একটি আমগাছ, কিছু জমি এবং দুই ভাসুরের বিরুদ্ধে মিথ্যা ধর্ষণের গল্প!


সিরাজ প্রামাণিক : আদালতের এজলাস কক্ষটি তখন পিনপতন নীরব। আদালতে বিচারপ্রার্থী চল্লিশোর্ধ্ব রানু কবীর। সঙ্গে তাঁর ষোড়শী মেয়ে হ্যাপী। আসামীদ্বয় লিয়াকত ও মান্নান কম্পমান অবস্থায় দুই হাত জোড়া করে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (১) ধারা। ধর্ষণের এ অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদ্বয়ের মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড।

এ ধারায় বলা হয়েছে যে, যদি কোনো পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বছরের অধিক বয়সের কোনো নারীর সাথে তাঁর সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাঁর সম্মতি আদায় করে অথবা ষোল বছরের কম বয়সের কোনো নারীর সাথে তাঁর সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌনসঙ্গম করেন, তাহলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করেছেন বলে গণ্য হবেন।

নালিশি আরজি থেকে জানা যায়, রানু কবির তাঁর মেয়ে হ্যাপীকে নিয়ে বসবাস করেন শ্বশুরের ভিটায়। স্বামী একজন প্রবাসী। বছরে একবার বাড়ি এসে পরিবার-পরিজনদের দেখে যান। তিনি ও তাঁর মেয়ে ঘটনার দিন নিজ বসতঘরে অবস্থান করছিলেন। তখন বিকেল প্রায় তিনটা। আকস্মিকভাবেই তাঁর ঘরে আগমন করল আসামিরা। কিছু বোঝার আগেই রানু কবীরকে আসামি লিয়াকত ধর্ষণ করতে শুরু করল। একইভাবে মেয়ে হ্যাপীকে পাশের ঘরে জোর করে ধরে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করে মান্নান। ধর্ষণ শেষে আসামিরা বীরদর্পে বেরিয়ে যায়। চিৎকার দিয়ে ডাকাডাকি করলেও পাড়া-প্রতিবেশীরা কেউ এগিয়ে আসেনি। কারণ আসামিরা অত্যন্ত দাঙ্গাবাজ লোক।

অভিযোগের বর্ণনা দিতে গিয়ে রানু কবীর তাঁর আঁচল দিয়ে ও মেয়ে হ্যাপী তাঁর ওড়নায় মুখ ঢেকে অঝোর ধারায় কাঁদছিলেন। এজলাস কক্ষে এক অভাবনীয় পরিবেশের সৃষ্টি হলো। উপস্থিত জনগণ পারলে আসামিদের পিটুনি শুরু করে দেয়। কিন্তু এজলাস কক্ষে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার সুযোগ কারও নেই। তাই রক্ষে আর কী! আসামিরা করজোরে বিচারকের কাছে নিবেদন করল তারা দুই ভাই নির্দোষ, তারা বিচারপ্রার্থী। অভিযোগ গঠনের পর বিজ্ঞ বিচারক বিচারের দিন ধার্য করলেন। নির্ধারিত দিনে বিচার কাজ শুরু হলো।

আরও পড়ুন : পাথরঘাটা আদালতের এজলাসে দুই আইনজীবীর হাতাহাতি; উভয়ের সদস্যপদ স্থগিত, ওকালতিতে নিষেধাজ্ঞা

পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) মোকদ্দমা বিচারের জন্য উপস্থাপন করলেন। রাষ্ট্রপক্ষের ১ নম্বর সাক্ষী হিসেবে ডাক পড়ল ফরিয়াদি (বাদী) রানু কবীরের। সাক্ষীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রানু কবীর হলফ পড়লেন ‘আমি প্রতিজ্ঞাপূর্বক বলিতেছি যে, এই মোকদ্দমায় আমি যে সাক্ষ্য দিব তা সত্য হইবে, ইহার কোনো অংশ মিথ্যা হইবে না এবং আমি কোনো কিছু গোপন করিব না।’

বিচারক লক্ষ্য করলেন রানু কবীর হলফ পড়তে গিয়ে ইতস্তত বোধ করছিলেন এবং তাঁর গলা অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছিল। সবাই উদগ্রীব নির্যাতিতা রানু কবীরের ফরিয়াদ শোনার জন্য। কিন্তু রানু কবীরের মুখে কোনো কথা নেই। প্রশ্ন জাগে, কেন এই নীরবতা। বিচারক অত্যন্ত সহানুভূতিমাখা কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করেন রানু কবীরকে, তাঁকে কেউ ভয় দেখিয়েছে কি না? তারপরও রানু কবীর নীরব। বিচারকের কণ্ঠে উৎকণ্ঠা, বারবার তিনি রানু কবীরকে অভয় দিতে থাকেন, আশ্বাস দিতে থাকেন তাঁর সর্বাঙ্গীন নিরাপত্তা বিধানের।

সব শেষে রানু কবীর অস্ফুট কণ্ঠে বলেন, ‘আসামিরা সব দিয়ে দিয়েছে’। বিস্মিত বিচারক জিজ্ঞাসা করেন, কী দিয়ে দিয়েছে? এ সময় এগিয়ে আসেন আইনজীবী, তিনি জানান যে, পৈত্রিক সম্পত্তিতে ফরিয়াদির স্বামীর প্রাপ্য অংশ দিয়ে দিয়েছে আসামিদ্বয়। এবার বিচারের কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান ফরিয়াদি রানু কবীরকে জিজ্ঞেস করেন আসামি তাঁকে ধর্ষণ করেছে কি না? প্রশ্ন শুনে লজ্জাবনত হয়ে পড়েন রানু কবীর, তিনি জবাব দেন ‘না, আমার ভাসুর লিয়াকত সজ্জন ব্যক্তি। তিনি আমার সঙ্গে কখনোই কোনো খারাপ বা অশালীন আচরণ করেননি। সম্পত্তির ভাগাভাগি ত্বরান্বিত করার জন্যই মামলা করেছিলাম। নালিশ দরখাস্তের বক্তব্য আমার নয়, ভাসুরের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে নালিশ দায়ের করতে আমি কাউকে কোনো নির্দেশনা দিইনি।’

আরও পড়ুন : সাতক্ষীরায় কালবৈশাখী ঝড়ের বজ্রপাতে নারী আইনজীবী কামরুন নাহারের মর্মান্তিক মৃত্যু

এরপর ডাক পড়ে সাক্ষী হ্যাপীর। যথারীতি হলফ পড়ানোর পর তাঁকেও বিচারক জিজ্ঞাসা করেন, আসামি মান্নান তাঁকে ধর্ষণ করেছে কি না? তিনিও তাঁর মায়ের মতোই জবাব দেন। তাঁর সঙ্গে শ্রদ্ধেয় চাচাকে জড়িয়ে ধর্ষণের যে কথা বলা হয়েছে তা জেনে তিনি যারপরনাই লজ্জিত হন। ঘটনা এরপর পরিষ্কার হয়ে যায় বিচারকের সামনে। লিয়াকত, মান্নান ও রহিম এঁরা তিন ভাই। তাঁদের এজমালি সম্পত্তিতে রয়েছে একটি বিশাল আমগাছ। ওই গাছের আম পাড়তে গিয়েছিলেন হ্যাপী। আমগাছের ডাল ভেঙে পড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এই আশঙ্কায় তাঁকে ওই সময় আম পাড়তে নিষেধ করেন তাঁর চাচা। এই নিয়েই বিরোধের সূত্রপাত। তখন রানু কবীর সিদ্ধান্ত নেন তাঁর স্বামীর পৈতৃক সম্পত্তি ভাগাভাগি করে নেবে। তাঁর স্বামী এতে রাজি হননি।

স্বামীর ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে, তাকে না জানিয়ে রানু কবীর এক পরিচিত ‘টাউট’ শ্রেণির লোকের শরণাপন্ন হন। সেই ব্যক্তিই জমি দ্রুত আদায় করার ‘সহজ বুদ্ধি’ হিসেবে এই ধর্ষণের নোংরা গল্প ফাঁদেন। সামান্য জমির লোভ আর ক্ষোভের বশে একটি পরিবারকে ধ্বংস করতে, নিজের ও নিজের ১৬ বছরের মেয়ের সম্ভ্রমকে বন্ধক রেখে আদালতে মিথ্যা মামলা ঠুকে দিয়েছিলেন রানু কবীর।

মামলা থেকে লিয়াকত ও মান্নান সসম্মানে খালাস পেলেন বটে, কিন্তু যে মানসিক যন্ত্রণা, সামাজিক অবমাননা আর আদালতের বারান্দায় ঘোরার ক্লান্তি তারা সয়েছেন, তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে? আইনের এমন অপব্যবহার আমাদের সমাজের এক অন্ধকার দিককে চোখের সামনে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

আরও পড়ুন : ঈদুল আজহার ছুটি ২৫-৩১ মে: আগামী শনিবার খোলা থাকছে দেশের নিম্ন আদালত ও সুপ্রিম কোর্টের দপ্তর

অথচ এ আইনের ১৭ ধারায় মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে ৭ বছরের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ‘রক্ষাকবচ’ থাকা সত্ত্বেও মিথ্যা মামলার হিড়িক কেন থামছে না? কারণ, এই ১৭ ধারার বাস্তব প্রয়োগ নেই বললেই চলে। ধারাটি রীতিরকম কাগজে বাঘ, বাস্তবে ঠুঁটো জগন্নাথ। একটি মামলা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পর আদালত খুব কম ক্ষেত্রেই নিজ উদ্যোগে বাদী বা তার পেছনে থাকা কুশীলবদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেন। শাস্তির এই ভয়হীনতাই অপরাধপ্রবণ মানুষকে আরও সাহসী করে তুলছে।

প্রশ্ন হচ্ছে, গ্রামের সাধারণ একজন নারী আইনের মারপ্যাঁচ বা আদালতের ভাষা বোঝেন না। তাহলে এই রোমহর্ষক ও কুৎসিত ধর্ষণের গল্পগুলো লেখে কারা? বাস্তবতা হলো, আদালতের আনাচে-কানাচে ও বারান্দায় ওত পেতে থাকা এক শ্রেণির অসাধু ‘টাউট’, দালাল এবং নীতিহীন মোহরার (আইনজীবী সহকারী) এমনকি কিছু আইনজীবীরাও এই নোংরা ব্যবসার মূল চালিকাশক্তি। সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে তারা তৈরি করে দেন একেকটি বানোয়াট ও লোমহর্ষক ‘স্ক্রিপ্ট’। জমিজমা, টাকা-পয়সা বা ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানোর জন্য তারা ধর্ষণের মামলাকে ‘সবচেয়ে মোক্ষম ও সহজ হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করার পরামর্শ দেয়।

সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হলো, এই নালিশি দরখাস্ত বা আরজিগুলো অত্যন্ত অশালীন, কুরুচিপূর্ণ এবং চটকদার ভাষায় লেখা হয়, যা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে পড়া অসম্ভব। অনেক সময় বাদী নিজে সম্পূর্ণ না বুঝেই শুধু অপর পক্ষকে দ্রুত জেলে ঢোকানো বা ঘায়েল করার জন্য সেই নোংরা কাগজে টিপসই বা স্বাক্ষর দিয়ে দেন।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও সম্পাদক-প্রকাশক ‘দৈনিক ইন্টারন্যাশনাল’। Email: [email protected]



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *