হাইকোর্টে ভয়াবহ জালিয়াতি: তথ্য গোপন ও আদেশ বদলে কারাগারমুক্ত ‘কুকি-চিন’ পোশাক মামলার আসামি


সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে তথ্য গোপন ও জামিন আদেশ জালিয়াতির এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রকাশ পেয়েছে। চট্টগ্রামে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠন ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের’ (কেএনএফ) সদস্যদের জন্য তৈরি করা ২০ হাজার পোশাক জব্দের ঘটনায় করা সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মামলার প্রধান আসামি সাহেদুল ইসলাম এই ভয়াবহ জালিয়াতির মাধ্যমে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে গেছেন। সাহেদুল ইসলাম চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি এলাকার ‘রিংভো অ্যাপারেলসের’ মালিক।

জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর প্রক্রিয়া

সাত মাস আগে সংঘটিত এই জালিয়াতিটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। প্রথমত, তথ্য গোপন করে হাইকোর্ট থেকে একটি জামিন নেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী সেই জামিন আদেশে হাইকোর্টের দুই বিচারপতির স্বাক্ষরও নেওয়া হয়। কিন্তু এরপরই শুরু হয় মূল জালিয়াতি; স্বাক্ষরিত সেই জামিন আদেশটি কৌশলে বদলে ফেলা হয়। জালিয়াতি চক্র সেই আদেশে নতুন করে মামলার নম্বর ও থানার নাম বসিয়ে একটি ভুয়া জামিন আদেশ তৈরি করে এবং তা সংশ্লিষ্ট কারাগারে দাখিল করে। এই ভুয়া ও জাল করা জামিন আদেশের ভিত্তিতেই আসামি সাহেদুল ইসলাম অত্যন্ত গোপনে কারাগার থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন।

যেভাবে জালিয়াতি ধরা পড়ল

দীর্ঘ সাত মাস বিষয়টি আড়ালে থাকলেও চলতি সপ্তাহে তা আকস্মিকভাবে প্রকাশ পায়। ওই একই মামলার অন্য একজন আসামি উচ্চ আদালতে জামিন আবেদন করতে আসেন। শুনানির সময় তার আইনজীবীরা সাহেদুল ইসলামের জামিন পাওয়ার উদাহরণ (নজির) টেনে আনলে আদালত ও রাষ্ট্রপক্ষের সন্দেহ হয়। এরপর নথিপত্র যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, যে আদেশের দোহাই দিয়ে সাহেদুল মুক্ত হয়েছেন, তা আসলে আদালতের মূল রেকর্ডের সাথে মিল নেই এবং তা সম্পূর্ণ জাল।

প্রধান বিচারপতির ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম

বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পরপরই রাষ্ট্রের শীর্ষ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ঘটনাটি সরাসরি প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নজরে আনেন। প্রধান বিচারপতি অভিযোগটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকীকে তদন্তের নির্দেশ দেন। তিনি আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই জালিয়াতির নেপথ্যে কারা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী সাংবাদিকদের বলেন, “ইতোমধ্যে তদন্ত কাজ শুরু হয়েছে এবং এতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছে। বিস্তারিত তথ্য আমরা দ্রুতই প্রকাশ করতে পারব।”

তদন্তের আওতায় সুপ্রিম কোর্টের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা

সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন সূত্র জানায়, এই জালিয়াতির সাথে হাইকোর্ট বিভাগের কোনো বেঞ্চ কর্মকর্তা কিংবা ফৌজদারি শাখার কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী জড়িত কিনা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিজ্ঞ আইনজীবীদের মতে, আদালতের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা বা শাখার অভিজ্ঞ কর্মচারী ছাড়া এত সূক্ষ্মভাবে জামিন আদেশ বদলে ফেলা অসম্ভব। এই চক্রটিকে সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।

মামলার প্রেক্ষাপট ও কুকি-চিন সংযোগ

ঘটনার সূত্রপাত ২০২৫ সালের ১৭ মে। চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামি এলাকায় রিংভো অ্যাপারেলসের গুদাম থেকে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) সদস্যদের জন্য তৈরি করা ২০ হাজার ৩০০টি বিশেষ পোশাক জব্দ করা হয়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, প্রায় দুই কোটি টাকার বিনিময়ে গত মার্চ মাসে মংহলাসিন মারমা এবং কুকি-চিন সদস্যদের কাছ থেকে এসব পোশাক তৈরির অর্ডার নিয়েছিলেন কারখানা মালিক সাহেদুল ইসলাম (২৫)। এই ঘটনায় সাহেদুল ছাড়াও ক্রয়াদেশ দেওয়া গোলাম আজম (৪১) ও নিয়াজ হায়দারকে (৩৯) আসামি করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়। ওই সময় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে মূল হোতা সাহেদুল মুক্ত হয়ে যান।

উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফ বম, পাংখোয়া, লুসাইসহ কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে নিয়ে গঠিত এবং এটি পাহাড়ে ‘বম পার্টি’ নামেও পরিচিত।



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *