সংখ্যা আছে, ক্ষমতা নেই: রাজনীতিতে নারীর অদৃশ্য দেয়াল


মনজিলা ঝুমা : বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই নারী। ভোটার তালিকায় নারী ভোটারের সংখ্যাও প্রায় পুরুষের সমান; কোনো কোনো নির্বাচনী এলাকায় তা অর্ধেকেরও বেশি। সে হিসেবে নারী ভোটাররা প্রার্থী নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকেন। ধারণা করা হচ্ছে, এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নারী ভোটারের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হবে। তবে দেশের এই অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে সারাবছরই উপেক্ষা করা হয়।

সংখ্যাগতভাবে এত বড় উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তার কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় না। প্রার্থী হওয়া, নির্বাচিত হওয়া এবং নীতিনির্ধারণের জায়গায় নারীদের অংশগ্রহণ এখনো অত্যন্ত সীমিত। এই সংখ্যাগত শক্তি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মধ্যকার বৈপরীত্যই আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটি গভীর সংকটকে সামনে নিয়ে আসে।

জনসংখ্যার অর্ধেক নারী, রাজনীতিতে কেন তারা এখনো উপেক্ষিত?

২৪ পরবর্তী আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে নারী অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে কি না—এই প্রশ্ন অনেকের মনেই ছিল। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ঘোষিত মনোনয়ন ও প্রকাশিত প্রার্থী তালিকা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নারী প্রার্থীর সংখ্যা এখনো অত্যন্ত হতাশাজনকভাবে কম। এসব তালিকা রাজনৈতিক দলে বিদ্যমান লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।

উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়, প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলে মোট মনোনয়নপ্রাপ্ত প্রার্থীর তুলনায় নারীর অংশগ্রহণকে তারা সেভাবে  দৃশ্যমান  করতে আরে নাই। অধিকাংশ দলের ক্ষেত্রে তা এক অঙ্কেই সীমাবদ্ধ। কোনো কোনো দলে মোট প্রার্থীর তুলনায় নারী প্রার্থীর হার ৫ শতাংশেরও কম, আবার কোনো দলের তালিকায় একজন নারী প্রার্থীও নেই। অর্থাৎ দলভেদে সংখ্যাগত পার্থক্য থাকলেও সামগ্রিক চিত্র একটাই নারীরা এখনো প্রার্থী তালিকায় প্রান্তিক অবস্থানেই রয়ে গেছেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে পুরুষতান্ত্রিক। নেতৃত্বকে এখনো শক্তি, কর্তৃত্ব ও পুরুষত্বের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়। ফলে রাজনীতিতে একজন নারীর প্রবেশকে স্বাভাবিক না ভেবে ব্যতিক্রম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পর্যায়ে নারীদের সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ১৯৭২ সালের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের স্বীকৃতি একটি ঐতিহাসিক অর্জন।

বর্তমানে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও জেলা পরিষদে অনেক নারী grassroots নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। শিক্ষা, আইন, প্রশাসন ও নাগরিক আন্দোলনে এক নতুন আত্মবিশ্বাসী নারী নেতৃত্ব গড়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক।আমাদের দেশে দলীয় রাজনীতিতে নারীর প্রতীকী অবস্থান অধিকাংশ রাজনৈতিক দলে নারী উইং, কোটা বা সংরক্ষিত পদ থাকলেও তা বাস্তব ক্ষমতার প্রতিফলন নয়।

আরও পড়ুন : নির্বাচনী ইশতাহার: রাজনীতি নাকি দায়মুক্তি?

দলীয় মনোনয়ন, নির্বাচনী কৌশল নির্ধারণ এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের উপস্থিতি সীমিত থাকে। অনেক ক্ষেত্রে নারী নেত্রীদের ব্যবহার করা হয় কেবল প্রচারমূলক কার্যক্রমে, কিন্তু সিদ্ধান্তের টেবিলে তাদের স্থান নিশ্চিত করা হয় না। ফলে দলীয় কাঠামোর ভেতরেই নারীরা প্রান্তিক অবস্থানে রয়ে যান। নারী রাজনীতিবিদদের যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক দক্ষতার চেয়ে বেশি আলোচিত হয় তাদের ব্যক্তিগত জীবন, আচরণ বা পারিবারিক পরিচয়। একই মানদণ্ড পুরুষ রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না, যা স্পষ্টভাবে একটি বৈষম্যমূলক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়।

রাজনীতি একটি ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র। নির্বাচনী ব্যয়, মাঠপর্যায়ের কর্মী ব্যবস্থাপনা এবং প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে অর্থ একটি বড় নিয়ামক। অধিকাংশ নারী অর্থনৈতিকভাবে পুরুষদের তুলনায় দুর্বল অবস্থানে থাকায় এই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। এর পাশাপাশি নারী রাজনীতিবিদরা মাঠপর্যায়ে কটূক্তি, সামাজিক অপমান, অনলাইন হয়রানি এবং কখনো কখনো শারীরিক সহিংসতার শিকার হন।

পর্যাপ্ত দলীয় ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অভাবে অনেক যোগ্য নারী রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। এছাড়াও আমাদের সমাজে নারীকে এখনো ‘সহযোগী’, ‘সমর্থক’ বা ‘সহনশীল’ ভূমিকায় কল্পনা করা হয়, নেতৃত্বের কেন্দ্রে নয়। রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতিকে অনেক সময় ব্যতিক্রম বা সৌন্দর্যবর্ধক হিসেবে দেখা হয়। অথচ ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক গণআন্দোলনে নারীরা নেতৃত্ব দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে সংকট মোকাবিলায় তারা সমান সক্ষম।

সংসদে নারীর সংখ্যা বাড়াতে সংরক্ষিত আসন ব্যবস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলেও এর সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত নারীরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন অবস্থান নিতে পারেন না। ফলে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল স্রোতে সম্পূর্ণভাবে যুক্ত হতে ব্যর্থ হন। সংখ্যাগত প্রতিনিধিত্ব বাড়লেও প্রকৃত ক্ষমতায়ন এখানে প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়।

প্রকৃত ক্ষমতায়নের অর্থ ও করণীয়

নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন মানে শুধু উপস্থিতি বা কোটা নয়, বরং নীতিনির্ধারণ ও নেতৃত্বে সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত সরাসরি নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তব সহায়তা নিশ্চিত করা। রাজনৈতিক সহিংসতা ও হয়রানির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, গণমাধ্যমে নারী নেতৃত্বের ইতিবাচক উপস্থাপন এবং পরিবার ও সমাজে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, এই সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি সম্ভব নয়।

রাজনীতিতে নেতৃত্ব বিকাশ, নীতিনির্ধারণ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ পরিসরে নারীর অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। নারীর ভোটার শক্তি রাজনৈতিক প্রচারণা ও নির্বাচনী কৌশলে গুরুত্ব পেলেও, তা প্রার্থীত্ব ও ক্ষমতার কাঠামোতে রূপ নিতে পারছে না। এই অসমতা কেবল রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সংকট নয়; এটি আমাদের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির একটি মৌলিক দুর্বলতা।

যেখানে সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী ভোট দেয়, সেখানে তাদের প্রতিনিধিত্ব যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের আসনে অনুপস্থিত থাকে, তবে সেই গণতন্ত্র কখনোই অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে না। নারীর ক্ষমতায়ন তাই কেবল স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়ন, নেতৃত্ব বিকাশ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামোয় নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হতে হবে ভবিষ্যতের নির্বাচনী সংস্কারের প্রধান অগ্রাধিকার।

উপসংহার

নারী কেবল ভোটার নন, তিনি রাষ্ট্রের সমান অংশীদার। দেশের জনসংখ্যার অর্ধেক নারীকে রাজনীতির মূল স্রোত থেকে দূরে রেখে কোনো গণতন্ত্রই শক্তিশালী হতে পারে না। এখন সময় এসেছে নারীর প্রতিনিধিত্বকে সংখ্যায় নয়, ক্ষমতা, মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিশ্চিত করার।

লেখক: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; কেন্দ্রীয় সংগঠক (দক্ষিনাঞ্চল), জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি



Source link

tags]

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *