‘ভাসানী যখন ইউরোপে’: পাকিস্তান আমলের নিষিদ্ধ বই
একটি বইয়ের বক্তব্য সরকারের পছন্দ হয়নি। সরকার বইটি নিষিদ্ধ করল। লেখক আদালতের শরণাপন্ন হলেন। আদালতও শেষ পর্যন্ত সরকারের সিদ্ধান্ত বহাল রাখলেন। ঘটনাটি প্রায় সাত দশক আগের। কিন্তু এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা প্রশ্নগুলো আজও প্রাসঙ্গিক। সরকারের সমালোচনা কত দূর পর্যন্ত করা যাবে? সরকারের কোনো নীতির বিরোধিতা কি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর শামিল? আর সরকার যখন কোনো প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে, তখন আদালতের দায়িত্ব কি শুধু সেই সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি খুঁজে দেখা, নাকি নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যথাযথভাবে সুরক্ষিত হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করা?
এই প্রশ্নগুলো নতুন করে মনে হলো ১৯৫৯ সালের একটি মামলার রায় পড়তে গিয়ে। মামলাটির নাম খন্দকার মুহাম্মদ ইলিয়াস বনাম দ্য প্রভিন্স অব ইস্ট পাকিস্তান। মামলার বিষয়বস্তু ছিল খন্দকার মুহাম্মদ ইলিয়াস রচিত ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করার সরকারি আদেশের বৈধতা। ১৯৫৯ সালের ১৩ এপ্রিল পূর্ব পাকিস্তানের উচ্চ আদালতের বিচারপতি আকবর, বিচারপতি খান ও বিচারপতি বাকেরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ মামলাটির রায় দেন।
১৯৫৭ সালে প্রকাশিত ‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ বইটি মূলত মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ইউরোপ সফরের ঘটনাবলি নিয়ে লেখা। তবে এটি শুধু একটি ভ্রমণবৃত্তান্ত ছিল না। বইটির ৪০টি অধ্যায়জুড়ে লেখক তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনীতি, অর্থনৈতিক অবস্থা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, বিদেশি সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা, প্রশাসনিক দুর্নীতি, রাজনৈতিক বন্দিত্ব এবং গণতান্ত্রিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার নানা দিক তুলে ধরেছিলেন। এসব বিষয়ে তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল। অনেক ক্ষেত্রে সেই দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছিল বেশ কঠোর ভাষায়।
আরও পড়ুন : বিচারিক পঞ্জিকা পুনর্বিবেচনা: জনস্বার্থে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে দীর্ঘ অবকাশের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার জরুরি
বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক নিয়ে লেখকের অবস্থান ছিল অত্যন্ত সমালোচনামূলক। তিনি মনে করতেন, বিদেশি সাহায্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে দুর্বল করছে। মার্কিন সাহায্য, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের কার্যক্রম এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে তিনি সরব ছিলেন। একই সঙ্গে পুলিশি ব্যবস্থা, রাজনৈতিক নেতাদের ব্যর্থতা এবং বিরোধী মত দমনের সমালোচনাও করেছিলেন।
তৎকালীন সরকার এসব বক্তব্যকে স্বাভাবিক রাজনৈতিক সমালোচনা হিসেবে গ্রহণ করেনি। ১৯৫৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর প্রেস (ইমার্জেন্সি পাওয়ার্স) অ্যাক্ট, ১৯৩১-এর ১৯ ধারায় বইটির সব কপি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়। ১৯৫৯ সালের ৮ জানুয়ারি সরকারি গেজেটে সেই আদেশ প্রকাশিত হয়। লেখক আইনের ২৩ ধারায় আদালতে আবেদন করে সরকারের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করেন।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যে আইনের ভিত্তিতে বইটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল, সেটি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের আইন। ব্রিটিশ সরকার সংবাদপত্র ও প্রকাশনার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য এ ধরনের আইন ব্যবহার করত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও সেই আইন বহাল থাকে এবং স্বাধীন রাষ্ট্রের সরকার একই আইনের আশ্রয় নিয়ে রাজনৈতিক সমালোচনামূলক একটি বই নিষিদ্ধ করে। ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটলেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগের অনেক পদ্ধতি যে অপরিবর্তিত থেকে গিয়েছিল, এই মামলা তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
আইনের ব্যাখ্যা ও সরকারের সমালোচনার সীমা
আইনটির ৪(১)(d) ধারায় সরকারের প্রতি ঘৃণা, অবজ্ঞা বা অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে—এমন প্রকাশনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান ছিল। অন্যদিকে, ৪(১)(h) ধারায় বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মধ্যে শত্রুতা বা ঘৃণা সৃষ্টির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে একই আইনের দ্বিতীয় ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, আইনসম্মত উপায়ে সরকারি নীতির পরিবর্তন আনার উদ্দেশ্যে সরকারের কোনো পদক্ষেপের সমালোচনা করা হলে এবং তাতে ঘৃণা, অবজ্ঞা বা বিদ্বেষ উসকে দেওয়ার চেষ্টা না থাকলে, সেটি নিষিদ্ধ বক্তব্য হিসেবে গণ্য হবে না।
অর্থাৎ, আইনটি নিজেই সরকারের সমালোচনা এবং সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ানোর মধ্যে একটি পার্থক্যরেখা টেনেছিল। এই পার্থক্যই মামলার কেন্দ্রীয় আইনগত প্রশ্ন। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে সরকারের সমালোচনা করার অধিকার না থাকলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে পড়ে। সরকারের নীতির পরিবর্তনের দাবি, কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা কিংবা প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা—এসবকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। বেআইনি কার্যকলাপে উসকানি বা সহিংসতা ছড়ানোর প্রশ্ন আলাদা; রাজনৈতিক বিরোধিতা নিজে অপরাধ নয়।
মামলার শুনানিতে সরকারের পক্ষে অ্যাডভোকেট জেনারেল বি. এ. সিদ্দিকী বইটির ১৮টি অংশ আপত্তিকর হিসেবে চিহ্নিত করেন। এর মধ্যে ১৩টি অংশ সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা বা অবজ্ঞা সৃষ্টি এবং পাঁচটি অংশ বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টির অভিযোগে তুলে ধরা হয়। তবে শুনানির একপর্যায়ে সরকারের আইনজীবী নিজেই স্বীকার করেন, শেষের পাঁচটি অংশ সংশ্লিষ্ট ধারার আওতায় পড়ে না। ফলে মূল বিতর্ক সীমিত হয়ে আসে সরকারের প্রতি ঘৃণা, অবজ্ঞা বা অসন্তোষ সৃষ্টির প্রশ্নে।
আরও পড়ুন : দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: কনস্যুলার অধিকার, আন্তর্জাতিক আইন ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন
বিচারপতি আকবর তাঁর রায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির উল্লেখ করেন। তিনি স্বীকার করেন, কোনো বইয়ের বিচ্ছিন্ন শব্দ বা বাক্য ধরে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বরং পুরো বইটি পড়ে তার সামগ্রিক বক্তব্য ও প্রভাব বিবেচনা করতে হবে। তিনি পূর্ববর্তী বিচারিক সিদ্ধান্তের আলোকে সাধারণ অপছন্দ, বিরোধিতা, ঘৃণা ও অবজ্ঞার মধ্যকার পার্থক্যও তুলে ধরেন। এই নীতির সঙ্গে দ্বিমত করার কারণ নেই। কিন্তু সমস্যাটি তৈরি হয়েছে এর প্রয়োগে।
বিচারপতি আকবর মনে করেন, লেখক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করার আড়ালে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষুব্ধ করতে চেয়েছেন। তাঁর মতে, বইটির বক্তব্যের মূল সুর হলো, পাকিস্তান সরকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে দেশের ক্ষতি করছে। লেখক চীন ও সোভিয়েত রাশিয়ার উন্নয়নের প্রশংসা করেছেন বলেও বিচারপতি আকবর ধারণা করেন, তিনি পাকিস্তানের প্রচলিত শাসনব্যবস্থার পরিবর্তে কমিউনিস্ট ধরনের শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।
এই যুক্তির সঙ্গে একমত হওয়া কঠিন। একজন লেখক কোনো সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বিরোধিতা করতে পারেন, বিদেশি সাহায্যের শর্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, এমনকি অন্য কোনো দেশের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রশংসাও করতে পারেন। কিন্তু শুধু এসব কারণে তাঁর উদ্দেশ্য সরকারকে বেআইনিভাবে উৎখাত করা—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও সুস্পষ্ট ভিত্তি প্রয়োজন।
সরকারের নীতির পরিবর্তনের দাবি এবং সরকার পরিবর্তনের দাবি—দুটিই রাজনৈতিক মতপ্রকাশের অংশ হতে পারে। কোনো বক্তব্যে বেআইনি কার্যকলাপে উসকানি রয়েছে কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শ, সরকারের প্রতি বিরূপ মনোভাব বা কোনো নীতির কঠোর সমালোচনাকে অপরাধের উপাদান হিসেবে ধরে নেওয়া হলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিসর অত্যন্ত সংকুচিত হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের সমালোচনা, সরকারের সমালোচনা এবং বেআইনি রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড—এই তিনটি বিষয়কে এক করে দেখলে আইনের সুরক্ষামূলক ব্যতিক্রমগুলো কার্যত অকার্যকর হয়ে যায়।
পুলিশের সমালোচনা কি বিদ্বেষ ছড়ানো?
বইটির আরেকটি অংশে পুলিশের কার্যক্রমের সমালোচনা করা হয়েছিল। লেখক অভিযোগ করেছিলেন, ব্রিটিশ শাসন শেষ হলেও পুলিশি ব্যবস্থার কিছু পুরোনো পদ্ধতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে দুর্নীতি দমনের নামে ব্যবহৃত ‘ট্র্যাপ কেস’ পদ্ধতি নিয়ে তিনি আপত্তি জানিয়েছিলেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু কার্যক্রমকে তিনি দুর্নীতির সঙ্গেও তুলনা করেন।
বিচারপতি আকবরের মতে, এটি শুধু পুলিশের একটি পদ্ধতির সমালোচনা ছিল না; বরং পুলিশ বাহিনীকে একটি শ্রেণি হিসেবে হেয় করার চেষ্টা। আদালত মনে করেন, এ ধরনের বক্তব্য পুলিশ সদস্যদের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করতে পারে।
রায়ের এই অংশটিও একই সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। পুলিশ রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলেও তার কার্যক্রম সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ প্রতিরোধ এবং নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা নাগরিকের অধিকার। কোনো প্রতিষ্ঠান বা তার সদস্যদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ করা উচিত নয়; সমালোচনার ক্ষেত্রেও তথ্যের যথার্থতা ও দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। কিন্তু কোনো অভিযোগ সত্য কি মিথ্যা, আর সেই অভিযোগ প্রকাশ করা আইনত অপরাধ কি না—এ দুটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রশ্ন।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে সমালোচনার ঊর্ধ্বে রাখার প্রবণতা জবাবদিহির পরিবেশকে দুর্বল করে। বিশেষ করে যে প্রতিষ্ঠান আইন প্রয়োগের ক্ষমতা রাখে, তার কাজকর্ম নিয়ে নাগরিকের প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকা আরও বেশি জরুরি। তাই পুলিশের সমালোচনাকে একটি শ্রেণির বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টির পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের যুক্তি যথেষ্ট বিস্তৃত বলে মনে হয়।
সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপট ও আদালতের ভূমিকা
মামলাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয়েছিল। বইটি বাজেয়াপ্ত করা হয় সেই সামরিক শাসনের সময়। লেখকের পক্ষের আইনজীবী আবদুস সালাম খান আদালতে যুক্তি দিয়েছিলেন, সামরিক শাসন চললেও যেসব গণতান্ত্রিক নীতি স্পষ্টভাবে বাতিল করা হয়নি, সেগুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
কিন্তু বিচারপতি আকবর সামরিক আইনবিধি নং ৫১-এর উল্লেখ করে গণতান্ত্রিক নীতির ভিত্তিতে আইন ব্যাখ্যার যুক্তি আর গ্রহণ করেননি। তাঁর বক্তব্য ছিল, প্রচলিত আইন যত দিন বহাল থাকবে, আদালতকে তা কার্যকর করতে হবে।
আইন প্রয়োগের এই অবস্থান আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু আদালত কি শুধু আইনের শব্দগত অর্থ অনুসরণ করবে, নাকি সেই আইন প্রয়োগের সময় নাগরিকের স্বাধীনতা এবং আইনের সুরক্ষামূলক বিধানগুলোকেও যথাযথ গুরুত্ব দেবে? আমি মনে করি, এই দুই দায়িত্ব পরস্পরবিরোধী নয়। বরং আইনের সঠিক প্রয়োগের মধ্যেই নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা নিহিত থাকার কথা। বিশেষ করে যখন কোনো আইন নিজেই সরকারের সমালোচনার সুযোগ স্বীকার করে, তখন সেই সুযোগের ব্যাখ্যা অযথা সংকীর্ণ করা উচিত নয়।
এই মামলায় বিচারপতি আকবরের অবস্থান থেকে বোঝা যায়, তিনি প্রচলিত আইন কার্যকর করার বাধ্যবাধকতাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপটে নাগরিকের রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নটি তাঁর বিশ্লেষণে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পেয়েছে। এখানেই বিচার বিভাগের ভূমিকার মৌলিক প্রশ্নটি সামনে আসে: আদালত কি নির্বাহী বিভাগের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ব্যাখ্যাকে অগ্রাধিকার দেবে, নাকি আইনের ভাষার মধ্যেই নাগরিক স্বাধীনতার সুরক্ষা খুঁজে নেবে?
বিচারপতি বাকেরের পৃথক যুক্তি
রায়টির আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো বিচারপতি বাকেরের পৃথক যুক্তি। তিনি বইটি বাজেয়াপ্ত করার সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হলেও রায়ের মূল লেখক বিচারপতি আকবরের সব যুক্তি গ্রহণ করেননি।
বিচারপতি বাকের মনে করেন, বইটির বড় অংশে অতীতের সংসদীয় সরকারগুলোর ব্যর্থতা, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের সমালোচনা করা হয়েছে। যেসব সরকারকে উদ্দেশ্য করে এসব বক্তব্য লেখা হয়েছিল, তারা তখন আর ক্ষমতায় ছিল না। ফলে অতীত সরকারের সমালোচনাকে বর্তমান সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা যুক্তিসংগত নয়। এমনকি তাঁর মতে, পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ব্যর্থতার বিবরণ নতুন সামরিক শাসনের প্রয়োজনীয়তাকেও সমর্থন করতে পারে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিও বইটি বাজেয়াপ্ত করার আদেশ বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। তাঁর যুক্তি ছিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের বিরুদ্ধে বইটির তীব্র অবস্থান তৎকালীন সরকারের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পাকিস্তানের যে সরকারই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখুক, বইটির বক্তব্য সেই সরকারের বিরুদ্ধে ঘৃণা সৃষ্টি করতে পারে।
বিচারপতি বাকেরের এই যুক্তির মধ্যেও অসংগতি রয়েছে। একদিকে অতীত সরকারের সমালোচনাকে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে না। অন্যদিকে একটি পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনাকে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ সৃষ্টির ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু পররাষ্ট্রনীতি তো কোনো সরকারের সমালোচনার বাইরে থাকতে পারে না।
একটি দেশ কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবে, কার কাছ থেকে সাহায্য নেবে, কী ধরনের সামরিক বা অর্থনৈতিক চুক্তিতে যাবে—এসব বিষয়ে জনগণের ভিন্নমত থাকতেই পারে। সেই ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য।
আরও পড়ুন : ডিসঅনার স্লিপ না থাকলেই চেকের মামলা ব্যর্থ হয়ে যায় না: হাইকোর্ট
আরও লক্ষণীয়, আদালত বইটির সব বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করেননি। পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক নীতির সমালোচনার কিছু অংশকে বিচারপতি আকবর আইনের নিষিদ্ধ বক্তব্যের আওতার বাইরে রেখেছেন।
বিশেষ করে বইয়ের ২৮৭ পৃষ্ঠায় গণতন্ত্রের সংকট, রাজনৈতিক বন্দিত্ব, সংবাদপত্র দমন এবং একটি অগণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানীর কঠোর সমালোচনা ছিল। সেখানে প্রতিবাদের আহ্বানও জানানো হয়েছিল। তবু আদালত ওই বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করেননি। বিচারপতি আকবর মনে করেন, এর উদ্দেশ্য ছিল আইনসম্মত উপায়ে সরকারি নীতির পরিবর্তন আনা। সংশ্লিষ্ট সরকারও তখন আর ক্ষমতায় ছিল না।
এই অংশটি পুরো রায়ের সঙ্গে মিলিয়ে পড়লে প্রশ্ন আসে, গণতন্ত্রের সংকট বা রাজনৈতিক বন্দিত্বের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা যদি বৈধ হতে পারে, তাহলে বিদেশি সাহায্য কিংবা পুলিশি কার্যক্রমের সমালোচনাকে কেন একইভাবে দেখা হলো না? প্রতিটি বক্তব্যের ভাষা ও প্রেক্ষাপট আলাদা হতে পারে, সেটি স্বীকার করি। কিন্তু কোন বক্তব্য আইনসম্মত সমালোচনা আর কোনটি অপরাধ, তার সীমারেখা নির্ধারণে আদালতের যুক্তি সুসংগত হওয়া প্রয়োজন। এই মামলায় সেই সুসংগততার ঘাটতি চোখে পড়ে।
কোনো বক্তব্যের নৈতিক বা রাজনৈতিক সমালোচনা এবং সেই বক্তব্যকে আইনের অধীনে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা এক বিষয় নয়। আদালতের দায়িত্ব হলো অভিযোগের সঙ্গে প্রযোজ্য আইনের উপাদানগুলোর মিল রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা। একইভাবে সরকারের কোনো নীতির বিরোধিতা, কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা বা কোনো বিকল্প রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রশংসাকে বেআইনি বিদ্বেষের সঙ্গে এক করে দেখার আগে আদালতকে বক্তব্যের উদ্দেশ্য, ভাষা, প্রেক্ষাপট এবং সম্ভাব্য প্রত্যক্ষ প্রভাব পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়।
বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক বাস্তবতায় মামলাটির প্রাসঙ্গিকতা
এই ঐতিহাসিক মামলাটি বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক বাস্তবতার আলোকে পড়লেও গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্ন সামনে আসে। আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে আইন দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে বাক্স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকারের কথাও বলেছে।
অবশ্য ১৯৫৯ সালের মামলাটি বর্তমান বাংলাদেশের সংবিধানের অধীনে নিষ্পত্তি হয়নি। তাই আজকের সাংবিধানিক মানদণ্ড সরাসরি সেই মামলায় প্রযোজ্য ছিল, এমন বলা যাবে না। তবে বর্তমান সাংবিধানিক মূল্যবোধের আলোকে অতীতের বিচারিক সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ করা অবশ্যই সম্ভব।
এই মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, রাষ্ট্র এবং সরকারের মধ্যকার পার্থক্যটি যথাযথভাবে বোঝার প্রয়োজনীয়তা। রাষ্ট্র একটি স্থায়ী রাজনৈতিক ও আইনগত প্রতিষ্ঠান। সরকার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে। ফলে সরকারের কোনো নীতির বিরোধিতা করা মানেই রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা নয়। সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা অনেক সময় রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যেও করা হতে পারে।
একইভাবে পুলিশ, প্রশাসন বা অন্য কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সমালোচনা সেই প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব অস্বীকার করার সমতুল্য নয়। বরং এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ থাকলেই জবাবদিহির পরিবেশ তৈরি হয়। রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যকে সরকারের প্রতি সমর্থনের সঙ্গে এক করে দেখলে নাগরিকের রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয় এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে।
আরও পড়ুন : বিদ্যমান বিধানের অধীনে অর্জিত পদোন্নতিতে নতুন প্রবিধান প্রযোজ্য নয় : হাইকোর্ট
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই দায়িত্বহীনতার অনুমতি নয়। অসত্য তথ্য প্রচার, অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করা কিংবা সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার মতো বিষয়ে আইনসম্মত সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার প্রয়োগ হতে হবে যুক্তিসংগত, প্রয়োজনীয় এবং আইনের নির্দিষ্ট শর্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সরকারের সমালোচনা, নীতির বিরোধিতা বা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন তোলাকে কেবল ক্ষমতাসীনদের অস্বস্তির কারণে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না।
বিশেষ করে কোনো বই বা প্রকাশনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা প্রয়োজন। কারণ একটি বই নিষিদ্ধ হলে শুধু লেখকের অধিকারই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, পাঠকের জানার সুযোগও সীমিত হয়। এর প্রভাব অন্য লেখক, সাংবাদিক ও প্রকাশকদের ওপরও পড়ে। তাঁরা হয়তো আইনি ঝুঁকির আশঙ্কায় প্রয়োজনীয় সমালোচনা থেকেও বিরত থাকবেন। ফলে নিষেধাজ্ঞা শুধু একটি প্রকাশনাকে থামায় না; তা জনপরিসরে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ভয়ের পরিবেশও তৈরি করতে পারে।
বিচার বিভাগের ভূমিকার প্রশ্নটি এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আদালত রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ, কিন্তু নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্তকে প্রশ্নহীনভাবে গ্রহণ করা তার কাজ নয়। আদালতের দায়িত্ব হলো আইনের আলোকে সেই সিদ্ধান্তের বৈধতা পরীক্ষা করা এবং নাগরিকের অধিকার যথাযথভাবে বিবেচনা করা। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ এবং নাগরিক স্বাধীনতার মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে আদালতের নিরপেক্ষ ও স্বাধীন অবস্থানই আইনের শাসনের অন্যতম ভিত্তি।
‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ মামলায় আদালত সরকারের সব অভিযোগ গ্রহণ করেননি। কিছু বক্তব্যকে বৈধ সমালোচনা হিসেবেও স্বীকৃতি দিয়েছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বইটির সামগ্রিক রাজনৈতিক বক্তব্য ও সম্ভাব্য প্রভাবের ভিত্তিতে বাজেয়াপ্ত করার আদেশ বহাল রেখেছেন।
আমার কাছে এই রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এখানে বিচারিক যুক্তির মধ্যেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি এবং সেই স্বাধীনতার সীমা সংকুচিত করার প্রবণতা পাশাপাশি উপস্থিত রয়েছে। আদালত একদিকে স্বীকার করেছেন যে সরকারি নীতির পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে সমালোচনা বৈধ হতে পারে; অন্যদিকে বিদেশি সাহায্য, পররাষ্ট্রনীতি ও পুলিশি কার্যক্রমের সমালোচনাকে সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই দ্বৈততা দেখায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সুরক্ষা শুধু আইনে ব্যতিক্রম থাকার ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে আদালত সেই ব্যতিক্রমকে কতটা সংকীর্ণ, নির্দিষ্ট ও প্রমাণভিত্তিকভাবে ব্যাখ্যা করছে, তার ওপরও।
সমালোচনা গ্রহণের সক্ষমতাই রাষ্ট্রের শক্তি
প্রায় সাত দশক আগের এই রায় তাই কেবল একটি নিষিদ্ধ বইয়ের ইতিহাস নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও নাগরিক স্বাধীনতার সম্পর্ক সব সময় সহজ নয়। আইন কখনো রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব রক্ষার উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হয়, আবার সেই আইনই নাগরিকের অধিকার রক্ষার আশ্রয় হতে পারে। পার্থক্য তৈরি হয় আইনের প্রয়োগে, বিশেষ করে আদালতের ব্যাখ্যায়।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকারের প্রশংসা করার স্বাধীনতা নিয়ে সাধারণত কোনো বিতর্ক হয় না। প্রকৃত বিতর্ক শুরু হয় তখন, যখন কেউ সরকারের ভুল ধরিয়ে দেন, তার নীতির বিরোধিতা করেন কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সেই পরিস্থিতিতেই বোঝা যায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কতটা কার্যকর এবং বিচার বিভাগ সেই স্বাধীনতা রক্ষায় কতটা ভূমিকা পালন করতে পারছে।
‘ভাসানী যখন ইউরোপে’ মামলাটি পড়ার পর আমার মনে হয়েছে, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য আর সরকারের প্রতি সমর্থনকে এক করে দেখার প্রবণতা সম্পর্কে আমাদের সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সরকার পরিবর্তিত হয়, নীতিও পরিবর্তিত হয়। কিন্তু নাগরিকের অধিকার এবং আইনের শাসনের প্রয়োজনীয়তা থেকে যায়।
শেষ পর্যন্ত একটি রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার আইন প্রয়োগের ক্ষমতায় নয়, সমালোচনা গ্রহণ করার সামর্থ্যেও নিহিত। আর বিচার বিভাগের মর্যাদা কেবল রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের বৈধতা নির্ধারণে নয়, প্রয়োজনের সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমা চিহ্নিত করার স্বাধীনতা ও সক্ষমতার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়।
এই কারণেই ১৯৫৯ সালের একটি নিষিদ্ধ বইয়ের মামলা আজও আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক। এটি অতীতের একটি রায়, কিন্তু এর উত্থাপিত প্রশ্নগুলো এখনো পুরোনো হয়ে যায়নি।
লেখক: আরিফ খান, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।
Source link
tags]
Leave a Reply