ন্যায়বিচার দোরগোড়ায়: রাঙামাটিতে মাঠভিত্তিক এডিআর-এর সাফল্য
মোঃ জুনাইদ : ন্যায়বিচার কেবল আদালত, আইন কিংবা বিচারকের উপস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সাধারণ মানুষ বাস্তবে সেই বিচারসেবার নাগাল পায়। কিন্তু বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো ভৌগোলিকভাবে দুর্গম অঞ্চলে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি এখনও অনেক মানুষের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
রাঙামাটি পার্বত্য জেলায় ভূমি বিরোধ দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক অস্থিরতা ও পারিবারিক দ্বন্দ্বের অন্যতম কারণ। এসব বিরোধের সঙ্গে প্রায়শই জড়িয়ে থাকে দীর্ঘদিনের দখল, উত্তরাধিকার, মৌখিক বন্দোবস্ত, প্রথাগত ভূমি ব্যবহার, ভূমি জরিপের অনুপস্থিতি এবং অতীত সংঘাতের ইতিহাস। ফলে বিরোধের প্রকৃত চিত্র অনেক সময় কেবল কাগজপত্র দেখে উপলব্ধি করা সম্ভব হয় না।
এই বাস্তবতায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিস, রাঙামাটির আওতায় মাঠভিত্তিক বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (ADR) কার্যক্রম পরিচালনার অভিজ্ঞতা একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির জন্ম দেয়—যেখানে বিচারপ্রার্থীকে বিচারসেবার কাছে আসতে হয় না; বরং বিচারসেবা পৌঁছে যায় বিচারপ্রার্থীর কাছে।
রাঙামাটির বাস্তবতা
বাংলাদেশের বৃহত্তম জেলার অন্যতম রাঙামাটি। পাহাড়, বনাঞ্চল ও কাপ্তাই হ্রদের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে ঘেরা এই জেলার বহু এলাকার সঙ্গে জেলা সদরের যোগাযোগ এখনও সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
অনেক ক্ষেত্রে একটি বিরোধের পক্ষকে জেলা সদরে পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা পথ অতিক্রম করতে হয়। যাতায়াত ব্যয়, কর্মঘণ্টার ক্ষতি এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ মিলিয়ে অনেক বিচারপ্রার্থী আইনগত সহায়তা গ্রহণে নিরুৎসাহিত হন।
অন্যদিকে ভূমি ব্যবস্থাপনাও এখানে বিশেষভাবে জটিল। সরকারি রেকর্ড, প্রথাগত ভূমি ব্যবহার, দীর্ঘদিনের দখল, সামাজিক স্বীকৃতি এবং পার্বত্য অঞ্চলের ঐতিহাসিক বাস্তবতা অনেক সময় একে অপরের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে ভূমি বিরোধের প্রকৃত অবস্থা বুঝতে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ প্রায়শই অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
মাঠভিত্তিক এডিআর: একটি ভিন্ন উদ্যোগ
প্রচলিতভাবে অধিকাংশ মধ্যস্থতা জেলা লিগ্যাল এইড অফিস বা আদালত প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু রাঙামাটির বাস্তবতায় দেখা যায়, বহু বিচারপ্রার্থীর জন্য জেলা সদরে উপস্থিত হওয়াটাই একটি বড় বাধা।
এই প্রেক্ষাপটে উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে একটি মাঠভিত্তিক পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। আবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিরোধপূর্ণ ভূমিতে সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়, পক্ষদের বক্তব্য গ্রহণ করা হয়, স্থানীয় সাক্ষী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামত শোনা হয় এবং পরবর্তীতে একই এলাকায় মধ্যস্থতা সভার আয়োজন করা হয়।
এই পদ্ধতির ফলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পাওয়া যায়।
প্রথমত, বিরোধপূর্ণ ভূমির প্রকৃত অবস্থা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, পক্ষগণ বাস্তব পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে পারেন। তৃতীয়ত, স্থানীয়ভাবে স্বীকৃত সীমানা, দখল ও ব্যবহার সম্পর্কে তথ্য সহজে যাচাই করা যায়। চতুর্থত, বিচারপ্রার্থীদের সময় ও অর্থ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। সর্বোপরি, বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায়।
অনেক ক্ষেত্রে কারবারি, হেডম্যান, জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বিরোধের সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করেছেন। তবে মধ্যস্থতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া জাতীয় আইনগত সহায়তা কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হয়েছে।
প্রাপ্ত ফলাফল
রাঙামাটি জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের প্রশাসনিক তথ্য অনুযায়ী ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এডিআর কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়।
এই সময়ে মোট ২,৩২৪টি আবেদন গ্রহণ করা হয় এবং ২,৬০৩টি বিরোধ নিষ্পত্তি করা সম্ভব হয়। নিষ্পত্তির হার ধারাবাহিকভাবে ৯৫ শতাংশেরও বেশি ছিল।
দেওয়ানি, পারিবারিক এবং ফৌজদারি—তিন ধরনের বিরোধেই মধ্যস্থতার মাধ্যমে সফল সমাধান অর্জিত হয়েছে। একই সময়ে ১৭৫টি সরেজমিন মধ্যস্থতা সভা অনুষ্ঠিত হয় এবং মক্কেলদের পক্ষে প্রায় ২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা আদায় করা সম্ভব হয়।
তবে এই সাফল্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক কেবল পরিসংখ্যান নয়। দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধ, প্রতিবেশী সংঘাত এবং সামাজিক উত্তেজনার বহু ঘটনা স্থানীয় পর্যায়ে শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আদালতমুখী বিরোধও আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ পেয়েছে।
অভিজ্ঞতা থেকে কিছু শিক্ষা
রাঙামাটির অভিজ্ঞতা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে নিয়ে আসে।
প্রথমত, ন্যায়বিচার প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ভৌগোলিক দূরত্ব একটি বাস্তব প্রতিবন্ধকতা। বিচারসেবাকে মানুষের কাছে নিয়ে গেলে অংশগ্রহণ ও আস্থা—উভয়ই বৃদ্ধি পায়।
দ্বিতীয়ত, ভূমি বিরোধে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত কার্যকর। বাস্তব অবস্থা প্রত্যক্ষভাবে দেখার সুযোগ মধ্যস্থতাকারীকে বিরোধের প্রকৃতি সঠিকভাবে বুঝতে সহায়তা করে।
তৃতীয়ত, স্থানীয় সামাজিক বাস্তবতা ও প্রথাগত জ্ঞানের গুরুত্ব রয়েছে। বিরোধের সামাজিক প্রেক্ষাপট বোঝা গেলে অনেক সময় সমাধানের পথ সহজ হয়ে যায়।
চতুর্থত, মাঠভিত্তিক এডিআর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত জনবল ও প্রশাসনিক সহায়তা অপরিহার্য। সীমিত মানবসম্পদ নিয়ে এ ধরনের কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনা করা কঠিন।
জাতীয় পর্যায়ে প্রাসঙ্গিকতা
বর্তমানে বাংলাদেশে মামলা-পূর্ব মধ্যস্থতা ও আইনগত সহায়তা কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ চলমান। এই প্রেক্ষাপটে রাঙামাটির অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত শিক্ষা প্রদান করে।
হাওরাঞ্চল, চরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা কিংবা পার্বত্য অঞ্চলের মতো ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে বিচারপ্রার্থীর কাছে গিয়ে সেবা প্রদানের ধারণা কার্যকর হতে পারে। এতে আইনগত সহায়তা কার্যক্রম আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনগণমুখী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
উপসংহার
বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার মূল শক্তি এর নমনীয়তা, সহজপ্রাপ্যতা এবং মানুষের কাছে পৌঁছানোর সক্ষমতায়। রাঙামাটি পার্বত্য জেলার অভিজ্ঞতা দেখায় যে বিচারসেবার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বিদ্যমান থাকলেও তার প্রকৃত কার্যকারিতা নির্ভর করে সেই সেবা কতটা মানুষের বাস্তব জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারছে তার উপর।
মাঠভিত্তিক এডিআর কার্যক্রমের মাধ্যমে বহু মানুষ স্বল্প সময়ে, স্বল্প ব্যয়ে এবং নিজেদের সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে থেকে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ পেয়েছেন। এই অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—ন্যায়বিচার তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা আদালতের চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়।
লেখক: মোঃ জুনাইদ; সিনিয়র সিভিল জজ ও লিগ্যাল এইড অফিসার, সুনামগঞ্জ, (সাবেক জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার, রাঙামাটি পার্বত্য জেলা)
Source link
tags]
Leave a Reply