স্বামীর নির্যাতনে ডিভোর্স চাইলে বিচারকের মন্তব্য—‘কিল-ঘুষিতে কেউ মরে না’


আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চলের এক নারীর ওপর তার স্বামীর অমানুষিক নির্যাতনের ঘটনা তালেবানের নতুন আইনের অধীনে নারীদের প্রতি সহিংসতার এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে। স্বামীর হাতে তারের ক্যাবল দিয়ে মারধরের শিকার হয়ে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করতে গেলে আদালতের এক বিচারক তাকে বলেন, ‘সামান্য রাগ আর কয়েকটা কিল-ঘুষিতে কেউ মরে যায় না।’

ফারজানা (ছদ্মনাম) নামের ওই নারী জানান, তার স্বামী অত্যন্ত রাগী এবং প্রায়ই তাকে মারধর করেন। তার ডান পা বাঁ পায়ের চেয়ে সামান্য ছোট হওয়ায় স্বামী নিয়মিত তাকে ‘প্রতিবন্ধী’ বলে অপমান ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন। সন্তানদের কথা ভেবে এতদিন তিনি সব সহ্য করলেও এক সন্ধ্যায় সহিংসতার মাত্রা সীমা ছাড়িয়ে যায়।

সেই রাতের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ফারজানা বলেন, “সেদিন আমি খুব অসুস্থ ছিলাম, রাতের খাবার রান্না করার মতো শক্তি ছিল না। স্বামী কাজ থেকে ফিরে বললেন, ‘এখন তুমি ঘরের কাজও করোনি?’ আমি অসুস্থতার কথা জানালেও তিনি আমাকে মোবাইল ফোনের চার্জারের ক্যাবল দিয়ে মারধর করেন। আমার পিঠে ও হাতে কয়েকদিন ধরে সেই দাগ ছিল। কিন্তু তখন ভাবিনি যে আদালতে প্রমাণ হিসেবে ছবি তুলে রাখা দরকার।”

এই ঘটনার পর ডিভোর্সের আবেদন নিয়ে তালেবান আদালতে যান ফারজানা। কিন্তু বিচারক কেবল তার আবেদন নাকচই করেননি, বরং তার ওপর হওয়া নির্যাতনের বিষয়টিকে উপহাস করেন। ফারজানার ভাষ্যমতে, বিচারক তাকে প্রশ্ন করেন, “তুমি শুধু এই কারণে তালাক চাও? অন্য কোনও কারণ কি নেই?”

নির্যাতনের বর্ণনার পর বিচারক প্রমাণ দেখতে চান। কোনও ছবি বা প্রমাণ নেই শুনে বিচারক ফারজানাকে বলেন, “তুমি যখন তরুণ ছিলে তখন স্বামীর সঙ্গে আনন্দ করেছ। এখন সে বৃদ্ধ হচ্ছে বলে তুমি তালাকের বাহানা খুঁজছ যাতে অন্য কাউকে বিয়ে করতে পারো। ফিরে যাও, তোমার স্বামী ভালো মানুষ, তার সঙ্গেই থাকো। সামান্য রাগ আর কয়েকটা কিল-ঘুষিতে কেউ মরে যায় না। ইসলাম পুরুষকে অবাধ্য স্ত্রীকে শাসনের জন্য মারধরের অনুমতি দেয়। যাও, এসব নিয়ে আর কখনও তালাক চাইতে আসবে না।”

আরও পড়ুন : ভারতের সুপ্রিম কোর্টে নজিরবিহীন রায়: ১৩ বছর কোমায় থাকা যুবকের ‘নিষ্কৃতি মৃত্যু’র অনুমতি

মানবাধিকার সংস্থা রাওয়াদারি’র প্রধান শাহরজাদ আকবর বলেন, আফগানিস্তানে এখন এমন ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। নারীদের হয় সহিংসতা সহ্য করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে, না হয় তালেবান আদালতের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে, যেখানে উল্টো তাদেরই ‘অবাধ্যতার’ অভিযোগে শাস্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।

তিনি জানান, গত বছর কার্যকর হওয়া নতুন ফৌজদারি বিধি অনুযায়ী স্বামীরা স্ত্রীকে মারধর করতে পারবেন, যতক্ষণ না পর্যন্ত হাড় ভেঙে যায় বা দৃশ্যমান ক্ষত সৃষ্টি হয়। এমনকি অপরাধ প্রমাণিত হলেও স্বামীর সর্বোচ্চ সাজা মাত্র ১৫ দিন।

এই পরিস্থিতির কড়া সমালোচনা করেছেন নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই। জাতিসংঘে দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি বলেন, “এটি কোনও সংস্কৃতি নয়, ধর্মও নয়। এটি পৃথকীকরণ ও আধিপত্য বিস্তারের একটি ব্যবস্থা। আফগানিস্তানের এই শাসনব্যবস্থাকে আমাদের প্রকৃত নামেই ডাকা উচিত, আর তা হলো লিঙ্গীয় বর্ণবাদ।”

আদালতের রায়ের পর ফারজানা তার স্বামীর কাছে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু সেই স্বামী এখন আগের চেয়েও বেশি সহিংস হয়ে উঠেছেন। ফারজানা বলেন, “সে এখন আমাকে বলে, হয় সহ্য করো, না হয় মরো। সে আমাকে আমার বাবার বাড়িতেও যেতে দেয় না।”

এমনকি বিচারক ফারজানাকে এটিও বলে দিয়েছেন যে, তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করলে তিনি তাতে কোনো আপত্তি করতে পারবেন না।

আফগানিস্তানে ইউএন উইমেন-এর বিশেষ প্রতিনিধি সুসান ফার্গুসন সতর্ক করে বলেছেন, আফগান নারী ও মেয়েদের এভাবে চুপ করিয়ে দেওয়া এবং শাস্তির মুখে ঠেলে দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে একটি বিপজ্জনক বার্তা দেওয়া হচ্ছে—যে নারীদের অধিকার সহজেই উপেক্ষা করা যেতে পারে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *