ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত হলে পাসপোর্ট পাওয়া যাবে?


আশরাফুল করিম সাগর : ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তির পাসপোর্ট পাওয়া বা না পাওয়ার বিষয়টি প্রধানত “বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩” (The Bangladesh Passport Order, 1973) এবং উচ্চ আদালতের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। প্রচলিত আইন এবং বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে এর ব্যাখ্যা আলোচনা করা হলো:

১. বাংলাদেশ পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ী বিধান

এই আদেশের অনুচ্ছেদ ৬-এ পাসপোর্ট ইস্যু করতে অস্বীকার করার কারণগুলো উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি বিশেষ দিক প্রাসঙ্গিক:

ক) বিচারাধীন মামলা (Article 6(1)(e)): যদি কোনো ব্যক্তি ফৌজদারি আদালতে বিচারাধীন কোনো মামলায় হাজিরা এড়ানোর চেষ্টা করেন বা আদালত কর্তৃক তার দেশত্যাগের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা থাকে, তবে পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষ তাকে পাসপোর্ট দিতে অস্বীকার করতে পারে।

খ) নৈতিক স্খলন ও সাজা (Article 6(1)(c)): যদি আবেদনকারী আবেদনের পূর্ববর্তী ৫ বছরের মধ্যে নৈতিক স্খলনজনিত কোনো অপরাধে কমপক্ষে ২ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হন, তবে তাকে পাসপোর্ট দেওয়া হবে না।

২. বর্তমান আইনি প্রেক্ষাপট (২০২৪-২০২৬)

সাম্প্রতিক সময়ে (২০২৪-এর পরবর্তী প্রেক্ষাপটে) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইমিগ্রেশন বিভাগ পাসপোর্ট প্রদানের ক্ষেত্রে অধিকতর কড়াকড়ি আরোপ করেছে।

মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত: ২০২৫ সালের মে মাসে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি, দেশ-বিদেশে পলাতক আসামি এবং সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্তদের পাসপোর্ট সেবা বন্ধ বা বাতিল করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পুলিশি তদন্ত (Verification): পাসপোর্টের আবেদনের পর পুলিশ ভেরিফিকেশনের সময় যদি দেখা যায় আবেদনকারীর বিরুদ্ধে কোনো “গুরুতর” ফৌজদারি মামলা (যেমন—হত্যা, জালিয়াতি বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবিরোধী মামলা) আছে এবং মামলাটি চার্জশিট পর্যায়ে বা বিচারাধীন রয়েছে, তবে পুলিশ সাধারণত নেতিবাচক রিপোর্ট প্রদান করে। এর ফলে পাসপোর্ট প্রদান প্রক্রিয়া আটকে যায়।

৩. উচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণ

সুপ্রিম কোর্টের বিভিন্ন রায়ে বলা হয়েছে যে, পাসপোর্ট পাওয়া একজন নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকারের অংশ। তবে আদালতের সুনির্দিষ্ট কোনো নিষেধাজ্ঞা বা পরোয়ানা থাকলে পাসপোর্ট ইস্যু করা বা বিদেশে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। যদি মামলাটি প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে এবং আদালত থেকে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকে, তবে আইনিভাবে পাসপোর্ট পেতে বাধা নেই। তবে বর্তমানে নীতিগতভাবে “অভিযুক্ত” ব্যক্তিদের ভেরিফিকেশনে বিশেষ কড়াকড়ি করা হচ্ছে।

পরিস্থিতি অনুযায়ী বাস্তব চিত্র:

  • সাধারণ মামলা (তদন্তাধীন): পুলিশের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে প্রাপ্তি সাপেক্ষে; তবে অনেক ক্ষেত্রে ডিআইপি (DIP) স্থগিত রাখতে পারে।
  • আদালতে বিচারাধীন (চার্জশিট পরবর্তী): আদালতের বিশেষ অনুমতি বা অনাপত্তি ছাড়া পাসপোর্ট পাওয়া প্রায় অসম্ভব।
  • ফেরারি বা পলাতক আসামি: কোনোভাবেই পাসপোর্ট পাওয়ার সুযোগ নেই।
  • সাজাপ্রাপ্ত আসামি: সাজা ভোগ করার পর নির্দিষ্ট সময় পার না হওয়া পর্যন্ত পাসপোর্ট পাবেন না।

ভুক্তভোগী কেউ যদি নির্দিষ্ট কোনো মামলার কারণে পাসপোর্ট আটকে থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে পাসপোর্ট পাওয়ার জন্য অনাপত্তি বা বিদেশে যাওয়ার অনুমতি সংক্রান্ত আদেশ গ্রহণ করা সবচেয়ে কার্যকর সমাধান হতে পারে। এছাড়াও আদালতের আদেশ ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের ওপর বাধ্যতামূলক এবং তা পালন করা কর্তৃপক্ষের জন্য আবশ্যক।

লেখক: আশরাফুল করিম সাগর; আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *