সাক্ষী হিসেবে বিচারকের সাক্ষ্যের প্রয়োজনীয়তা, বাধ্যবাধকতা ও বিধিবিধান


সৈয়দ রিয়াজ মোহাম্মদ বায়েজিদ: সাক্ষ্য হল- একটি ফৌজদারী মামলার বিচার ও দেওয়ানী মামলার চূড়ান্ত শুনানীতে বাদী-বিবাদীগণের দাবী প্রমাণের মাধ্যম। ‘সাক্ষ্য হচ্ছে কোন ঘটনার বিষয় যার ফলাফল কিংবা অভিপ্রায় অন্য কোন ঘটনার উপস্থিতি সম্পর্কে হ্যাঁ বা না সূচক সিদ্ধান্ত দেয়’-বেনথাম। সাধারণত আমরা জানি একটি মামলার বাদীর মানিত সাক্ষীগণ আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করে থাকেন এবং সাক্ষীগণের সাক্ষ্য প্রদানের ভিত্তিতে একটি মামলার সাক্ষীর পর্যায় শেষ হয়ে পরবর্তীতে মামলার যুক্তিতর্ক ও রায় প্রদানের মাধ্যমে বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

কিন্তু আমরা কি ইহা জানি, একজন জজ বা ম্যাজিষ্ট্রেটগণও আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করে থাকেন? একটি মামলার সুষ্ঠু বিচার পরিচালনার জন্য বা ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বা সত্য উৎঘাটনের প্রয়োজনে একজন জজ বা ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন। এখন প্রশ্ন হল- কখন একজন জজ বা ম্যাজিষ্ট্রেটকে সাক্ষ্য প্রদান করতে হয়? জজ বা ম্যাজিষ্ট্রেটগণের সাক্ষ্য প্রদানের প্রয়োজনীয়তা কি? বা ম্যাজিষ্ট্রেটগণ মামলায় সাক্ষ্য প্রদান করতে বাধ্য কিনা?

একটি মামলার সত্যতা প্রমানের ক্ষেত্রে সাক্ষীদের ভূমিকাই মূখ্য। সঠিক প্রমানের বা সঠিক সাক্ষী বা গুরুত্বপূর্ণ ও নিরপেক্ষ সাক্ষী ব্যতীত বাদী তার মামলায় আনীত অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়। মামলার অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে আসামীগণ মামলা হতে খালাস পেয়ে থাকে। তাইএকটি মামলা প্রমানের ক্ষেত্রে সাক্ষীগণের ভূমিকা অনস্বীকার্য। মামলার অভিযোগ প্রমাণিত হবে তখনই যখন মামলার বাদীর মানিত সাক্ষীগণের সাক্ষ্য একে অপরকে Collaborate করে এবং বিশ্বাসযোগ্য হয় বলে বিজ্ঞ আদালত মনে করেন।

একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি ও সাক্ষ্য প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে একটি Leading মামলার সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে-

যুক্তিসঙ্গত ও পর্যাপ্ত সাক্ষ্য দ্বারা যদি পারিপার্শ্বিক অবস্থা সকল যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের উর্ধ্বে প্রমানিত না হয় অথবা প্রমানিত হলেও তা সামগ্রিকভাবে অভিযুক্তর অপরাধের যুক্তিসঙ্গত যুক্তিতর্ক বা ব্যাখ্যার সূচনা বিন্দু রূপে উপস্থাপিত ভাব বা প্রস্তাবকে (Hypothesis) নির্দেশ না করে, বরং তা অপর অভিযুক্তদের বিষয়ে অন্য কোন যুক্তসঙ্গত Hypothesis নির্দেশ করে, তা কোন সাক্ষ্য হিসাবে গণ্য হবেনা এবং অভিযুক্ত সন্দেহের সুবিধা লাভ করে। Bakul V. State 47 DLR (1995) (HCD)৪৮৬।

একটি মামলা প্রমাণের লক্ষ্যে সাক্ষ্য আইনের ১২১ ধারার বিধান মোতাবেক জজ ও ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতেসাক্ষ্য প্রদান করেন,তবে তিনি সাক্ষ্য প্রদান করতে বাধ্য হবেন না। কিন্তু জজ বা ম্যাজিষ্ট্রেটগণ পদের কর্তব্য পালন করার সময় যেসব ঘটনা তার উপস্থিতিতে সংঘটিত হয়। সেগুলো সম্পর্কে সাক্ষ্য প্রদান করতে পারেন। বিচার্য্য মামলায় সাক্ষ্য দেবার প্রশ্নে বিচারকের যোগ্যতা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে আদালতে যদি একাধিক বিচারক থাকেন তবে সেক্ষেত্রে একজন বিচারক শপথ গ্রহণপূর্বক সাক্ষী দিতে পারেন।

সাক্ষ্য আইনের ১২১ ধারা মতে উচ্চ আদালত কোন বিচারকের অধীনে বিচার্য্য মামলার বিষয়াবলী সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারেন। সেক্ষেত্রে বিচারক উচ্চ আদালতের উত্তর দিতে বাধ্য হবেন।

স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর ক্ষেত্রে- ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ৫৩৩ ধারার আলোকে দোষ স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করণে সংঘটিত কোন অনিয়ম ৫৩৩ ধারায় সংশোধন যোগ্য। এতদ্ব্যতীত, দোষ স্বীকার লিপিবদ্ধকারী ম্যাজিষ্ট্রেটকে পরীক্ষা করা না হলে তার সাথে দোষ স্বীকার সাক্ষ্য হিসাবে অগ্রহণযোগ্য হয় কিনা। প্রিভি কাউন্সিল ৫৩৩ ধারায় উল্লেখিত বিশেষ ক্ষেত্র ব্যতীত অন্য কোন ক্ষেত্রে ম্যাজিষ্ট্রেট ও বিচারককে পরীক্ষা করণের নীতি অনুমোদন করেনা। [5 BLD95]

বিচারকগণের সাক্ষ্য-প্রদানের প্রয়োজনীয়তা ও বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে কিছু লিডিং মামলার ডিসিশন-“কোন আসামীর স্বীকারোক্তি মূলক জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করতে কোন অনিয়ম করা হলে তা ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৩৩ ধারার বিধান মোতাবেক একজন ম্যাজিষ্ট্রেটকে সাক্ষী হিসাবে পরীক্ষা করে সংশোধন করা যেতে পারে” [পিএলডি-১৯৫০ কল. ১]।

যে সব ক্ষেত্রে ম্যাজিষ্ট্রেট নিজের পরিচয় দিয়ে স্বীকারোক্তিকারীকে সতর্ক করে দিয়েছেন অথচ তা ম্যাজিষ্ট্রেট লিপিবদ্ধ করেননি সেক্ষেত্রে ম্যাজিষ্ট্রেট যে অনিয়ম করেন তা ফৌজদারী কার্যবিধির ৫৩৩ ধারার বিধান মোতাবেক পরীক্ষা করে সংশোধন করা যায় না’ [ পিএলডি ১৯৬৬ করাচি ২৪২]।

ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ১৬৪ বা ৩৬৪ ধারার বিধান পালন না করা হলে- লিপিবদ্ধকরনের কায়দা-কানুনে ত্রুটির জন্য যাতে সুবিচার ব্যহত না হয় সেই উদ্দেশ্যই হলো ফৌজদারী কার্যবিধি আইনের ধারা-৫৩৩ এর কাজ।

‘যেখানে আসামী এক ভাষায় স্বীকারোক্তি করে এবং অন্য ভাষায় তা লিপিবদ্ধ হয় সেক্ষেত্রে ত্রুটি ধারা-৫৩৩ দ্বারা সংশোধন করে’ [৪৬ অল.১৫৬]।

স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করার অনিয়ম ধারা-৫৩৩ অনুযায়ী সংশোধন হতে পারে যখন আদালত সন্তুষ্ট হন যে, আসামী দোষঠিকই স্বেচ্ছায় স্বীকার করেছে, ত্রুটি ঘটেছে কেবল লিপিবদ্ধ করার পদ্ধতিতে। [পিএলডি ১৯১০ লাহোর ৬৮]।

ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ এবং ৩৬৪ ধারার বিধান পালন করা না হলে – “আসামীর স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করার পূর্বে ম্যাজিষ্ট্রেট আসামীকে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য অন্তুত ৩ ঘন্টা সময় দান না করে যে অনিয়ম করেন তা ৫৩৩ ধারায় সংশোধন করা যায়।” [১৯ ডিএলআর ৫৭৩ (ডিবি)]

মৃত্যুকালীন ঘোষণা রেকর্ডকারী ম্যাজিষ্ট্রেট সংক্রান্তে- কোন জখমকৃত ব্যক্তি বিশ্বাস করেন যে, তিনি অতিশীঘ্রই মারা যাবেন এবং বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে ম্যাজিষ্ট্রেট তার বিবৃতি রেকর্ড করেন কিন্তু জখমকৃত ব্যক্তি বেঁচে গেলেন। এক্ষেত্রে উক্ত ম্যাজিষ্ট্রেটকে সাক্ষী হিসাবে উপস্থিত হতেহবে। কাজেই তিনি আসামীর বিচার করতে পারেন না” [16 DLR 485]।

কোন ব্যক্তি তাঁর মৃত্যু সন্নিকটে জেনে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে মৃত্যুর পূর্বে ম্যাজিষ্ট্রেট বা ডাক্তার বা কোন ব্যক্তির সম্মুখে লিখিত বা মৌখিক বিবৃতি দিয়ে থাকেন ইহাকে ‘মৃত্যুকালীন ঘোষণা’ হিসাবে গণ্য করা হয়। ‘মৃত্যুকালীন ঘোষণা’ প্রমাণ করতে হলে যিনি ঘোষণা লিখেছেন তাকে আদালতে সাক্ষ্য দিতে হবে। যে মানুষ মারা যাচ্ছে তার পক্ষে মিথ্যা বলা স্বাভাবিক নয় এটা বিবেচনা করেই ‘মৃত্যুকালীন ঘোষণা’ মূল্যবান সাক্ষ্য হিসাবে বিবেচিত হয়।

অর্থাৎ মৃত্যুকালীন ঘোষণা যদি ম্যাজিষ্ট্রেট এর বরাবরে দিয়ে থাকেন বা যদি ম্যাজিষ্ট্রেট মৃত্যুকালীন ঘোষণা লিপিবদ্ধ করেন তবে ম্যাজিষ্ট্রেট নিজেই আদালতে সাক্ষী হিসাবে সাক্ষ্য প্রদান করতে পারেন।

সর্বোপরি বলা যায় কোন বিচারকের সম্মুখে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনা সম্পর্কে, দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী লিপিবদ্ধকরণ সম্পর্কে বা ফৌজদারী কার্যবিধির ১৬৪ বা ৩৬৪ ধারা পালন করা না হলে অথবা মৃত্যুকালীন ঘোষণা রেকর্ডকারী ম্যাজিষ্ট্রেটকে এবং একজন বিচারকের দায়িত্ব পালনের প্রশ্নে বা উচ্চ আদালত যদি মনে করেন ন্যায়বিচারের স্বার্থে বা মামলা প্রমাণের স্বার্থে একজন ম্যাজিষ্ট্রেট বা বিচারককে সাক্ষী হিসাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন সেক্ষেত্রে ম্যাজিষ্ট্রেট বা বিচারক আদালতে সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান করতে পারেন।

লেখক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রীম কোর্ট অব বাংলাদেশ।



Source link

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *