প্রাচীন নগর রাষ্ট্রের সভ্যতা বিকাশের মূল ভিত্তি ছিল আইন


জিয়াবুল আলম : সভ্যতার ঊষালগ্নে মানুষে মানুষে মারামারি হানাহানি অরাজকতা বিশৃঙ্খলা বিরাজমান ছিল। যেমন পবিত্র কোরআনে হযয়ত আদম (আ) এর দুই পুত্র কাবিল ও হাবিলের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং পরবর্তীতে উক্ত দ্বন্দ্বের জেরে হাবিলকে হত্যার বর্ণনা পাওয়া যায়। যা কোরআনের সুরা মায়িদা, আয়াত: ২৭-৩১ এর মধ্যে বিস্তারিত উঠে এসেছে। এই ধারাবাহিকতায় পৃথিবীতে যুগ যুগ ধরে অরাজকতা বিশৃঙ্খলা চলমান ছিল এবং বর্তমানেও আছে। যখন সমগ্র দুনিয়ায় অরাজকতা বিশৃঙ্খলা ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ল তখন পৃথিবী একটি অসভ্য জনপদে রুপ নেন।

এই পরিস্থিতিতে থেকে উত্তরণের জন্য পৃথিবীতে স্রষ্টা যুগে যুগে প্রতিনিধি কিংবা খলিফা পাঠিয়ে ছিল। স্রষ্টা যাদেরকে জমিনে খলিফা হিসেবে পাঠিয়েছে তাদের উদ্দেশ্য ইসলামের দ্বীন প্রচার হলেও মূলত সেই দ্বীনের মূল বিষয় বস্তু ছিল কতগুলো ধর্মীয় নিয়ম নীতির সমষ্টি। আর বিশেষ করে ধর্মীয় নিয়ম নীতি কিংবা ধর্মীয় অনুশাসনের মূল ভিত্তি ছিল আইন।

এই প্রসঙ্গে উড্রো উইলসন যথার্থ বলেন, “আদিতে রোমান আইন কতিপয় ধর্মীয় সূত্র ছাড়া আর কিছুই ছিল না।” বর্তমান কালে হিন্দু ও মুসলিম আইনেও ধর্মের প্রভাব বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়।

যাই হোক প্রাচীন কাল হতে বর্তমান পর্যন্ত আইন ছাড়া কোন সভ্যতার বিকাশ লাভ করেনি। যেমন- তৎকালীন আরবে বিশ্ব নবী রাসূল (সা:) এর আবির্ভাবের ১০০ বৎসর পূর্বে আরব্য আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগের কথা এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। সেই সময় আরবে নির্দিষ্ট ভূখন্ড ছিল। কিন্ত সুনির্দিষ্ট আইন না থাকার কারণে সভ্য রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়নি। বিশেষ করে ঐ সময় মারামারি হানাহানি সহ কন্যা সন্তানদেরকে জীবন্ত দাফনের মত ঘৃণ্য প্রথা বিরাজমান ছিল।

আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগে আইন শৃঙ্খলা অবনতির শেষ সীমানায় পৌঁছে গিয়েছিল। এর ফলে ব্যাপক অরাজকতা বিশৃঙ্খলার কারণে আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগে আরব একটি অসভ্য নগর রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে ছিল। ৬১০ খৃষ্টাব্দে বিশ্ব নবী রাসূল সা: এর নিকট ঐহী আগমনের পর আল্লাহ জিব্রাইল আঃ এর মাধ্যমে দীর্ঘ ২৩ বৎসর ধর্মীয় নিয়ম নীতি শিক্ষা দিয়ে উনার উপর পরিপূর্ণ ভাবে নাজিল হল ঐশী গ্রন্থ আল কোরআন। পবিত্র এই গ্রন্থের ধর্মীয় নিয়ম নীতি সহ বিভিন্ন অপরাধের বর্ণনা এবং অপরাধের শাস্তি সুনির্দিষ্ট করা হল। যখন কোরআনের আইন মানুষের উপর প্রয়োগ করল তখন আরব্য আইয়ামে জাহেলিয়াত যুগের অবসান হল। আরব নগর রাষ্ট্র ধীরে ধীরে সুস্থ কিংবা একটি মানবিক জনপদে পরিণত হল।

এছাড়াও প্রাচীন সভ্যতার সবচেয়ে পুরোনো নিদর্শন পাওয়া যায় মেসোপটেমিয়া সভ্যতায়। বর্তমান ইরাকের টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী উর্বর ভূমিতে আনুমানিক খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০০ সালে এই সভ্যতা গড়ে ওঠে। এই সভ্যতা থেকেই জন্ম হয় ব্যাবিলনীয়। আমোরীয়দের শাসনামলে, যা প্রায় ১৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল, ব্যাবিলন টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস অঞ্চলের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এবং ব্যাবিলনিয়া একটি বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল, যার মধ্যে সমগ্র দক্ষিণ মেসোপটেমিয়া এবং উত্তরে অ্যাসিরিয়ার কিছু অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

ক্ষমতায় এই উত্থানের জন্য মূলত দায়ী শাসক ছিলেন হাম্মুরাবি (আনুমানিক ১৭৯২ থেকে ১৭৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) ব্যাবিলনের প্রথম রাজবংশের ষষ্ঠ রাজা, যিনি পৃথক নগর-রাজ্যের মধ্যে জোট গঠন করেছিলেন, বিজ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের প্রচার করেছিলেন এবং তাঁর বিখ্যাত আইনবিধি জারি করেছিলেন। আইন জারির পর মানুষকে জানিয়ে দেওয়া হল কোন অপরাধ করলে কি শাস্তি হবে। যদি কোন ব্যক্তি আইন অমান্য করতেন তখন অপরাধীর উপর শাস্তি অরোধ করতেন। ফলে অরাজকতা বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি থেকে একটি সভ্য জনপদের সূচনা হয়েছিল। যাহা যুগযুগ ধরে ইতিহাসের পাতায় স্হান করে নিয়েছে।

পৃথিবীর প্রাচীনতম আরেকটি সভ্যতা এথেন্সের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যায় এথেন্স নগর রাষ্ট্রও গড়ে উঠেছে আইনের উপর ভিত্তি করে। কারণ এথেন্সের মত পাশাপাশি তৎকালীন গ্রিসে আরেকটা নগর রাষ্ট্রের সন্ধান পাওয়া যায়। সেটি হচ্ছে স্পার্টা। স্পার্টা নগর রাষ্ট্র হলেও তা বসবাসে উপযোগী ছিল না। কারণ সেখানে জোর যার, মুল্লুক তার নীতি প্রয়োগ ছিল। কোন ধরণে আইন কানুনের বালাই ছিলনা। স্পার্টার পার্শ্ববর্তী নগর রাষ্ট্র ছিল এথেন্স। এই রাষ্ট্র বেশ জনপ্রিয় ছিল। এই নগর রাষ্ট্র জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছিল সেখানে আইনের প্রয়োগ হত। মানুষের অধিকার খর্ব করার সুযোগ ছিলনা।

এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে তৎকালীন সময়ে এথেন্সে (খ্রিস্টপূর্ব ৬৩৮ – ৫৫৮) ছিলেন একজন বিখ্যাত এথেনীয় গ্রিক আইন প্রণেতা, কূটনীতিজ্ঞ ও কবি। আর্কায়িক এথেন্সের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক অবক্ষয় থেকে উত্তরণের জন্য তিনি আইন প্রণয়ন করেছিলেন। তবে হ্যাঁ এটিও সত্য যে পৃথিবীর প্রথম জুডিসিয়াল কিলিং এথেন্সে হলেও এথেন্স স্পার্টার চেয়ে বসবাসে উপযোগী নগর রাষ্ট্র ছিল।

উপরোক্ত এসব আলোচনায় এইটাই অনুমেয় যে পৃথিবীর কোন জনপদ আইন ছাড়া সভ্য হতে পারেনি। আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, যেখানে আইনের ব্যতিক্রম হয়েছে সেখানে সভ্যতার পতন হয়েছে। তাই একটি আধুনিক জনকল্যাণমুখী জনপদ গড়ে তোলার জন্য আইনের শাসনের বিকল্প নেই।

লেখক : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও জজ কোর্ট, চট্টগ্রাম।



Source link

Share this post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *