চেকের মামলায় আসামী যা প্রমাণ করলেই খালাস পেতে পারেন!


সিরাজ প্রামাণিক : চেক ডিসঅনার মামলায় আসামী তিনটি ডিফেন্স নিয়ে রীতিরকম খালাস পেতে পারেন। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের একটি বেঞ্চ গত ১৪/১২/২০১৩ ইং তারিখে দুটি রিট পিটিশন যথাক্রমে ৩৬৮৯/২০১২ এবং ১২৪০১/২০১২ মামলায় অভিমত প্রকাশ করেছেন যে, আসামী চেক ডিসঅনারের মামলায় তিন ধরণের ডিফেন্স নিতে পারবেন।

১। রিয়েল অর এ্যাবসলুইট ডিফেন্স অথাৎ যুক্তিসঙ্গত ডিফেন্স, ২। সমান্তরাল ডিফেন্স, ৩। লিগ্যাল ডিফেন্স। এর মধ্যে ১ নং রিয়েল বা যুক্তিসংগত ডিফেন্স হচ্ছে চেক ইস্যু করার সময় আসামী শারীরিকভাবে সুস্থ ছিল না, যেমন-তখন সে পাগল, উম্মাদ বা বিচারবুদ্ধিহীনতায় ভুগছিল এমন বিষয় প্রমাণ করতে পারলে তা যুক্তিসংগত ডিফেন্স হিসেবে বিবেচিত হবে। আমাদের দন্ডবিধির ৮৪ ধারায় অনুরুপ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নেয়া যায়।

আবার চেক ইস্যু করার সময় আসামী মাতাল বা মানসিকভাবে সুস্থ ছিল না এটাও তার আত্মপক্ষ সমর্থনের উপায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। চেকে শুধু স্বাক্ষর দিলেই চলে না, তা যে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে কোনো দায়/দেনা পরিশোধের জন্য চেক দিয়েছিল তা বাদীকেই প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু আসামী পক্ষে যদি উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমানাদি, যেমন মেডিক্যাল সনদ, রাসায়নিক পরীক্ষার প্রতিবেদন ইত্যাদি দিয়ে দেখাতে পারেন যে, চেক ইস্যু করার সময় তাকে মাতাল করা হয়েছিল, তাহলে সেটি উপযুক্ত ডিফেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।

আবার তর্কিত চেক ব্যাংকে উপস্থাপনের আগেই যদি চেকদাতা এখতিয়ার সম্পন্ন আদালত কর্তৃক ঘোষিত হয়, সে মানসিক ভারসাম্যহীন ছিল, সেটিও আসামীর আত্মপক্ষ সমর্থনের ভাল ডিফেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। আবার নাবালক কর্তৃক চেক ইস্যু করা হলে বা নাবালকের পক্ষে কোন চেক ইস্যু করা হলে এবং ওই চেক ডিসঅনার হলে তার বিরুদ্ধে ১৩৮ ধারার মামলা করা যায় না।

আরও পড়ুন : এক চেকে দুই লিগ্যাল নোটিশ: আইনি জটিলতা ও সমাধানের পথ!

আর চেক ইস্যু করার ক্ষেত্রে যদি কোনোরুপ ফ্রড, তঞ্চকতা বা মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে আসামী খালাস পাওয়ার অধিকারী হয়।

আবার এন.আই এ্যাক্টের ৮৭ ধারার বিধান অনুযায়ী চেকের বিষয়বস্তুর কোনো পরিবর্তন দেখা গেলে আসামী সে সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। শুধু তাই নয়, আসামী যদি প্রমাণ করতে পারে যে, তর্কিত চেকটি বাদী জালিয়াতি করে সৃষ্টি করেছে বা চেকে দেয়া স্বাক্ষরটি জাল করা হয়েছে বা চেকে উল্লেখিত টাকার পরিমাণ কাটাকাটি করে লেখা হয়েছে, তবে অনুরুপ ক্ষেত্রে আসামী খালাস পাওয়ার যোগ্য হয়।

মামলা দায়েরের আগেই বাদীর দাবীকৃত টাকা আসামী নগদে পরিশোধ করে থাকলে আবার চেকের উপর ওভাররাইটিং থাকলে কিংবা টেম্পারিং করে তর্কিত চেকের টাকার অংক পরিবর্তন করলেও আসামী খালাস পাবে। এক্ষেত্রে ভারতের পাঞ্জাব এবং হরিয়ানা হাইকোর্ট ২০১০ সালে ডিসিআর ১ নং ভলিউমের ১০৮ পৃষ্ঠায় একটি দারুন সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

আসামী যদি আরও দেখাতে পারে যে, তাকে অবৈধভাবে ভয় দেখিয়ে বা জোর জবরদস্তি করে চেকে সই করতে বাদীপক্ষ বাধ্য করেছিল তাহলে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ডিফেন্স হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। উপরোক্ত বিষয়গুলোর যে কোন একটি প্রমাণ করতে পারলেই আসামী চেক ডিসঅনারের মামলায় খালাস পেতে পারে।

প্রতিদান ছাড়া যেমন চুক্তি হয় না, তেমনি প্রতিদান ছাড়া কোন হস্তান্তরযোগ্য দলিল কার্যকর করা যাবে না। কাজেই স্বাক্ষর সহ চেক কারও নিকট হস্তগত হলেই কিংবা ব্যাংক ডিসঅনার করলেই চেকের মামলায় আসামীকে শায়েস্তা করা যাবে না। প্রতিদান বা দেনা পাওনা বা লেনদেন প্রমাণ করতে না পারলে মামলায় আসামী খালাস পাবে-এমনটিই বলেছেন উচ্চ আদালত। (লোকমান বনাম আয়ুব আলী এবং রাষ্ট্র মামলা, যা ৩৮ বিএলডি, পৃষ্ঠা ৬১৬, ৬১৭-৬২০)।

আরও পড়ুন : চেকের মামলায় ভুল ঠিকানায় নোটিশ: আসামী খালাস পেতে পারে!

আসামী কোন প্রেক্ষাপটে তর্কিত চেকটি ইস্যু করেছিল আত্মপক্ষ সমর্থনে সেটা প্রমাণ করার অধিকার আসামীর রয়েছে। কারণ এন.আই এ্যাক্টের ১১৮ ধারার অধীনে ধর্তব্য অনুমান খন্ডনযোগ্য। আসামী আত্মপক্ষ সমর্থনে তর্কিত চেকের বিপরীতে কোনো কিছু বলতে চাইলে তা অতি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হয়। কেননা উক্ত চেকটি সে কেন ইস্যু করেছিল তা বলার অধিকার তার রয়েছে। আসামী বাদী পক্ষের সাক্ষীকে জেরা করে কিংবা সাফাই সাক্ষী দিয়ে অথবা উপযুক্ত কোন সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করে অনুরুপ অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। (মহেষ চন্দ্রিকার বনাম দত্তরাম, বোম্বে হাইকোর্ট, ২০০৯(২) ডিসিআর ১৮৫)।

নালিশী চেকের বিপরীতে বাদী কর্তৃক দাবীকৃত প্রতিদান (কনসিডারেশন) অসম্ভব বা সন্দেহযুক্ত মর্মে যদি আসামী প্রাথমিকভাবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়, তাহলে তা প্রমাণের দায়িত্ব আসামীপক্ষ থেকে বাদীপক্ষের উপর ন্যাস্ত হয়। (ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট (১৯৯৩) ৩ এসসিসি ৩৫)।

এন.আই এ্যাক্টের ১৩৮ ধারা এবং সাক্ষ্য আইনের ৪৫ ধারা একত্রে পর্যালোচনা করে ভারতের মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট সোহানলাল সিংহল এবং অন্যান্য বনাম সুনিত জাইন (২০১৫ (২) ডিসিআর ৪৯৬) মামলায় বর্ণনা করেন যে, তর্কিত চেকের লেখার ভিন্নতা বিষয়ে আসামীপক্ষ আপত্তি তোলার পর তা হস্তলেখা বিশারদ দ্বারা পরীক্ষা করানোর আবেদন বিচারিক আদালত কর্তৃক প্রত্যাখান করা বেআইনী আদেশ বলে গণ্য হবে। কেননা উক্ত বিষয়ে আসামী উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করে আত্মপক্ষ সমর্থন করার আইনানুগ অধিকারী। কাজেই চেকের স্বাক্ষর না মেলা চেকের অন্যন্য কলামগুলো ভিন্ন হাতের লেখা হলে চেক প্রাপ্তির বিষয়টি সন্দেহের সৃষ্টি করে এবং এ সন্দেহ প্রতিষ্ঠা করে একজন আসামী খালাস পেতে পারে।

আবার আসামীর স্বাক্ষর, টাকার অংক এবং পেয়ীর নাম ভিন্ন হাতের লেখা হলে এন.আই এ্যাক্টের ৩ (ই) ধারার বিধান অনুসারে এটাকে ইস্যুয়েন্স অব চেক বলা যাবে না। সেই চেক আইনানুগভাবে বৈধ হবে না। এ বিষয়ে ৫৬ ডিএলআর ৬৩৬ পৃষ্ঠায় একটি দারুন সিদ্ধান্ত আছে। উপরোক্ত কারণসমূহের যে কোন একটি পালিত না হলে চেক ডিসঅনারের মামলায় আসামী খালাস পেতে পারেন।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, আইনগ্রন্থ প্রণেতা ও পিএইচ. ডি ইন ল। ইমেইল: [email protected]



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *