মানবাধিকার কমিশন আইন পাস হলে মানবাধিকার নয়, লঙ্ঘনকারীর সুরক্ষা হবে
প্রস্তাবিত ‘খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁদের মতে, খসড়াটি যেভাবে তৈরি করা হয়েছে, সেভাবেই কার্যকর হলে মানবাধিকার সুরক্ষার বদলে উল্টো মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের সুরক্ষা পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
গতকাল সোমবার (২৪ আগস্ট, ২০২৬) বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬: পর্যালোচনা ও সুপারিশ’ শীর্ষক এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)।
তদন্তে স্বাধীন ক্ষমতার জোর দাবি
মতবিনিময় সভায় বক্তারা বলেন, কোনো গুম বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের তদন্ত যদি সংশ্লিষ্ট অভিযুক্ত সংস্থা বা ব্যক্তিবর্গের প্রভাবেই পরিচালিত হয়, তবে সেখানে আলামত নষ্ট ও তদন্ত বাধাগ্রস্ত হওয়া অনিবার্য। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর না করে মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন ও নিরঙ্কুশভাবে সরাসরি তদন্তের এখতিয়ার দিতে হবে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “বাংলাদেশে যেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে বেশি অভিযোগ, প্রস্তাবিত আইনে তদন্তের বড় দায়ভার আবার তাদের ওপরই অর্পণ করা হচ্ছে। এভাবে আইন পাস হলে তা ভুক্তভোগীদের রক্ষায় ব্যর্থ হবে।” তিনি প্রস্তাবিত আইনটি দ্রুত কণ্ঠভোটে পাস না করে জাতীয় সংসদে বিস্তারিত পর্যালোচনার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটিতে পাঠানোর পরামর্শ দেন।
আইনের মৌলিক বৈষম্য দূর করার আহ্বান
ব্লাস্টের অবৈতনিক নির্বাহী পরিচালক ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, মানবাধিকার কমিশনকে কেবল গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যা নয়; বরং জীবন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও বৈষম্য নিরসনের মতো বিস্তৃত পরিসরে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, প্রস্তাবিত আইনে সাধারণ কোনো ব্যক্তি মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে কমিশন ব্যবস্থা নিতে পারলেও অভিযুক্ত ব্যক্তি রাষ্ট্রের কোনো কর্তৃপক্ষের অংশ হলে কমিশনের হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়েছে। এটি একটি মৌলিক বৈষম্য এবং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
স্বাধীন সদস্য নিয়োগ ও মোংলা ঘটনার প্রসঙ্গ
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী নূর খান বলেন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তের জন্য কমিশনের পূর্ণ স্বাধীনতা আবশ্যক। পূর্বানুমোদনের চক্করে পড়লে সত্য উদঘাটন অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
সম্প্রতি খুলনার মোংলায় কোস্টগার্ডের বিরুদ্ধে মিরাজ শেখ নামের এক যুবককে গুমের অভিযোগ তুলে নূর খান বলেন, পুলিশ ভয়ে সেখানে ঘটনাস্থল পরিদর্শন পর্যন্ত করেনি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ বিচার পাবে না। তিনি কমিশনে সৎ, সাহসী ও যোগ্য ব্যক্তিদের স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান।
সভায় আরও বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক সোহরাব হাসান, ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশনের ইনক্লুশন উপদেষ্টা ভাস্কর ভট্টাচার্য, লেখক ও গবেষক অনুপম দেবাশীষ রায়, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সতেজ চাকমা, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কাজী জাহেদ ইকবাল ও খান খালিদ আদনান এবং গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী নওশীন নূর।
Source link
tags]
Leave a Reply