনতা নষ্ট করছে এবং মুসলিম সমাজের উপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াচ্ছে।
পরবর্তী ধাপ
রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পর ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল ২০২৫ আইনে পরিণত হবে এবং ভারতের ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসবে।
Leave a Reply