মামলাজট ব্যবস্থাপনায় লিগ্যাল এইড : সম্ভাবনা এবং কতিপয় সুপারিশ
মোঃ ফরিদুজ্জামান : বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা ঐতিহ্যগতভাবে কমন ল’ এর নীতি শাস্ত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই পদ্ধতির বিচার ব্যবস্থা বাংলাদেশের বিদ্যমান জনসংখ্যা সংখ্যাতত্ত্বের বৈশিষ্টের সাথে মানানসই কিনা সে ব্যাপারে বেশ কিছু বিতর্ক আছে। কেউ বলেন, এই বিচার ব্যবস্থায় আসলে বিচারিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। কারণ হিসেবে তাঁরা বলেন, বিচারপ্রার্থী জনগনের সব বিরোধীয় বিষয় আইনজীবী সংস্কৃতির কারণে সঠিকভাবে মূল্যায়ন সম্ভব হয় না । এ কারণে অনেক সময় অনেকটা অনুমানের ভিত্তিতে (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফৌজদারি মামলায় এবং কখনো কখনো দেওয়ানি মোকদ্দমার ক্ষেত্রে) সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। এর ফলে আইনবিজ্ঞানের সমাজ পরিবর্তনের নীতিসমূহের বাস্তব প্রয়োগ সম্ভব হয় না। যার ফলাফল হলো বাংলাদেশের ৬৪ জেলায় মোট বিচারাধীন মামলা মোকদ্দমার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখের মত।
সে কারণে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট এবং সদাশয় সরকার কীভাবে বিচারাধীন মামলার স্তুপ থেকে বিচার বিভাগকে বের করে আনা যায় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা করে চলেছেন। কিন্তু সমাধানের পথ খুঁজে পেতে পেতে নতুন মামলার সংখ্যা বেড়েই চলেছে। মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের আটজন মাননীয় বিচারপতিগণের সভাপতিত্বে পরিচালিত ‘অধস্তন আদালত তদারকি বিষয়ক মনিটরিং কমিটি’ র নিকট দাখিলকৃত পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় সারা দেশে ২২ বছরের পুরোনো মামলার সংখ্যা প্রায় ছয় হাজার ( দৈনিক আমাদের সময়, ৭জুলাই,২০২২)।
সুতরাং প্রচলিত প্রথাভিত্তিক মাধ্যম ব্যবহার করে মামলা মোকদ্দমা দায়ের করার বা নিষ্পত্তি করার হারের মধ্যে পার্থক্য কমানো যাচ্ছে না। আনুষ্ঠানিক বিচার ব্যবস্থায় বিজ্ঞ বিচারকগণকে বিদ্যমান কাঠামোতে মনিটর করে নিষ্পত্তির হার কিছুটা বাড়ানো সম্ভব হয়েছে । যেমন ২০২২ সালের ১লা জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের আটটি বিভাগের আদালতসমূহে মামলা নিষ্পত্তির হার বেড়েছে ৩২.৪০ শতাংশ (দৈনিক প্রথম আলো, ১২ সেপ্টেম্বর,২০২২)। তবে বাস্তবতা হচ্ছে নিষ্পত্তির এই হার উঠানামা করতে পারে। তাই প্রয়োজন আরোও বিকল্প।
জেলা লিগ্যাল এইড অফিস হতে পারে সেই মোক্ষম অস্ত্র। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার ২০২২ সালে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিনা খরচে প্রায় আট লাখ ছয় হাজার ৬০৩ জনকে আইনি সেবা প্রদান করেছে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসসমূহ । এছাড়া প্রি—কেস এবং পোস্ট কেস মিলিয়ে মোট ১০১,৩৪,৪৮,৭৬৭ টাকা ক্ষতিপূরণ হিসেবে আদায় করে দেওয়া হয়েছে।
২০১৩ সাল থেকেই দেশের ৬৪ জেলাতে সরকার জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে স্থায়ীভাবে একজন বিচারককে প্রেষণে নিয়োগ দিয়ে পদায়ন করে আসছেন। এছাড়া ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ গেজেট প্রকাশ করে লিগ্যাল এইড অফিসারের কার্যক্রমকে বিচারিক কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। দেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে প্রথমত যাঁরা অসহায় , অস্বচ্ছ্বল এবং আনুষ্ঠানিক বিচার প্রাপ্তিতে যে কোন আর্থ—সামাজিক কারণে অসমর্থ তাঁদের পাশে থাকে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস। গত নয় বছরে এই অফিসের কার্যক্রমের পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জনবান্ধব সরকার সর্বস্তরের নাগরিকদের সমতা বিষয়ক সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিসকে বিভিন্ন আইন, বিধিমালা, নীতিমালা, প্রবিধানমালা দ্বারা একটি পূণার্ঙ্গ প্রতিষ্ঠানরুপে গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চলমান রেখেছেন। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। এই সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মকতার্গণ নিরলসভাবে দেশের বিভিন্ন জেলার লিগ্যাল এইড অফিসারদের নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাঁদের সুযোগ সুবিধা দেখভাল করছেন। মন্ত্রণালয়ের সাথে মন্ত্রীপরিষদ বিভাগের বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা চুক্তি (এপিএ) প্রনয়ণে কাজ করছেন। এপিএ’র মধ্যে রাখা হয়েছে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে আপোষ মীমাংসা, আইনগত পরামর্শ, সরকারি খরচে মামলা মোকদ্দমা দায়ের করা, আইনগত সহায়তা বিষয়ক সেমিনার, কর্মশালা, সমাবেশ, উঠান বৈঠক, প্রাতিষ্ঠানিক গণশুনানী, আইনজীবীদের সাথে মামলা মোকদ্দমার অগ্রগতী বিষয়ক ত্রৈমাসিক সভা, জেলা—উপজেলা—ইউনিয়ন কমিটির নিয়মিত সভা, তাদের তদারকি ইত্যাদি।
নির্দিষ্ট মিশন এবং ভিশন নিয়ে জেলা লিগ্যাল এইড অফিস দেশের ৬৪ জেলাতে সফলতার সাথে কাজ করে যাচ্ছে। এই অফিসসমূহের কাজের পরিমান এবং দক্ষতার কারণে ২০২১—২০২২ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সংস্থাগুলোর মধ্যে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা শ্রেষ্ঠ হয়েছে। ২০১৩—২০২২ সালের মধ্যে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের কার্যক্রমে আদালতের চলমান মামলা অন্তভুর্ক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আইনগত সহায়তা প্রদান আইন,২০০০ এর ২১ক ধারা ২০১৩ সালে সংশোধন করা হয়। সেখানে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারকে ‘আইনত সহায়তা প্রার্থীকে আইনগত পরামর্শ প্রদান; প্রচলিত আইনের অধীন কোন আদালত বা ট্রাইব্যুনাল থেকে প্রাপ্ত ‘কোন বিষয়’ বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি’ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ‘কোন বিষয়’ বিষয়টা এতটাই ব্যাপক যে, দেওয়ানি বা ফৌজদারি বা পারিবারিক বা অন্যান্য যে কোন বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষমতা জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারকে প্রদান করা হয়েছে। যেহেতু ফৌজদারি কার্যবিধির তপশিলে আপোষগোগ্য মামলার ক্ষেত্রেও জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের কোন ক্ষমতা রাখা হয় নি সেহেতু এই ’কোন বিষয়’ এর সুযোগ তৈরি করে ফৌজদারি মামলাসমূহও আপোষের মাধ্যমে নিষ্পত্তির পরোক্ষ চেষ্টা করা হয়েছে।
যাহোক, আইনের অধীনে পরবতীর্তে বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে ২০১৫ সালে। সেখানে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের কার্যপদ্ধতি (বিধি—৩—৪,৯), আপোষের স্থান নিধার্রণ ( বিধি—৫), আপোষনামার আইনগত বৈধতা (বিধি—১৬) ইত্যাদি বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে। সরকারের এমন অবস্থান থেকে অনুধাবন করা যায় যে, জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের মাধ্যমে শুধুমাত্র নতুন আবেদনের ভিত্তিতেই আপোষ হবে না; বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন দেওয়ানি/পারিবারিক প্রকৃতির বিরোধের নিষ্পত্তিও এই অফিস থেকেই হতে পারে। তারই ধারাবাহিকতা হলো ২০১৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বরের গেজেট। সেখানে দেওয়ানি কার্যবিধির ৮৯ক ধারা সংশোধন করা হয়। সংশোধনীতে দেওয়ানি মোকদ্দমাসমূহ যেকোন পর্যায়ে আদালত চাইলে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের নিকট প্রেরণের বিধান করা হয়। একইভাবে অর্থ ঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর ২২ ধারা অনুসারেও বিরোধসমূহ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করার সুযোগ রয়েছে।
উপরের আলোচনা হতে এটা অনুমান করা যায় যে, জেলা লিগ্যাল এইড অফিস সরকারের, আইন মন্ত্রণালয়ের এবং সুপ্রিম কোর্টের দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির বিকল্প হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তাই বিদ্যমান কার্যবিধি আইনে ব্যাপক পরিবর্তন না এনেও দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির যে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে সেখানে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারদের যুক্ত করা যেতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্র আছে যেখানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এখন থেকে যে কোন দেওয়ানি বা ফৌজদারি বা পারিবারিক বা ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন মামলা দায়েরের পূর্বে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে বিরোধীয় পক্ষগণকে তাঁদের দাবী বিষয়ে বসানোর আয়োজন করা যেতে পারে। বিশেষ করে দেওয়ানি বা পারিবারিক বা অর্থ ঋণ বা দলিল দস্তাবেজ জাল—জালিয়াতি বা যৌতুক সম্পর্কিত বিরোধের ক্ষেত্রে আদালতে সরাসরি মামলা না নিয়ে প্রি—কেস আলোচনার বাধ্যবাধকতা তৈরি করা যেতে পারে। যদি কাগজপত্র—দলিল দস্তাবেজ দেখে অফিসার বিরোধীয় পক্ষগণকে আপোষে সম্মত করতে সমর্থ হন তাহলে বিরোধের নিষ্পত্তি হবে আপোষে। এবং নতুন কোন মামলা—মোকদ্দমা দায়ের হবে না। তবে কোন পক্ষ আপোাষ মানবেন না বলে দাবী তুললে অফিসার সংশ্লিষ্ট আদালত বরবার একটি প্রতিবেদন দেবেন মামলা দায়ের করানোর জন্য বা মামলা রেকর্ড না করানোর জন্য। তাহলে সারাদেশে মিথ্যা বা অহেতুক বা একাধিক মামলা মোকদ্দমা দায়ের করার সুযোগ কমে আসবে। ফলে একটা পর্যায়ে পুরাতন মামলা —মোকদ্দমা অগ্রাধিকারভিত্তিতে নিষ্পত্তির সুযোগ তৈরি হবে। এভাবে লক্ষ লক্ষ বিচারাধীন মামলা মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করে দায়ের , নিষ্পত্তি এবং বিচারাধীর মামলা মোকদ্দমার অনুপাত কমানো সম্ভব। প্রশ্ন উঠতে পারে— সেরেস্তাদারগণের কী দায়িত্ব থাকবে? তাঁদেও কাজের পরিধি কোনভাবেই এই সিদ্ধান্তের ফলে কমবে না। তবে সিভিল রুলস এন্ড অর্ডার অনুসারে তাঁরা মামলা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে প্রবেশদ্বার এবং উপযুক্ত কতৃর্পক্ষ। কিন্তু বিজ্ঞ বিচারকগণের মাথার উপর যে পরিমাণ মামলা মোকদ্দমার চাপ তা নিয়ে ব্যস্ততার কাঠামোয় সেরেস্তাদারগণেরও থাকার দায়বদ্ধতা আছে। সেরেস্তাদারদের পেশাগত অন্যান্য দায়িত্ব ঠিকমত পালন করলেও মামলা দায়ের—পূর্ব মেডিয়েশনের কোন ক্ষমতা বা যোগ্যতা তৈরি হয় না। সুতরাং জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারগণ প্রত্যেকটি নতুন মামলা করা পক্ষদের নিয়ে বসলেও আইনের খুব বড় পরিবর্তন করার প্রয়োজন হবে না। শুধুমাত্র জাতীয় আইনগত সংস্থা এবং আইন মন্ত্রণালয় মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের সাথে পরামর্শক্রমে আইনগত সহায়তা আইন,২০০০ বা আইনগত সহায়তা (আইনগত পরামর্শ, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি) বিধিমালা,২০১৫ তে সংশোধন করেই এই ব্যবস্থা করতে পারেন। বিষয়টা যেহেতু বিশেষ আইনে হবে সেহেতু দেওয়ানি বা ফৌজদারি কার্যবিধির কোন বিধানের সাথে কোন সংঘর্ষ থাকবে না। এটা কোন ব্যক্তির বিচারপ্রাপ্তিতে বাধা হওয়ার কথা নয়। সুতরাং কার্যবিধির তাত্ত্বিক ব্যতয় ঘটবে না; বরং সময়ের প্রয়োজনে ঘাটতি কিছুটা কমানো যাবে। সেটা বরং মামলাজট নিরসনে বড় ভুমিকা রাখবে।
বৃটিশ আইন ব্যবস্থায় লিগ্যাল এইড ব্যবস্থাকে পরোক্ষভাবে শক্তি প্রয়োগের একটা পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। যদিও বলা হয়ে থাকে মেডিয়েশন কার্যক্রমে কোন পক্ষকে বাধ্য করা যাবে না। ইংল্যান্ডে বিধান করা হয়েছে যে, কোন বিরোধ হলে প্রথমেই আদালতে মামলা নেওয়া হবে না। দু’পক্ষের বিজ্ঞ আইনজীবীকে দায়িত্ব দেওয়া আছে মেডিয়েশনে পক্ষদের রাজি করানো। মেডিয়েশনে বসে কোন পক্ষের আপত্তির কারণে সেটা সফল হয় নি সে ব্যাপারে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হয়। তখন আদালত আনুষ্ঠানিক বিচারের ব্যবস্থা করেন। তবে সেই রায়ে ক্ষতিপূরণ বা খরচ প্রদানের ক্ষমতা বিচারককে দেওয়া হয়েছে। যে পক্ষ হারবেন সে পক্ষ জয়ী পক্ষকে মামলা পরিচালনার যাবতীয় ব্যয় নিবার্হের আদেশ প্রদান করা হয়ে থাকে। একারণে বৃটেনে নাগরিকগণ আদালতে মামলা দায়ের করার আগেই মেডিয়েশন করে থাকেন। এই পরোক্ষ ব্যবস্থা আমাদের দেশেও চালু করা যেতে পারে। দেওয়ানি কার্যবিধির ৩৫ক ধারার ব্যাপ্তি বাড়িয়ে যে পক্ষের আপত্তির কারণে মেডিয়েশন সফল হয় নি সে পক্ষকে রায় প্রদানের সময় জয়ী পক্ষের মামলা সংশ্লিষ্ট সকল খরচ প্রদানের বিধান করা যেতে পারে। যেটা বৃটিশ পদ্ধতির মত করা যেতে পারে।
উপরের উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে দেশের ৬৪ জেলাকে দেওয়ানি বা ফৌজদারি বিরোধের ধরণ এবং মামলা মোকদ্দমার সংখ্যানুপাতে ক্যাটাগরি অনুযায়ী জেলার বিচার ব্যবস্থা বিন্যস্ত করে নেওয়া যেতে পারে। তার উপর ভিত্তি করে কোন জেলায় একাধিক লিগ্যাল এইড অফিসারের পদ সৃজন করা যেতে পারে। উপজেলা ভিত্তিক সহকারী জজ বা সিনিয়র সহকারী জজ আদালত থাকায় সেভাবেই উপজেলা ভিত্তিক লিগ্যাল এইড অফিসার নিয়োগ করা যেতে পারে। তাহলে তাঁদের পক্ষে নিজস্ব কার্যক্রম শেষ করে উপজেলার নতুন মামলা করা পক্ষগণের সাথে সময় দিতে সমর্থ হবেন। বর্তমানে বিজ্ঞ বিচারকগণের পদ সৃজনের যে গতি তাতে সময় অনেক বেশি লাগতে পারে। কারণ সেখানে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার প্রশ্ন রয়েছে। তাই খুব দ্রুত বিচার বিভাগের মামলাজট নিরসন করার জন্য বিকল্প ভাবনার প্রয়োজন। সে কারণে ৬৪ জেলায় একযোগে কতিপয় লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা নিয়োগ দিলে সরকারের রাজস্বের উপর চাপ কম পড়বে।
তবে বর্তমানে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারদের কিছু লজিস্টিক সাপোর্ট তাৎক্ষণিক প্রদান করলে এখনো মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির মহাযুদ্ধে সহায়ক হতে পারে। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের জন্য প্রস্তুতকৃত এপিএ ( বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি) তে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারদের উপজেলা পর্যায়ে (মাসে কমপক্ষে একবার), ইউনিয়ন পর্যায়ে (মাসে কমপক্ষে একবার) এবং গ্রাম পর্যায়ে গিয়ে মতবিনিময় সভা, উঠান বৈঠক, সমাবেশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষামূলক সেশন, স্থানীয় আপোষের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এ জন্য কোন যানবাহন নেই। জজশীপের গাড়ি বা ম্যাজিস্ট্রেসির গাড়ি সংখ্যা অপ্রতুল। যদি পৃথক গাড়ি বরাদ্দ দিয়ে ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া হয় তবে লিগ্যাল এইডের সেবা মানুষের দোর গোঁড়ায় প্রেরণ করা সম্ভব।
ফৌজদারি মামলা যেগুলো আপোষযোগ্য সেগুলো জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার বরাবর প্রেরণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন আদালত যখন বিজ্ঞ আইনজীবীকে অবগত করেন তখন তাঁরা বিরোধিতা করেন। প্রশ্ন তোলেন কোন আইনের ক্ষমতাবলে সিআর মামলা লিগ্যাল এইডে প্রেরণ করা হয়। যদি আইনি কাঠামোর মধ্য হতে প্রেরণের ব্যবস্থা করা হয় তবে অধিকাংশ সিআর মামলা পোস্ট কেস হিসেবে লিগ্যাল এইড অফিসে প্রেরণ করা সম্ভব হবে। এবং ফৌজদারি মামলা পোস্ট কেস হিসেবে দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হবে। কিন্ত বিদ্যমান পদ্ধতিতে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার সিআর পোস্ট কেস যেমন যৌতুক মামলা, পারিবারিক সহিংসতার মামলা বা পেনাল কোডের অধীন আপোষযোগ্য মামলাসমূহ বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে আপোষ করে দিলেও সেটাকে প্রি—কেস হিসেবে দেখানোর প্রয়োজন হয়। যেটা অফিসারের কাজের স্বীকৃতি দেয় না।
আইনগত সহায়তা প্রদান আইন,২০০০ এর ১৫ ধারা অনুযায়ী আইনে প্যানেল আইনজীবী নিয়োগের বিধান আছে। তাঁদের জন্য অনুসরনীয় বিষয়াবলী সম্পর্কে বিধান আছে আইনগত সহায়তা প্রদান প্রবিধানমালা,২০১৫ এর ৯ অনুচ্ছেদে বিদ্ধৃত আছে। কিন্তু তাঁদের দিয়ে মামলা পরিচালনার জন্য নিয়োগপত্র দিলে তারা অবহেলা করেন বলে বিচারপ্রার্থীরা অভিযোগ করেন। আবার কোন কোন আইনজীবী প্যানেলে থাকতে চাননা এবং মামলাও পরিচালনা করতে চাননা। তারা চিঠি পাঠান প্যানেল থেকে নাম কর্তনের বিষয়ে। নাম কর্তন করা হয় ঐ প্রবিধানমালার ১০ অনুচ্ছেদে। যদি বিজ্ঞ আইনজীবীদের লিগ্যাল এইডের মামলা পরিচালনার ব্যাপারে নূন্যতম দায়বদ্ধতা রাখা হয় এবং যদি ইচ্ছাকৃতভাবে লিগ্যাল এইডের মামলা পরিচালনায় গাফিলতি প্রদর্শণ করেন তবে তাঁদের বিরুদ্ধে বিদ্যমান আইনে নিবর্তনমূলক কোন বিধান নেই। যদি মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট বিজ্ঞ বা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল বা আইন মন্ত্রণালয় আইনজীবীদের দায়বদ্ধতা সৃষ্টিতে কোন আইনি পদক্ষেপ নেন তবে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ফলপ্রসুভাবে সফলতা পাবে দ্রুত এবং কার্যকর নিষ্পত্তির জন্য। অসহায় অসচ্ছ্বল মানুষ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের উপর আস্থা পাবেন।
ডিসেম্বর মাসে লিগ্যাল এইড অফিসারদের কাজ করতে হচ্ছে। কিন্তু কোন ভাতা প্রদান করা হচ্ছে না। অথচ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটগণ সেটা পাচ্ছেন। লিগ্যাল এইড অফিস এর কাজ বিচারিক কাজ হিসেবে গণ্য করলেও তাদের বাৎসরিক পোশাক ভাতা প্রদান করা হচ্ছেনা। জেলা লিগ্যাল এইড অফিসারগণ প্রজাতন্ত্রের গেজেটেড কর্মকর্তা। কিন্তু লিগ্যাল এইড অফিসারের বেতন হচ্ছে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে অথচ সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন হচ্ছে আইবাস++ থেকে। ফলে জিপিএফ কর্তন, কর কর্তন, কল্যাণ তহবিল এবং যৌথ বীমার তথ্য হালনাগাদ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এলপিসি পাওয়াসহ নানবিধ সমস্যা হচ্ছে। এ বিষয়টি সমাধানে উদ্যোগ নিলে লিগ্যাল এইড অফিস এর গতি বাড়বে। বর্তমানে মাত্র একজন অফিস সহকারী নিয়ে অফিস পরিচালনা করতে হচ্ছে। যদি একজন বেঞ্চ সহকারি, জারী কারক, নাজির, হিসাবরক্ষক এবং দুজন অফিস সহায়ক দেওয়া হয় তবে অফিসারের অফিস পরিচালনাসহ আনুসঙ্গিক অন্যান্য কার্যক্রম সহজে সম্পাদন করা সম্ভব হবে । উপরোক্ত বিষয়সমূহ বাস্তবায়ন করতে পারলে বিচারব্যবস্থার নতুন দিগন্ত দেখতে পাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস করা যায়।
লেখক: জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার (সহকারি জজ), মাগুরা।
Leave a Reply