আদেশের অর্থ ভুল বুঝে ভোলার আদালতে যৌতুক মামলার বাদীর বিষপান: উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি


কোর্ট রিপোর্টার, ভোলা | ভোলা সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের আইনি আদেশের মর্মার্থ সঠিকভাবে বুঝতে না পেরে ক্ষোভ ও হতাশায় আদালতের এজলাসেই বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়েছেন তারাভানু (৩৫) নামে এক যৌতুক মামলার বাদী। এজলাসের ভেতরে এই আকস্মিক ও হুলস্থুল কাণ্ড ঘটার সাথে সাথেই দায়িত্বরত পুলিশ ও আইনজীবীরা অত্যন্ত তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে উদ্ধার করে ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।

আজ বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে ভোলার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট প্রথম আদালতের বিচারক সৌরভ রায় মিঠুর এজলাসে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ঘটে। আদালতের এজলাসে বিষপানকারী ওই নারী ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার ছোট মানিকা গ্রামের বাসিন্দা বাহার উদ্দিনের স্ত্রী।

ভোলা কোর্ট পুলিশের পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) শেখ মো. নাসির উদ্দীন আদালতের এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে সাংবাদিকদের জানান, ভুক্তভোগী ওই নারী মূলত একটি সিআর (CR) মামলার মূল বাদী। তিনি তাঁর স্বামী বাহার উদ্দিনসহ মোট চারজনের বিরুদ্ধে যৌতুকের জন্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় এই মামলাটি দায়ের করেছিলেন। আজ বুধবার বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট প্রথম আদালতে উক্ত মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘চার্জ গঠন’ বা অভিযোগ গঠনের জন্য দিন ধার্য ছিল। আদালত চলাকালীনই সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ওই নারী এজলাসের ভেতরে বিষপান করেন। কর্মরত পুলিশ সদস্যরা মুহূর্তের মধ্যে তাঁকে উদ্ধার করে দ্রুততার সাথে ভোলার প্রধান হাসপাতালে ভর্তি নিশ্চিত করেন।

আদেশের ভুল ব্যাখ্যা ও আইনজীবীদের বক্তব্য

আদালত সূত্র এবং এজলাসে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, আজকে মামলার চার্জ গঠন শুনানির সময় বিজ্ঞ বিচারক সৌরভ রায় মিঠু মামলার নথিপত্র এবং পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদন গভীরভাবে পর্যালোচনা করেন। শুনানি শেষে বিচারক মামলার মূল ও ১ নম্বর আসামি বাদীর স্বামী বাহার উদ্দিনের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জ গঠন (অভিযোগ গঠন) করেন। তবে মামলার বাকি তিন আসামির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত তথ্যপ্রমাণ না থাকায় আদালত তাঁদের এই মামলা থেকে অব্যাহতি (Discharge) প্রদান করেন।

কিন্তু আদালতের এই টেকনিক্যাল ও আইনি আদেশটি ইংরেজি বা আইনি মারপ্যাঁচে থাকায় সাধারণ বাদী তারাভানু সম্পূর্ণ ভুল বোঝেন। তিনি মনে করেন যে, আদালত তাঁর প্রধান অপরাধী স্বামীসহ সকল আসামিকে খালাস বা অব্যাহতি দিয়ে দিয়েছেন। এই ভুল ধারণা থেকেই চরম হতাশায় তিনি তাঁর সাথে থাকা ব্যক্তিগত ব্যাগ থেকে হঠাৎ করেই একটি বোতল বের করে তরল জাতীয় বিষ এজলাসের ভেতরেই মুখে ঢেলে দেন।

ঘটনার বিষয়ে ভোলা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এবং এই মামলার আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. ফরিদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “বিজ্ঞ বিচারক বাদীর স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বাকি তিন জনকে অব্যাহতি দেন, যা অত্যন্ত আইনানুগ। কিন্তু ওই সাধারণ নারী মনে করেছিলেন যে আজকেই হয়তো মামলার চূড়ান্ত রায় হয়ে যাবে এবং তিনি বিচার পেয়ে যাবেন। বিচারিক প্রক্রিয়ার কারণে রায় পেতে কিছুটা বিলম্ব হওয়া এবং অভিযুক্ত বাকি কয়েকজন অব্যাহতি পাওয়ায় তিনি আদেশের অর্থ ভুল বুঝে আকস্মিকভাবে নিজের ওপর এই ঘটনাটি ঘটিয়েছেন।”

হাসপাতালে বাদীর বর্তমান শারীরিক অবস্থা

আদালত প্রাঙ্গণ থেকে দ্রুত উদ্ধার করে ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা তাঁর পাকস্থলী পরিষ্কার (Stomach Wash) সহ জরুরি চিকিৎসা সেবা প্রদান শুরু করেন। ভুক্তভোগী তারাভানুর বর্তমান শারীরিক অবস্থা নিয়ে হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. আরাফাতুর রহমান জানান, ওই নারীর জরুরি চিকিৎসা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে চলছে। বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা কিছুটা স্থিতিশীল ও আশঙ্কামুক্ত রয়েছে। তবে তাঁকে আরও ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। তিনি ঠিক কী ধরনের তরল বিষ বা কীটনাশক পান করেছেন, তা রাসায়নিক পরীক্ষা ছাড়া তাৎক্ষণিকভাবে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায়নি বলে জানান এই চিকিৎসক।

আইনজীবীরা এই ঘটনার পর মন্তব্য করেছেন, দেশের প্রান্তিক ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের মধ্যে আদালতের আইনি পরিভাষা ও আদেশ (যেমন চার্জ গঠন, অব্যাহতি, খালাস বা জামিন) সংক্রান্ত মৌলিক ধারণা বা আইনি সচেতনতা না থাকায় অনেক সময় এ ধরনের মারাত্মক ও অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। আদালতের আদেশ সাধারণ মানুষের কাছে তাঁদের নিজ নিজ নিয়োজিত আইনজীবীদের আরও সহজ ও সাবলীল ভাষায় বুঝিয়ে বলা উচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *