হাইকোর্টে মৃত্যুদণ্ড বহাল, পরে জানা গেল আসামি পাঁচ বছর আগেই মারা গেছেন


কোর্ট রিপোর্টার, ঢাকা | শেরপুরে ২০১৩ সালে এক শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামির ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর দীর্ঘ শুনানি শেষে গতকাল বুধবার (১ জুলাই) ফাঁসির দণ্ড বহাল রেখে রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। তবে রায় ঘোষণার পর জানা গেছে, মামলার একমাত্র আসামি কান্তি মারাক পাঁচ বছর আগেই অর্থাৎ ২০২১ সালেই কাশিমপুর কারাগারে মারা গেছেন।

গতকাল বুধবার (১ জুলাই) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ দুই দিন শুনানি শেষে এ রায় দেয়।

রায়ের সময় আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির, ইমাম হোসাইন তারেক ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান মুকুল। আসামিপক্ষে শুনানিতে ছিলেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী হাফিজুর রহমান খান।

তবে রায় হওয়ার পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা ‘শুভাকাঙ্ক্ষীদের’ মাধ্যমে তথ্য পান, কান্তি মারাক নামে এ মামলার একমাত্র ওই আসামি ২০২১ সালেই কাশিমপুর কারাগারে মারা গেছেন। এ নিয়ে সে সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবরও প্রকাশ হয়েছিল।

আদালতের সময় ও শ্রমের অপচয়

যথাসময়ে মৃত্যুর খবর আদালতে পৌঁছালে আপিল ও ডেথ রেফারেন্স দুটোই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান মুকুল। আসামি মারা যাওয়ার পাঁচ বছর পরও বিষয়টি কারা কর্তৃপক্ষ থেকে আদালতকে না জানানোয় তা সবার অর্থ ও আদালতের সময়ের অপচয়ের বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মুকুল বলেন-

বিচারক দীর্ঘ সময় ধরে রায় দিয়েছেন। এই রায় এখন আবার লিখতে হবে, স্বাক্ষর করতে হবে, প্রকাশ হবে। যার পুরোটাই আসলে শ্রম ও রিসোর্সের অপচয়। এত খেটে আমরা মামলাটি রেডি করলাম, কনভিকশন হলো, আর এখন শুনছি পাঁচ বছর আগেই আসামি মারা গেছেন। কারও কাছেই কোনো তথ্য ছিল না। এমনকি এ সংক্রান্ত কোনো মেকানিজমও নেই।

আসামির মৃত্যুর পর আইনি প্রক্রিয়া ও কারা কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি আরও বলেন-

আসামি মূলত জেল আপিল করেছিলেন। যেহেতু তিনি মারা গেছেন, কারা কর্তৃপক্ষ অবশ্যই রেজিস্ট্রি মেনটেইন করে লাশ হস্তান্তর করেছে। তাদের উচিত ছিল সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়ে জানানো যে, জেল আপিল করা ওই আসামি মারা গেছেন। সেটি করা হলে সলিসিটর উইংস থেকে এ মামলায় নতুন করে কাউকে স্টেট ডিফেন্স হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হত না।

একই বিষয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির বলেন-

অন্তত জেলারদের উচিত ছিল আমাদের জানানো। আসামি ২০২১ সালে মারা গেছে, সলিসিটর উইং বা মন্ত্রণালয়তো অন্তত জানাবে। এই মামলায় জেল আপিল ছিল, রাষ্ট্রের নিয়োগ করা আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে হাফিজুর রহমান খান ছিলেন। অথচ তাকেও জানানো হয়নি যে, আসামি মারা গেছে।

শুনানি ও রায়ের প্রতীকী মূল্য নিয়ে তিনি বলেন-

এটি তো ফৌজদারি বিচারের বিষয়। ভুক্তভোগী বা তার পরিবারেরতো রায় পাওয়ার একটা আশা থাকে। আমরা অনেক সময় প্রতীকী কাজ করি। আসামি মারা গেলেও তাকে অপরাধের কলঙ্ক নিয়েই যেতে হল; এটি সেই সিম্বলিজমেরই অংশ।

এদিকে বিচার চলাকালীন আসামির মৃত্যু হলে মামলার আইনি অবস্থান সম্পর্কে রাষ্ট্র নিযুক্ত আসামিপক্ষের আইনজীবী হাফিজুর বলেন, আসামি মারা গেলে মামলা বাতিল হয়ে যায়। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে তথ্য ও জামিন সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে ডিজিটালাইজড করার মাধ্যমে সবার কাছে তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছে দেওয়ার পরামর্শ তাঁর।

কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

কারাগারে মারা যাওয়া আসামির তথ্য জানানোর বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষের নিয়ম ও দায়বদ্ধতার বিষয়ে কারা অধিদপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ বলেন-

সাধারণত কোনো বন্দি মারা গেলে সংশ্লিষ্ট আদালতকে চিঠির মাধ্যমে জানিয়ে দেই। সলিসিটর অফিসকে জেল কর্তৃপক্ষ এই জিনিসটা জানায় না। এটা জানানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, কারা অধিদপ্তর এবং যে বিচারিক আদালত দণ্ড দিয়েছেন তাকে।

২০২০১ সালে মারা যাওয়া কান্তি মারাকের মৃত্যুর বিষয়েও তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন মন্ত্রণালয়, দুই জেলা প্রশাসক ও বিচারিক আদালত অর্থাৎ শেরপুর আদালতের বিচারককে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে হাই কোর্টকে আসামির মৃত্যুর প্রতিবেদন পাঠানো হয়নি বলে স্বীকার করেন তিনি।

তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ের বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষের সুযোগ থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন-

কারা কর্তৃপক্ষ ইচ্ছা করলেই বিষয়টি হাই কোর্টকে তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারত। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিন্তু জানে না যে, কার মামলাটা হাই কোর্টে পেন্ডিং বা চলমান আছে। এমনকি অধিদপ্তরও কিন্তু জানবে না, কারণ অধিদপ্তরের কাছে তো ডেথ রেফারেন্সের কপি সংরক্ষণ থাকে না। এটা থাকে সংশ্লিষ্ট বন্দির কাছে, অর্থাৎ বন্দি যে কারাগারে থাকে সেখানে। কাজেই সংশ্লিষ্ট কারাগার কর্তৃপক্ষই সরাসরি এটা করতে পারত। এই মামলার ক্ষেত্রে সেটা কোনো কারণে দুঃখজনকভাবে করা হয়নি।

ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে ফরহাদ বলেন-

আদালত থেকে নিশ্চয়ই একটা সাজেশন (নির্দেশনা) দেবেন যে, এই ধরনের বিষয়গুলো যেন যথাসময়ে অবহিত করা হয়। যেহেতু আদালত আজ অবহিত হয়েছেন যে, এরকম রায় হয়েছে তাই এ সংক্রান্ত সাজেশন আসবেই। আদালতের নির্দেশনা বা সাজেশন যদি নাও আসে, তবুও ভবিষ্যতে এই ধরণের বিভ্রান্তি এড়াতে আমরা নিজস্ব উদ্যোগে একটি সার্কুলার দিয়ে দেব। ইতিমধ্যেই ঊর্ধ্বতন সব কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করেছি।

ডিজিটাল ব্যবস্থার চ্যালেঞ্জ নিয়ে তিনি বলেন-

সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কিছু সমস্যাও আছে। বিশেষ করে এসব ক্ষেত্রে এক্সেসটা সবারই হয়ে যাচ্ছে। এইখানে বন্দির তথ্য, জামিন, রায়, বিষয়গুলো প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এখানে নিরাপত্তার একটা ব্যাপার আছে। আমরা সাধারণত হাইকোর্টের কোনো জামিন আসলে রেফারেন্স নম্বরটা দিয়ে তাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে চেক করে নেই, বিষয়টি সঠিক হয়েছে কিনা। এই কাজগুলো চলছে। কিন্তু আদেশের কপিগুলো যদি আমাদের দপ্তরে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় দেওয়া যায় তাহলে কাজটা সহজ হয়। আদালতের তো আর এই সময় নাই যে, আমার কাগজটা সে খুঁজে বের করবে। এটা ম্যানুয়ালি হতে হবে অথবা আমাদেরকেই পাঠাইতে হবে, এরকম কাজ ছাড়া এটা আদালতের পক্ষে আপডেট হওয়া সম্ভব না।

মামলার প্রেক্ষাপট

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ৩০ মার্চ শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী থানার বাসিন্দা ওই শিশুকে ধর্ষণের পর হত্যা করে বলে অভিযোগ করা হয়। ওইদিন বিকাল থেকে নিখোঁজ ছিল মেয়েটি। খোঁজাখুঁজির এক পর্যায়ে প্রতিবেশীর কান্তি মারাকের ঘরের মেঝেতে রক্তের দাগ থাকা হাফ প্যান্ট পাওয়া যায়। পরে আসামির বসতবাড়ির পাশে পানি সেচের ড্রেন থেকে উদ্ধার করা হয় শিশুটির মৃতদেহ।

এ ঘটনায় নিহত শিশুর দাদা কান্তি মারাকের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ এনে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে নালিতাবাড়ী থানায় মামলা করেন। গ্রেপ্তারের পর কান্তি মারাক আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছিলেন।

এ মামলায় বিচারিক আদালতে বিচার শেষে ২০১৯ সালে কান্তির মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। তা অনুমোদনের জন্য ওই বছরেই ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাই কোর্টে আসে।

কিন্তু এর মধ্যেই ২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি কান্তি মারাকের মৃত্যু হয়েছে বলে কারা কর্তৃপক্ষকে নিশ্চিত করে কাশিমপুর কারাগার কর্তৃপক্ষ।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *